পুতিন, নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের পতন: বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন আশার আলো?
পুতিন, নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের পতন: বিশ্বে নতুন আশা?

বিশ্বের বর্তমান অবস্থা দেখে কি আপনার মন খারাপ হয়েছে? ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা হচ্ছে? শুধু আপনারই নয়, বহু মানুষই এখন একই রকম অনুভব করছেন। পশ্চিমা দেশগুলোতে রাজনীতি নিয়ে হতাশা এখন একটি সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে চলছে যুদ্ধ, ডান ও বামপন্থীদের চরমপন্থা বাড়ছে, অর্থনীতি ভালো যাচ্ছে না, ধনী-গরিবের বৈষম্য বাড়ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে দুর্নীতি, সন্ত্রাস, বর্ণবাদ, বড় প্রযুক্তি কোম্পানির প্রভাব, প্রাণী ও প্রকৃতির ধ্বংস এবং জলবায়ু সংকট। সব মিলিয়ে মানুষ মনে করছে যে পৃথিবীটা দিন দিন আরও কঠিন ও অস্থির হয়ে উঠছে।

খবর এড়িয়ে চলছেন মানুষ

অনেকেই এখন খবরের জগৎ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছেন, কারণ খবর তাদের উদ্বিগ্ন করে তোলে। রয়টার্স ইনস্টিটিউটের এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৫০টি দেশের ৪০ শতাংশ মানুষ স্বীকার করেছে যে তারা মাঝেমধ্যে বা নিয়মিত খবর এড়িয়ে চলে। ২০১৭ সালের তুলনায় এই সংখ্যা বেড়েছে ২৯ শতাংশ।

ইউরোপে নেতিবাচকতা ও হতাশা

ইউরোপে রাজনৈতিক মনোভাবের ক্ষেত্রে তীব্র নেতিবাচকতা স্পষ্ট। ফ্রান্সে ৯০ শতাংশ মানুষ মনে করেন, দেশ ভুল পথে যাচ্ছে। ব্রিটেনে এই হার ৭৯ শতাংশ, জার্মানিতে ৭৭ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ৬০ শতাংশ। বৈশ্বিক চিত্র নিয়েও ইউরোপীয়দের হতাশা প্রবল। এর বিপরীতে চীন, সৌদি আরব বা নাইজেরিয়ার মানুষ তুলনামূলক আশাবাদী।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপ বলছে, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনকে অনেক দেশই সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক হুমকি হিসেবে দেখে। তবে চিত্রটা সবখানেই এক নয়। তুরস্কে ইসরায়েলকে প্রধান হুমকি মনে করা হয়, আর গ্রিসে তুরস্ককে। কানাডার মতো কিছু দেশে আবার যুক্তরাষ্ট্রকে একই সঙ্গে প্রধান মিত্র ও প্রধান হুমকি হিসেবে দেখা হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গণতন্ত্র ও নেতৃত্বের প্রতি অসন্তোষ

গণতন্ত্র নিয়ে হতাশা এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে অসন্তোষ এখন পশ্চিমা সমাজে সর্বব্যাপী। বিভাজন আরও গভীর হচ্ছে। ব্রিটেনের নেতা কিয়ার স্টারমারের জনপ্রিয়তা মাত্র ২৭ শতাংশে নেমে এসেছে। জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস ও ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর অবস্থাও আরও দুর্বল। তাঁদের জনপ্রিয়তা যথাক্রমে ১৯ ও ১৮ শতাংশ।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থন এখন প্রায় ৩৮ শতাংশে নেমে এসেছে। অন্যদিকে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ৫৪ শতাংশ সমর্থন পাচ্ছেন। রাশিয়ায় ভ্লাদিমির পুতিনের দীর্ঘদিনের উচ্চ জনপ্রিয়তাও এখন ধাক্কা খেয়েছে। চীনে সি চিন পিং সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া কঠিন। তবে ভারতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে এখনো অধিকাংশ মানুষ সমর্থন করে।

অন্ধকার পরিস্থিতি বদলানোর উপায়

এই অন্ধকার পরিস্থিতি বদলাবে কীভাবে? তার জন্য প্রয়োজন ইতিবাচক উদাহরণ। আশার কথা হলো, রাশিয়া, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র—এই তিন দেশে কিছু পরিবর্তনের আভাস দেখা যাচ্ছে। পুতিন, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প—এই তিন নেতার প্রভাব কমে গেলে বৈশ্বিক পরিবেশেও পরিবর্তন আসতে পারে।

