জার্মানিতে মুসলিমদের অবস্থান ও অন্তর্ভুক্তি: এক সপ্তাহের সফর
জার্মানিতে মুসলিমদের অবস্থান ও অন্তর্ভুক্তি: সফর

গত এপ্রিলে মেসেঞ্জারে একটি অপরিচিত মেসেজ পান লেখক মীর হুযাইফা আল মামদূহ। প্রেরক জার্মানি দূতাবাসের কর্মকর্তা, তাকে একটি আয়োজনে দাওয়াত দিতে চান। বিদেশ যাওয়ার আগের অভিজ্ঞতা না থাকায় এবং সুইজারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব লুজানের গবেষণা প্রবন্ধ পড়ার আমন্ত্রণে ভিসা না পাওয়ার পর, জার্মানি যাওয়ার এই আমন্ত্রণে তিনি রাজি হন।

জার্মান ফরেন অফিসের আমন্ত্রণ

আলাপের পর জানা যায়, জার্মান ফরেন অফিস তাদের দেশের নানা কর্মকাণ্ড দেখাতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বিশেষজ্ঞদের আমন্ত্রণ জানায় এবং পুরো প্রক্রিয়ার অর্থায়ন করে। এই আয়োজন বাস্তবায়ন করে গ্যেটে ইনস্টিটিউট। আয়োজনের শিরোনাম ছিল ‘রিলিজিয়াস ফ্রিডম অ্যান্ড ইন্টিগ্রেশন ইন জার্মানি: মুসলিম লাইফ ইন জার্মানি’, অর্থাৎ জার্মানির প্রাত্যহিক সামাজিক জীবনে মুসলিমরা তাদের ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে কতটা অন্তর্ভুক্ত হতে পারছে, তা দেখানো। সফরটি ছিল ৬ থেকে ১৩ জুন, সাত দিনের একটি ব্যস্ত সফর।

আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদল

দলে মোট ১১ জন ছিলেন, যারা বাংলাদেশ, ভারত, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, জর্জিয়া, ঘানা, লেবানন ও আইভরি কোস্ট থেকে একজন করে এবং তুরস্ক থেকে দুজন। এঁদের মধ্যে গবেষক, ধর্মবিদ্যাবিদ, স্কুলশিক্ষক, এনজিও কর্মী ও সাংবাদিকরা ছিলেন। সফরে জার্মানির তিনটি শহরে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিভিন্ন অংশের সঙ্গে আলাপ করানো হয়। বেশ কটি মসজিদ ও এডুকেশন সেন্টার পরিদর্শন করা হয়, যার মধ্যে একটি ছিল মুসলিম নারীদের দ্বারা পরিচালিত। একটি ইন্টারফেইথ আয়োজনে ফরেন অফিস, রিলিজিয়ন ও ফরেন পলিসির দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং পার্লামেন্টের এমপিদের সঙ্গে মিটিং হয়। একটি মিউজিয়াম ও আরব কলোনিও ঘুরিয়ে দেখানো হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

জার্মান মুসলমানদের অবস্থা

বর্তমানে জার্মানিতে মুসলিম জনসংখ্যা ৫৫ থেকে ৫৬ লাখ, যা দেশের মোট জনসংখ্যার ৬.৬ থেকে ৬.৭ শতাংশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মুসলমানেরা ‘গেস্ট ওয়ার্কার’ হিসেবে তুরস্ক থেকে যায় এবং বিধ্বস্ত জার্মানি গড়ে তোলায় সহায়তা করে। সেই থেকে তুর্কি মুসলমানদের একটি বড় অংশ জার্মানির নাগরিক। পরে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও সহিংসতার কারণে আরবদের একটি বিশাল অংশ জার্মানিতে পাড়ি জমায়। পাকিস্তানের সহিংসতার শিকার আহমদিয়া সম্প্রদায়েরও একটি বড় কমিউনিটি জার্মানিতে আছে।

মুসলমানদের মধ্যে তুর্কিরা হানাফি, আরবরা সালাফি; এছাড়া শিয়াসহ নানা সম্প্রদায়ের লোকও আছে। জার্মানির মূল সমাজব্যবস্থায় ইসলাম অন্তর্গত কি না, তা নিয়ে দীর্ঘদিন প্রশ্ন ছিল। তবে জার্মান সরকার ও ফরেন অফিসের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বলেন, ‘ইসলাম বিলংস টু জার্মানি’, অর্থাৎ ইসলাম জার্মানির অংশ।

