গোয়ার স্থাপত্যে পর্তুগিজ শাসনের ছাপ
পর্তুগিজ শাসনের দীর্ঘ ইতিহাস গোয়ার স্থাপত্য, খাবার ও ফুটবলে আজও জীবন্ত। মারগাঁওয়ের জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামের কাছে রাত প্রায় বারোটায় দেখা গেল ফাঁকা রাস্তা। হোটেলে ফেরার উপায় না পেয়ে সাহায্য চাইলে ফেরলে মার্টিন রাজ নামের এক ব্যক্তি নিজের বাইকে করে হোটেলের কাছে বাড়ি নিয়ে যান। তিনি জানান, গোয়ায় পর্তুগিজ শাসনের প্রভাব এখনও মানুষের পদবিতে, যেমন ডিসুজা, ফার্নান্দেজ ও রদ্রিগেজ।
গোয়ার পানজিমের ‘আওয়ার লেডি অফ দ্য ইম্যাকুলেট কনসেপশন চার্চ’ ওল্ড গোয়ার ঐতিহাসিক গির্জাগুলোর একটি। ১৫৯৪ সালে নির্মাণ শুরু হয়ে ১৬০৫ সালে শেষ হওয়া বাসিলিকা অব বম জেসুস রেনেসাঁ ও বারোক স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শন। এখানে সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ারের মরদেহ সংরক্ষিত আছে, যা প্রতি ১০ বছর পর দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত হয়। ১৯৮৬ সালে ইউনেসকো ওল্ড গোয়ার গির্জা ও মঠগুলোকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
সে ক্যাথেড্রালের ‘গোল্ডেন বেল’ পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্র। চার্চ অব সেন্ট কাজেতান নির্মিত হয়েছে রোমের সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকার আদলে। বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় গোয়ার অনেক ঘরে পর্তুগালের পতাকা ওড়ে। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এখানে ‘গড’ হিসেবে সমাদৃত। গোয়ার তরুণ ফুটবলপ্রেমী অ্যালেন ফার্নান্দেজ ও মারিয়া ফার্নান্দেজ রোনালদোকে আদর্শ মানেন।
গোয়ার পরিচয় শুধু ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নয়। পানাজির ফন্টেনহাস এলাকায় লাল, হলুদ ও নীল রঙের পুরোনো পর্তুগিজ বাড়ি, কাঠের বারান্দা ও টাইলসের নামফলক চোখে পড়ে। পর্যটকেরা এখানে ভিন্ডালু ও বেবিঙ্কার স্বাদ নিতে আসেন।
স্থানীয় সাংবাদিক রাহুল চান্দাওয়ারকর জানান, ১৯৬১ সালের ১৯ ডিসেম্বরের আগে গোয়ায় জন্মগ্রহণকারী ব্যক্তিদের বংশধরেরা নির্দিষ্ট শর্তে পর্তুগিজ নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারেন। তবে পর্তুগিজ নাগরিকত্ব নিলে ভারতের নাগরিকত্ব ছাড়তে হয়, পরিবর্তে ওসিআই কার্ড পান।
সময়ের সঙ্গে গোয়ার সামাজিক চিত্র বদলেছে। ১৯৬১ সালে জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশ খ্রিষ্টান, ৫০ শতাংশ হিন্দু ও ৫ শতাংশ মুসলিম ছিল। বর্তমানে হিন্দু জনসংখ্যা ৬৬ শতাংশে পৌঁছেছে, খ্রিষ্টান ২৬ শতাংশে নেমেছে। ভাষায়ও পরিবর্তন এসেছে; কঙ্কনি ও পর্তুগিজের পাশাপাশি ইংরেজি ও হিন্দির প্রাধান্য বেড়েছে।
পর্তুগিজরা গোয়ায় ফুটবলের বীজ রোপণ করেছিল। তবে রাহুলের মতে, ফুটবলের উন্মাদনা আগের মতো নেই। এখন ভারতের ফুটবলাররা মণিপুর, মেঘালয়ের মতো রাজ্য থেকে আসছেন। এফসি গোয়ার ম্যাচে ১০ হাজার দর্শক হলেও নারী ফুটবল দলের ম্যাচে গ্যালারি ফাঁকা থাকে।
গোয়ার গল্প শুধু সৈকত ও ক্যাসিনোর নয়, এটি দীর্ঘ ঔপনিবেশিক ইতিহাস, পর্তুগিজ পরিচয় ও ফুটবলের আবেগের গল্প। ভারতের মধ্যে থেকেও গোয়া যেন পর্তুগালের ছায়া ধরে রেখেছে।