রাশিয়ায় পুতিনের দুর্বল অবস্থান

রাশিয়ার দিকে তাকালে দেখা যায়, ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু করার পর পুতিনের অবস্থান এখন সবচেয়ে দুর্বল। তিনি দ্রুত বিজয়ের আশা করেছিলেন, কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। অনুমান করা হয়, অন্তত সাড়ে তিন লাখ রুশ সেনা নিহত হয়েছেন। অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ছে, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। দ্রব্যমূল্য ও কর বেড়েছে, ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ করে সমালোচনা ঠেকানোর চেষ্টা চলছে।

এদিকে ইউক্রেন ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করে শক্ত অবস্থান ধরে রেখেছে। রেড স্কয়ারের বিজয় দিবসের প্যারেডও নিরাপত্তা শঙ্কায় ছোট করে আয়োজন করতে হয়েছে। পুতিনের প্রকাশ্য উপস্থিতি কমেছে, ক্ষমতার অভ্যন্তরে দ্বন্দ্বের খবরও শোনা যাচ্ছে। এমনকি অভ্যুত্থান বা হত্যার আশঙ্কাও আলোচনায় এসেছে। সত্য-মিথ্যা যা–ই হোক, সম্প্রতি পুতিনের বক্তব্য—যুদ্ধ শেষের পথে—এই চাপেরই প্রতিফলন।

নেতানিয়াহুর চ্যালেঞ্জ

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুও কঠিন সময়ের মুখে। অক্টোবরের মধ্যে নির্বাচন হতে হবে এবং সেটি মূলত তাঁর ওপর গণভোটে পরিণত হতে যাচ্ছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামলা ঠেকাতে ব্যর্থতা, গাজায় হামাসকে ধ্বংসের প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থতা, বিচারব্যবস্থাকে দুর্বল করার অভিযোগ এবং দুর্নীতির মামলা—সব মিলিয়ে তাঁর অবস্থান নড়বড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করতে ব্যর্থতা, হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা এবং লেবাননে সংঘাত। এসবই ভোটারদের ওপর প্রভাব ফেলছে। ফলে নির্বাচনে টিকে থাকা তাঁর জন্য কঠিন হতে পারে।

ট্রাম্পের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ

ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থনীতি। তাঁর নীতির কারণে নিম্ন আয়ের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাণিজ্যযুদ্ধ, জলবায়ু সংকট অস্বীকার, ইউরোপ ও ন্যাটো মিত্রদের সঙ্গে বিরোধ, সামরিক হুমকি—সব মিলিয়ে পশ্চিমা বিশ্বে হতাশা বাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত অর্থনীতিই নির্ধারক। অর্থনীতি যদি খারাপ থাকে, তবে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে। ডেমোক্র্যাটরা জয়ী হলে ট্রাম্পের ক্ষমতা সীমিত হবে, এমনকি অভিশংসনের পথও খুলতে পারে।

তিন নেতার পতনে বিশ্বে পরিবর্তন

যদি পুতিন ক্ষমতাচ্যুত হন, নেতানিয়াহু পরাজিত হন এবং ট্রাম্পের ক্ষমতা কমে যায়—তাহলে বিশ্ব পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। অবশ্য রাশিয়ায় নতুন নেতৃত্ব এলেও একই ধরনের শাসনব্যবস্থা থাকতে পারে। তবু নতুন প্রেসিডেন্ট যুদ্ধ শেষ করার চেষ্টা করবেন বলেই ধারণা। ইসরায়েলে নেতানিয়াহুর বিদায়ে নিরাপত্তা ইস্যু থাকবে, তবে চরম ডানপন্থী দলগুলো সরকারে না এলে ফিলিস্তিনিদের ওপর দমন-পীড়ন কমতে পারে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ভাবমূর্তি পুনর্গঠনেরও সুযোগ তৈরি হবে।

ট্রাম্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। তিনি অপসারিত হতে পারেন, আবার ক্ষমতায় থেকেও প্রভাব হারাতে পারেন। ইতিহাসে যেমন অনেক ক্ষমতাবান নেতাই শেষ পর্যন্ত পেছনে পড়ে গেছেন, তেমনটাই ঘটতে পারে তাঁর ক্ষেত্রেও। একটি বিষয় নিশ্চিত—ট্রাম্পের প্রভাব কমলে বিশ্বরাজনীতি কিছুটা স্বস্তি পাবে। পুতিন ও নেতানিয়াহুর সঙ্গে তাঁর যে জোটসুলভ অবস্থান, তা ভেঙে গেলে পশ্চিমা বিশ্বের হতাশ মানুষ নতুন করে আশার আলো দেখতে পারে।