ধর্মীয় স্বাধীনতা ও বৈষম্য

জার্মান সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে সমান সুযোগ–সুবিধা দেয় ধর্ম মানার ও পালন করার। ফলে মুসলমানেরা ক্রমশ উচ্চপদে যাচ্ছেন। লামিয়া কাদুরের মতো মুসলিম নারী এমপি হচ্ছেন। বর্তমানে জার্মানিতে দুই হাজারের বেশি মসজিদ আছে, যার মধ্যে ১০০টির মতো আহমাদিয়া সম্প্রদায়ের। তবে বৈষম্যের শিকারও হচ্ছেন মুসলমানেরা। আরব মুসলিম প্রতিনিধি বলেন, স্কুলে ক্লিনাররা হিজাব পরলে সমস্যা না হলেও শিক্ষক হিসেবে হিজাব পরলে নানা সমস্যা হয়। বড় পদে হিজাবি নারী চাকরির জন্য সিভি জমা দিলে ডাক কম পান। লামিয়া কাদুরও ডানপন্থী সংসদ সদস্যদের কাছ থেকে অস্বস্তিকর মন্তব্যের শিকার হন।

উগ্র ডানপন্থী দল অল্টারনেটিভ ফর জার্মানির (এএফডি) জনপ্রিয়তা বাড়ছে। ২০২৫ সালের ফেডারেল নির্বাচনে দলটি ২০.৮ শতাংশ ভোট পেয়েছিল, এবং সাম্প্রতিক জনমত জরিপে তাদের সমর্থন ২৪ শতাংশের বেশি, কিছু জরিপে ২৮-২৯ শতাংশ পর্যন্ত দেখা গেছে। ফরেন অফিসের এক দায়িত্বশীল ব্যক্তি বলেন, জার্মানির নাৎসি অতীতের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে উগ্র জাতীয়তাবাদ ও বর্জনের রাজনীতির পরিণতি কতটা ভয়াবহ। তিনি বলেন, ‘ওরা যা চাইছে, তা যেকোনো দেশের ইতিহাসে একবার হওয়াটাই বেশ ভারী পড়ে যায়, আমাদের এর মধ্যেই একবার হয়ে গেছে।’

লামিয়া কাদুর বলেন, ‘যদি ওরা ক্ষমতায় আসে, ব্যক্তিগত জীবনে আসলে কী করব, আমি জানি না। হয়তো অন্য কোথাও গিয়ে থাকতে হবে। কিংবা এই দেশে থেকেই লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।’

মসজিদ ভ্রমণ

বার্লিন, এরফুর্ট ও কোলনের তিনটি মসজিদে নিয়ে যাওয়া হয়। বার্লিনের মসজিদটি টার্কিশ স্থাপত্যে তৈরি, সামনে কবরস্থান ও চায়ের ঘর। মসজিদটি তুরস্কের রাষ্ট্রীয় খরচে তৈরি, বিনিময়ে জার্মান সরকার জেরুজালেমে জমি পায়। কোলনের সেন্টার মসজিদটি জার্মান-টার্কিশ কমিউনিটি পরিচালনা করে, যেখানে স্কুলশিক্ষার্থীরা আসে ধর্মীয় সম্প্রীতি শিখতে। এরফুর্টের আহমাদিয়া মসজিদটি পাকিস্তান থেকে আসা আহমাদিয়ারা তৈরি করেছে, ২০ বছর লেগেছে।

তিন ধর্ম এক ছাদের তলায়

বার্লিনের কেন্দ্রে একটি উপাসনালয় তৈরির চেষ্টা চলছে, যেখানে একই ছাদের তলায় মসজিদ, সিনাগগ ও চার্চ থাকবে। আন্তধর্মীয় সম্প্রীতির উদাহরণ হিসেবে এই প্রচেষ্টা চলছে।

জার্মানির ইতিহাস ও আইন

জার্মানরা নিজেদের ইতিহাস সংরক্ষণ করে রেখেছে। টপোগ্রাফি অব টেরর ও হলোকাস্ট মেমোরিয়ালে বিশ্বযুদ্ধের নির্মমতার দলিল সংরক্ষিত। মেমোরিয়ালে লেখা, ‘একবার যেহেতু ঘটেছে এই নির্মমতা, ফলে আবারও ঘটতে পারে।’ জার্মানির লোকেরা আইন মানেন; রাস্তায় লাল বাতি জ্বললে কেউ রাস্তা পার হন না, গাড়ি থামে।

পাবলিক ট্রান্সপোর্ট

জার্মানির পাবলিক ট্রান্সপোর্ট চমৎকার। এসবান, উবান, ট্রাম ও বাসে পুরো দিনের টিকিট করে যেকোনো দিকে যাওয়া যায়। শহরের মধ্যে সবাই কার্ড ব্যবহার করেন।