যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তিতে সই করেছেন। চুক্তি অনুযায়ী, তেহরান তাদের উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ কমিয়ে আনবে এবং এর বিনিময়ে ওয়াশিংটন ইরানের ওপর থাকা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করবে। এর ফলে ইরান এখন থেকে অবাধে তেল বিক্রি করতে পারবে, যাকে ওয়াশিংটনের একটি বড় ছাড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি এ খবর জানিয়েছে।
মধ্যস্থতায় পাকিস্তান
চুক্তি বাস্তবায়নে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনকারী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ জানিয়েছেন, দুই দেশের নেতারা এতে সই করার সঙ্গে সঙ্গেই যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে হওয়া প্রাথমিক এই চুক্তি কার্যকর হয়েছে।
স্বাক্ষর অনুষ্ঠান
হোয়াইট হাউসের প্রকাশিত এক ভিডিওতে দেখা যায়, ম্যাক্রোঁর পাশে বসে ট্রাম্প চুক্তিতে সই করছেন। পরে তিনি নথি ও কলম পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর হাতে তুলে দেন। সইয়ের আগে ট্রাম্প বলেন, এটি সহজ ছিল না।
নৈশভোজ শেষে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, চুক্তিতে সই হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, এটি একটি সমঝোতা স্মারক। আমার পছন্দ না হলে আমরা আবার গুলি চালানো ও বোমা ফেলায় ফিরে যাব।
অন্যদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, তেহরানে গম্ভীর মুখে ইরানের পক্ষে চুক্তিতে সই করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। সংস্থাটি একটি ছবিও প্রকাশ করেছে, যেখানে পেজেশকিয়ান নিজের এবং ট্রাম্পের স্বাক্ষর সম্বলিত চুক্তির কপিটি উঁচিয়ে ধরে আছেন।
চুক্তির শর্তাবলি
যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তির পূর্ণ পাঠ প্রকাশ না করলেও মার্কিন কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের কাছে খসড়া ভাষা তুলে ধরেছেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমও প্রায় একই ধরনের পাঠ প্রকাশ করেছে।
চুক্তির আওতায় যুদ্ধ বন্ধ হবে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা পুনরায় শুরু হবে এবং বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হবে। যুদ্ধ চলাকালে এই প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছিল।
খসড়া অনুযায়ী, প্রথম দুই মাস কোনও টোল ছাড়াই হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করা যাবে। তবে ভবিষ্যতে ফি আরোপের সম্ভাবনা পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়নি। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরোপিত বিস্তৃত কিছু নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার উদ্যোগ নেবে, যদিও সেগুলো পুরোপুরি বাতিল করা হবে না।
আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও ইসরায়েল
চুক্তিতে লেবাননের আঞ্চলিক অখণ্ডতার প্রতিও সমর্থন জানানো হয়েছে। তবে ইসরায়েলের লেবাননে সামরিক উপস্থিতি নিয়ে এতে মতপার্থক্য রয়েছে। ইরান বলছে, চুক্তি অনুযায়ী ইসরায়েলকে সরে যেতে হবে, কিন্তু ইসরায়েল ইতোমধ্যে সেই শর্ত প্রত্যাখ্যান করেছে।
নিষেধাজ্ঞা ও তেল বিক্রি
পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের মতে, নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহার ও জব্দকৃত সম্পদ ছাড়ের মতো কিছু সুবিধা ধাপে ধাপে কার্যকর হবে এবং তা পারমাণবিক আলোচনার অগ্রগতির সঙ্গে যুক্ত থাকবে। তবে আলোচনার সময়কালেই যুক্তরাষ্ট্র এমন ছাড় দেবে যাতে ইরান অবাধে তেল বিক্রি করতে পারে।
চুক্তি অনুযায়ী, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘের সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পথও উন্মুক্ত হতে পারে, যার মধ্যে অস্ত্র কর্মসূচি ও মানবাধিকার ইস্যুতে আরোপিত নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে। তবে এর সময়সূচি পরে নির্ধারণ করা হবে। এ ছাড়া ইরানের পুনর্গঠনের জন্য অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলার সহায়তার কথাও চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, উপসাগরীয় আরব দেশগুলো এই অর্থ বিনিয়োগ করবে। তবে যুদ্ধের সময় ইরানি হামলায় তাদের ভূখণ্ডে তেল স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এসব দেশ এমন উদ্যোগে কতটা আগ্রহী হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ট্রাম্প বুধবার পুনর্ব্যক্ত করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এই তহবিলে কোনও অর্থ দেবে না। অন্য দেশ চাইলে বিনিয়োগ করতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব
বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও চুক্তিটি গুরুত্বপূর্ণ স্বস্তি বয়ে আনতে পারে। কারণ এর মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া হচ্ছে। প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানির দাম বেড়ে যায় এবং খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যও বৃদ্ধি পায়। চুক্তিতে বলা হয়েছে, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত অবরোধও তুলে নেওয়া হবে এবং ৩০ দিনের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধপূর্ব পর্যায়ের নৌচলাচল পুনরুদ্ধার করা হবে। একই সঙ্গে স্বীকার করা হয়েছে, ওই এলাকায় পেতে রাখা মাইন অপসারণের প্রয়োজন হতে পারে।
ভবিষ্যৎ আলোচনা
চুক্তিতে স্থায়ীভাবে বৈরিতা বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে ৬০ দিনের আলোচনার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
গত কয়েকদিন ধরে চুক্তির বিষয়বস্তু নিয়ে গোপনীয়তা ও বিভ্রান্তি ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা সপ্তাহান্তে ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ডিজিটালভাবে এতে সই করেছেন বলে জানালেও শর্ত প্রকাশ করেননি।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছিল, যাতে তেহরান কখনও পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে। যুদ্ধ চলাকালে ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, হিজবুল্লাহসহ মিত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থন এবং এমনকি ইরানের সরকার পরিবর্তনের কথাও বলেছিলেন।



