ব্রিকস বৈঠকে ইরান যুদ্ধ নিয়ে ঐকমত্য হয়নি
ব্রিকস বৈঠকে ইরান যুদ্ধ নিয়ে ঐকমত্য হয়নি

ইরান যুদ্ধ নিয়ে কোনও ধরনের যৌথ বা সাধারণ অবস্থানে পৌঁছাতে না পেরেই ভারতের রাজধানী নয়া দিল্লিতে শেষ হলো উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জোট ব্রিকসের দুই দিনব্যাপী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক। সাম্প্রতিক বৈঠক শেষে প্রকাশিত জোটের যৌথ নথিতে কেবল এতটুকুই স্বীকার করা হয়েছে যে, এই যুদ্ধ নিয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ‘ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি’ রয়েছে।

দ্বিতীয়বারের মতো ঐকমত্যহীন বৈঠক

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাত নিয়ে এই নিয়ে পরপর দ্বিতীয়বারের মতো ভারতের মাটিতে ব্রিকসের কোনও সম্মেলন কোনও ধরনের ঐকমত্য ছাড়াই শেষ হলো। বৃহস্পতিবার নয়া দিল্লির ‘ভারত মণ্ডপম’-এ ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের সভাপতিত্বে এই বৈঠক শুরু হয়। ২০২৬ সালে ভারতের ব্রিকস প্রেসিডেন্সির অধীনে এটিই ছিল প্রথম কোনও বড় মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক। গ্লোবাল সাউথ দেশগুলোর কণ্ঠস্বর জোরালো করার লক্ষ্যে গঠিত ১০ সদস্যের এই জোটের আগামী সেপ্টেম্বর মাসে ভারতে শীর্ষ সম্মেলন (লিডার্স সামিট) অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

যুদ্ধের প্রেক্ষাপট

৭৭ দিনে পদার্পণ করা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধের আবহে এই বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সামরিক ঘাঁটি, পারমাণবিক স্থাপনা ও অবকাঠামোতে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের হামলার মাধ্যমে এই সংঘাতের সূচনা। এর জবাবে ইরান বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। গত মাসে ইসলামাবাদে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আলোচনা হলেও কূটনৈতিক প্রচেষ্টাগুলো থমকে আছে। এর মধ্যে গত ১৩ এপ্রিল ইরানি বন্দরে নৌ-অবরোধ আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

নয়া দিল্লির এই বৈঠকটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হলো যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক দশকের মধ্যে প্রথম কোনও মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে চীন সফর করেছেন। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বেইজিংয়ে ব্যস্ত থাকায় ব্রিকস বৈঠকে চীনের প্রতিনিধিত্ব করেন ভারতে নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূত শু ফেইহং। বৈঠকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি, রাশিয়ার সের্গেই ল্যাভরভ, ব্রাজিলের মাউরো ভিয়েরা, দক্ষিণ আফ্রিকার রোনাল্ড লামোলাসহ ইন্দোনেশিয়া, মিসর ও ইথিওপিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা অংশ নেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আবুধাবি রওনা হওয়ার আগে সফরকারী মন্ত্রীদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বদলে সংহতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী খলিফা বিন শাহিন আল মারারকে বৈঠকে পাঠায়।

ইরান-আমিরাত মুখোমুখি

বৈঠকের শুরুতে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি তার আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে আমিরাতের নাম উল্লেখ করা এড়িয়ে যান। পরে ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, এটি কোনও দুর্বলতা ছিল না, বরং ‘জোটের ঐক্য বজায় রাখার স্বার্থে’ তিনি এমনটা করেছিলেন। আরাঘচি ব্রিকস সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান যাতে তারা স্পষ্ট ভাষায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ‘আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন’-এর নিন্দা করে। তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি ব্রিকস একটি ন্যায়সংগত, ভারসাম্যপূর্ণ ও মানবিক বিশ্বব্যবস্থা গঠনে অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হতে পারে, যেখানে পেশিশক্তি কখনও অধিকার হতে পারে না।’

তবে আমিরাতের প্রতিনিধি আল মারার তার বক্তব্যে সরাসরি ইরানকে লক্ষ্য করে কথা বলেন এবং ইরানের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানানোর দাবি তোলেন। এই বাকযুদ্ধ জোটের ভেতরের গভীর ফাটলকে প্রকাশ্যে এনেছে; যেখানে ইরান এবং আমিরাত উভয়েই ব্রিকসের পূর্ণ সদস্য হওয়া সত্ত্বেও একটি সক্রিয় যুদ্ধে একে অপরের মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে।

