গাজা ইস্যুতে লেবার পার্টির ভোটব্যাংকে বড় ফাটল
গাজা যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির অবস্থান দলটির দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী ভোটব্যাংকে বড় ধরনের ফাটল ধরিয়েছে। বিশেষ করে মুসলিমপ্রধান নির্বাচনী এলাকাগুলোতে দলটির সাবেক ভোটারদের প্রায় অর্ধেকই এখন লেবার পার্টি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। ২০২৬ সালের জুনে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগের ঘোষণার পর দলটির এই রাজনৈতিক সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠেছে।
স্টারমারের বিতর্কিত মন্তব্য থেকে শুরু
এই সংকটের সূত্রপাত মূলত ২০২৩ সালের অক্টোবরে। গাজায় ইসরাইলের আগ্রাসন শুরুর পর এক সাক্ষাৎকারে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা কিয়ার স্টারমার মন্তব্য করেছিলেন, গাজাবাসীর বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ বন্ধ করার ‘অধিকার’ ইসরাইলের রয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধের শামিল এই মন্তব্যটি ব্রিটিশ মুসলিমসহ লেবার পার্টির মূল ভোটারদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। এর পরিপ্রক্ষিতে দলটির ভেতর ও বাইরে থেকে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়।
ঘটনার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ১৫০ জনেরও বেশি মুসলিম লেবার কাউন্সিলর অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানোর জন্য দলের নেতৃত্বের প্রতি অনুরোধ জানান, যা তৎকালীন সময়ে উপেক্ষিত হয়েছিল।
নির্বাচনে মূল্য চুকাতে হয়েছে
যদিও লেবার পার্টি ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে বড় জয় পেয়ে সরকার গঠন করেছিল, তবে সেটি ছিল দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে কম ভোট শেয়ার নিয়ে গঠিত সংখ্যাগরিষ্ঠ সরকার। গাজা ইস্যুতে অসন্তোষের কারণে মুসলিমপ্রধান বেশ কয়েকটি আসনে লেবার পার্টিকে চরম মূল্য চুকাতে হয়। বিশেষ করে ওয়েস্ট ইয়র্কশায়ারের নবগঠিত ‘ডিউসবারি অ্যান্ড ব্যাটলি’ আসনে লেবার পার্টির পরাজয় ঘটে এবং সেখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী ইকবাল মোহাম্মদ জয়ী হন।
এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতেও। ২০২৪ সালের মে মাসের স্থানীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক নির্বাচন পর্যন্ত ভোটাররা দলে দলে লেবার পার্টি বর্জন করে স্বতন্ত্র ও গ্রিন পার্টির প্রার্থীদের বেছে নিচ্ছেন। কির্কিলস কাউন্সিল নির্বাচনে ব্যাটলি ওয়েস্ট ওয়ার্ড থেকে জয়ী সাবেক লেবার কাউন্সিলর ইউসরা হুসাইন জানান, তার আদর্শ পরিবর্তন হয়নি, বরং লেবার পার্টির দিক পরিবর্তন হওয়ার কারণেই তিনি দল ত্যাগ করেছেন।
দলের নীতি পরিবর্তন ও ভোটারদের প্রতিক্রিয়া
বিশ্লেষকদের মতে, জেরেমি করবিনের আমলের সমাজতান্ত্রিক ও ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থান থেকে সরে এসে কিয়ার স্টারমার দলটিকে যেভাবে অতি-ডানপন্থার দিকে নিয়ে গেছেন, তা লেবার পার্টির জন্য আত্মঘাতী প্রমাণিত হয়েছে। এড মিলিব্যান্ড বা জেরেমি করবিনের মতো সাবেক নেতারা যেখানে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে জোরালো ভূমিকা রেখেছিলেন, সেখানে স্টারমারের ইসরাইলপন্থী নীতি ভোটারদের দূরে ঠেলে দিয়েছে। যদিও গত বছরের শেষের দিকে কানাডা ও ফ্রান্সের পাশাপাশি স্টারমার প্রশাসন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছিল, ততক্ষণে দলটির প্রতি ভোটারদের আস্থার যে ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে গেছে।
সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, গাজায় চলমান গণহত্যার বিরুদ্ধে লেবার পার্টির নিষ্ক্রিয়তার কারণে সাবেক ভোটারদের অর্ধেকেরও বেশি এখন গ্রিন পার্টি, এসএনপি, লিবারেল ডেমোক্র্যাট বা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ভোট দিচ্ছেন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সাম্প্রতিক স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কির্কিলস কাউন্সিলে লেবার পার্টি একটি আসনও ধরে রাখতে পারেনি। সেখানকার ভোটাররা ১১ জন ফিলিস্তিনপন্থী স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং ৫ জন রিফর্ম পার্টির প্রার্থীকে নির্বাচিত করেছেন।
ডিউসবারি অ্যান্ড ব্যাটলি আসনের বর্তমান স্বতন্ত্র এমপি ইকবাল মোহাম্মদের মতে, এই অঞ্চলের মানুষ যুক্তরাজ্যের প্রচলিত দ্বি-দলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। লেবার পার্টি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় বাসিন্দাদের অবমূল্যায়ন করেছে এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি বর্ণবাদ ও দখলদারিত্বে পরোক্ষ মদদ দিয়েছে, যার জবাব ভোটাররা ব্যালটের মাধ্যমে দিয়েছেন।
নতুন নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জ
এই পরিস্থিতিতে লেবার পার্টির সম্ভাব্য নতুন নেতৃত্ব, বিশেষ করে অ্যান্ডি বার্নামের সম্ভাব্য সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো— দেশে ও বিদেশে দলের নীতিতে আমূল পরিবর্তন এনে মুসলিম সমাজ তথা সাধারণ ভোটারদের এই হারানো বিশ্বাস পুনরুদ্ধার করা।



