পবিত্র কাবা শরিফ: ইতিহাস, কিসওয়া ও ভেতরের রহস্য
পবিত্র কাবা শরিফ: ইতিহাস, কিসওয়া ও ভেতরের রহস্য

সৌদি আরবের স্থানীয় সময় ৮ জিলহজ থেকে পবিত্র হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ১৫ লাখের বেশি মুসলিম মক্কায় সমবেত হয়েছেন। জীবনে অন্তত একবার হজ আদায় করা সামর্থ্যবান মুসলিমদের জন্য ফরজ। পাঁচ দিনের এই আনুষ্ঠানিকতায় হাজিরা পবিত্র কাবা শরিফ জিয়ারত করেন এবং তওয়াফ করেন।

কাবা শরিফের পরিচিতি

আরবিতে কাবা শব্দের অর্থ ঘনক বা চতুষ্কোণ ঘর। এটি ইসলামের পবিত্রতম স্থান এবং মক্কার মসজিদুল হারামের মাঝখানে অবস্থিত। সারা বিশ্বের মুসলিমরা প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময় কাবার দিকে মুখ করে দাঁড়ান, যা কিবলা নামে পরিচিত। কাবা শরিফের উচ্চতা ১৩ দশমিক ১ মিটার (৪৩ ফুট), দৈর্ঘ্য ১২ দশমিক ৮ মিটার (৪২ ফুট) এবং প্রস্থ ১১ দশমিক শূন্য ৩ মিটার (৩৬ ফুট)।

কাবার ইতিহাস

মুসলিমরা বিশ্বাস করেন, কাবা মূলত আল্লাহর আদেশে হজরত ইব্রাহিম (আ.) এবং তাঁর পুত্র হজরত ইসমাইল (আ.) ইবাদতগৃহ হিসেবে নির্মাণ করেছিলেন। পবিত্র কোরআনে একাধিকবার কাবার কথা উল্লেখ রয়েছে। ইসলামের আবির্ভাবের আগে কাবা ছিল আরবের বিভিন্ন গোত্রের উপাসনার স্থান। ৬৩০ খ্রিষ্টাব্দে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কায় ফিরে এসে কাবার ভেতর থেকে সব মূর্তি অপসারণ করেন এবং একে এক আল্লাহর ইবাদতের স্থানে পরিণত করেন। বর্তমানে প্রতিবছর হজ ও ওমরাহ পালনের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ২ কোটির বেশি মানুষ মক্কায় আসেন।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কাবার ভেতরের কাঠামো

কাবা শরিফের উত্তর-পূর্ব দিকে একটি সোনার দরজা রয়েছে, যা ভূমি থেকে দুই মিটারের বেশি উঁচুতে অবস্থিত। ২৮০ কেজি খাঁটি সোনা দিয়ে তৈরি এই দরজার উচ্চতা ৩ দশমিক ১ মিটার (১০ ফুট) এবং প্রস্থ ১ দশমিক ৯ মিটার (৬ ফুট)। বছরে সাধারণত দুবার কাবার ভেতরের অংশ ধোয়ার জন্য দরজা খোলা হয়। ভেতরের অংশটি অত্যন্ত সাধারণ—ছাদ ধরে রাখার জন্য তিনটি কাঠের স্তম্ভ, ছাদে ওঠার জন্য একটি সিঁড়ি, মার্বেল মেঝে ও দেয়াল এবং ছাদ থেকে ঝোলানো লণ্ঠন। ভেতরের দেয়ালের কিছু অংশ কাপড়ে ঢাকা থাকে, যা ঐতিহাসিকভাবে লাল, সবুজ ও গাঢ় নীল রঙের হয়ে থাকে।

কিসওয়া কী

কিসওয়া হলো কালো রেশমি কাপড়, যা কাবা শরিফকে ঢেকে রাখে। আরবি কিসওয়া শব্দের অর্থ ঢাকা বা আবৃত করা। ইসলামের প্রাথমিক যুগে কিসওয়া তৈরি হতো মিসরের দামিয়েত্তা ও অন্যান্য স্থানে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত ‘তিরাজ’ কারখানায়। দক্ষিণ এশিয়ায় কিসওয়া ‘গিলাফ’ নামে পরিচিত। হজের সময় কিসওয়ার নিচের অংশ সযত্নে ওপরে তুলে রাখা হয়, যাতে হাজিরা কাবার কাছাকাছি যেতে পারেন এবং কাপড়টি সুরক্ষিত থাকে।

কিসওয়ার উপাদান ও উৎপাদন

বর্তমানে কিসওয়া প্রাকৃতিক রেশম দিয়ে তৈরি। ইতিহাসে লিনেন, তুলা, পশম ও চামড়াও ব্যবহৃত হয়েছে। কিসওয়া তৈরিতে প্রায় ৬৭০ কেজি প্রাকৃতিক রেশম, ১২০ কেজি ২৪ ক্যারেট সোনার সুতা এবং ১০০-১২০ কেজি রুপার সুতা ব্যবহৃত হয়। মক্কার কিসওয়া কারখানায় ২৪০ জনের বেশি কর্মী আধুনিক প্রযুক্তি ও ঐতিহ্যবাহী তাঁতের সমন্বয়ে এটি তৈরি করেন। ইতালি থেকে আমদানি করা রেশম প্রথমে বিশেষ ডিটারজেন্ট ও অলিভ অয়েল সাবান মিশ্রিত ঠান্ডা পানি দিয়ে ধোয়া হয়, তারপর গরম পানিতে কয়েকবার ধুয়ে কালো রঙে রঞ্জিত করা হয়। একটি কিসওয়া তৈরির আনুমানিক খরচ আড়াই কোটি সৌদি রিয়াল (৮১ কোটি ৬৩ লাখ ২৮ হাজার টাকা) ছাড়িয়ে যায়।

কিসওয়ার রঙের পরিবর্তন

ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে কিসওয়া সাদা, সবুজ, হলুদ ও কালো রঙের হয়েছে। সিরিয়ায় তৈরি কিসওয়া লাল, সবুজ, হলুদ ও সাদা রঙের হতো। আব্বাসীয় আমলে কালো রংকে বিশেষ পরিচয় হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। ইসলাম-পূর্ব যুগে ইয়েমেনে তৈরি কিসওয়া সম্ভবত ডোরাকাটা লাল ও সবুজ পশমের ছিল।

কিসওয়া পরিবর্তন ও বিতরণ

কিসওয়া বছরে একবার পরিবর্তন করা হয়। পুরোনো কিসওয়া খুলে ফেলার পর তা কারখানায় ফেরত পাঠানো হয়। সেখানে সোনা বা রুপার সুতার কারুকাজ, কোরআনের আয়াত বা নকশা করা প্যানেলগুলো সংরক্ষণ করা হয় এবং জাদুঘরে দান বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিতরণ করা হয়। বাকি অংশ ছোট ছোট টুকরা করে সরকারি কর্মকর্তা, সংস্থা ও বিদেশি দূতাবাসের প্রতিনিধিদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। গিলাফ পরিবর্তনের অনুষ্ঠানের সময় উপস্থিত ব্যক্তিদেরও ছোট ছোট টুকরা উপহার দেওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ায় কিসওয়ার কিছু অংশ খোলা বাজারে চলে আসে এবং মাঝেমধ্যে অনলাইনেও বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখা যায়।