সব সদস্যের বক্তব্য শেষে আরাঘচি আবারও কথা বলার সুযোগ চান এবং কঠোর ভাষায় বলেন, ‘আমিরাত আমার দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসনে সরাসরি জড়িত ছিল। যখন হামলা শুরু হয়, তারা একটি নিন্দাও জানায়নি।’ তিনি অভিযোগ করেন, আমিরাত তাদের ভূখণ্ড মার্কিন বাহিনীকে ইরানের ওপর হামলার জন্য ব্যবহার করতে দিয়েছে এবং আমিরাতি যুদ্ধবিমান সরাসরি এই হামলায় অংশ নিয়েছে। আরাঘচি আরও বলেন, যুদ্ধের প্রথম দিন মিনাব শহরের একটি স্কুলে হামলায় ১৭০ জন শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনারও নিন্দা জানায়নি আবুধাবি। তিনি দাবি করেন, ইরান আমিরাতের ওপর কোনও হামলা করেনি, কেবল আমিরাতি ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে আঘাত হেনেছে।

আমিরাত এই অভিযোগ সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে। আবুধাবির দাবি, ইরানি হামলায় দেশের অভ্যন্তরে বেসামরিক ও জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে তারা ইরানের পাঠানো ২ হাজার ৮০০-র বেশি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে।

জয়শঙ্করের কূটনীতি

সভাপতির আসন থেকে এই বিরোধ সামাল দিতে গিয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরসহ আন্তর্জাতিক জলপথ দিয়ে ‘নিরাপদ এবং নিরবচ্ছিন্ন বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল’-এর আহ্বান জানান। তিনি স্পষ্ট বলেন, ‘একতরফা নিষেধাজ্ঞা সংলাপের বিকল্প হতে পারে না এবং চাপ কখনও কূটনীতির জায়গা নিতে পারে না।’ একই সঙ্গে তিনি নতুন সদস্যদের মনে করিয়ে দেন যে, ব্রিকসের মসৃণ অগ্রযাত্রার জন্য সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জোটের বিদ্যমান ঐকমত্যকে মেনে চলা জরুরি।

এর আগে গত ২৪ এপ্রিল মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিয়ে নয়া দিল্লিতেই ব্রিকসের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিশেষ দূতদের বৈঠকও কোনও যৌথ ঘোষণা ছাড়া শেষ হয়েছিল। ভারতের সভাপতিত্বে গত ২৮ ফেব্রুয়ারির পর থেকে ব্রিকস এই যুদ্ধ নিয়ে একটিও যৌথ বিবৃতি জারি করতে পারেনি।

এবারের চূড়ান্ত নথিতেও সেই অচলাবস্থার প্রতিফলন ঘটেছে। কোনও পক্ষকে দায়ী না করে বা কারও নাম না নিয়ে কেবল সাধারণ কিছু নীতি, যেমন সংলাপ, সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা এবং বেসামরিক জীবন রক্ষার কথা বলা হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ‘একতরফা জোরপূর্বক নিষেধাজ্ঞা’ আরোপের নিন্দা জানানো হয়েছে নথিতে, যা মূলত ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার দিকেই ইঙ্গিত করে। অবশ্য অন্যান্য এজেন্ডা, যেমন- জ্বালানি সহযোগিতা, বাণিজ্য, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং জলবায়ু পরিবর্তনসহ ৬০টিরও বেশি বিষয়ে সদস্য দেশগুলো একমত হতে পেরেছে।

ব্রিকসের ভবিষ্যৎ ও পাকিস্তানের অবস্থান

পাকিস্তানের সাবেক কূটনীতিক জওহর সালিমের মতে, ব্রিকসের এই ফলাফল মোটেও আশ্চর্যজনক নয়। তিনি বলেন, ‘ব্রিকস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর একটি সংগঠন হলেও এটি মূলত ভিন্ন ভিন্ন বৈদেশিক স্বার্থ, দৃষ্টিভঙ্গি এবং এজেন্ডা সম্পন্ন দেশগুলোর একটি অসম গ্রুপ।’ ইরান যুদ্ধের বিষয়ে কোনও যৌথ অবস্থানে আসা শুরু থেকেই অবাস্তব ছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন। সালিম মনে করেন, এই ঘটনা বৈশ্বিক কূটনীতির একটি বড় পরিবর্তনকে নির্দেশ করে। তিনি বলেন, ‘এই যুগে জোটের রাজনীতি ক্রমশ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে, যেখানে সবচেয়ে শক্তিশালী জোটগুলোও ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, এই পরিস্থিতি পাকিস্তানের কৌশলগত অবস্থানকে সুবিধাজনক করছে। ইসলামাবাদ গত মাসে দুই পক্ষের সঙ্গেই আলোচনা করেছে এবং ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। কোনও স্বল্পমেয়াদী স্বার্থে না ঝুঁকে নীতিগত অবস্থানের কারণে পাকিস্তান এই কূটনৈতিক টানাপোড়েনের সময়ে সফলভাবে নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করতে পেরেছে বলে তিনি দাবি করেন।

সূত্র: আল জাজিরা