সুইজারল্যান্ডের লেক লুসার্নে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের উচ্চপর্যায়ের আলোচনার প্রথম দিনের অগ্রগতিকে ‘উৎসাহব্যঞ্জক’ বলে উল্লেখ করেছে মধ্যস্থতাকারী কাতার ও পাকিস্তান। ১৭ জুন স্বাক্ষরিত ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) ভিত্তিতে এই আলোচনা শুরু হয়, যেখানে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের কাঠামো নির্ধারণ করা হয়।
প্রথম দিনের বৈঠক ও যৌথ বিবৃতি
গত রোববার টানা ১৮ ঘণ্টার বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা অংশ নেন। বৈঠক শেষে কাতার ও পাকিস্তানের যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়, সংঘাত এড়াতে একটি ‘ডি-কনফ্লিকশন সেল’ গঠন করা হয়েছে, যার লক্ষ্য লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বন্ধে কাজ করা। পাশাপাশি একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি ও সরাসরি যোগাযোগ চ্যানেল চালু করা হয়েছে, যা ভবিষ্যৎ আলোচনাকে সহায়তা করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তাঁর সঙ্গে ছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার ও বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। ইরানের পক্ষে নেতৃত্ব দেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি।
৬০ দিনের পথনকশা ও কারিগরি আলোচনা
বিবৃতিতে বলা হয়, উচ্চপর্যায়ের কমিটি ‘৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর একটি পথনকশা’ নিয়ে একমত হয়েছে। আগামী দুই মাসে আরও কারিগরি আলোচনা চলবে। আটলান্টিক কাউন্সিলের অনাবাসিক জ্যেষ্ঠ ফেলো থমাস ওয়ারিক আল–জাজিরাকে বলেন, ‘পরবর্তী ধাপের কারিগরি আলোচনা রাজনৈতিক সমঝোতার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন হতে পারে এবং ৬০ দিনের সময়সীমার চেয়েও বেশি সময় লাগতে পারে।’
এখনো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অমীমাংসিত রয়েছে, যেমন—ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ চালিয়ে যেতে পারবে কি না, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুতের ভবিষ্যৎ, আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের পরিসর ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সময়সূচি।
পারমাণবিক ইস্যু ও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ
ওয়ারিক বলেন, ‘সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অপসারণ বা মান কমিয়ে ফেলা। এতে কয়েক হাজার মানুষ লাগতে পারে। সম্ভবত এক হাজার মার্কিন নাগরিককে ইরানের কিছু অত্যন্ত সংবেদনশীল পারমাণবিক স্থাপনায় যেতে হতে পারে...আমি কল্পনাও করতে পারি না, ইরান এমন একটি ধারণা নিয়ে খুব বেশি খুশি হতে পারবে।’
ভ্যান্স সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘ইরানিরা আইএইএর পরিদর্শকদের তাদের দেশে ফিরে আসার আমন্ত্রণ জানাতে সম্মত হয়েছে। এটি মার্কিন জনগণের জন্য একটি বড় অগ্রগতি। এটি ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি চিরতরে বন্ধ করার প্রথম ধাপ।’ আইএইএ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কিছু আলোচনা সোমবারই শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি ও লেবানন ইস্যু
পক্ষগুলো হরমুজ প্রণালি নিয়ে একটি ‘যোগাযোগব্যবস্থা’ তৈরি করেছে, যার লক্ষ্য দুর্ঘটনা ও ভুল–বোঝাবুঝি এড়িয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখা। এই প্রণালি দিয়ে যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হতো। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের যৌথ হামলার মুখে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দিয়েছিল ইরান, যা বিশ্বজুড়ে জ্বালানিসংকট তৈরি করেছিল।
লেবাননের জন্য গঠিত ডি-কনফ্লিকশন সেলের উদ্দেশ্য ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বন্ধের শর্ত বাস্তবায়নে সহায়তা করা। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি লেবাননের যুদ্ধ অবসানের পথে ‘বড় অগ্রগতি’ ঘোষণা করলেও সংঘাত এড়াতে সেলের কার্যকারিতা নিয়ে সতর্ক করেন।
বিশ্লেষকদের প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ
সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জোই হুড বলেন, ‘এটি ইরানকে কার্যত লেবাননের ওপর ভেটো ক্ষমতা দিচ্ছে। মনে হচ্ছে সমঝোতা স্মারক যেন বলছে, আমরা ইরানের প্রক্সি শক্তিসহ তাদের আঞ্চলিক নেতৃত্বের ভূমিকা মেনে নিচ্ছি।’ অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল মার্ক কিমিট বলেন, লেবাননকে বৃহত্তর আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করায় বিষয়টি ‘অত্যন্ত জটিল’ হয়ে পড়েছে।
ভ্যান্স বলেন, ‘গতকাল ছিল খুব, খুব ভালো একটি দিন। আমরা অনেক ভালো অগ্রগতি করেছি। আমরা ঠিক সেটাই করেছি, যা আমরা করতে চেয়েছিলাম।’ তিনি আরও বলেন, ‘চূড়ান্ত চুক্তি হলো একটি বাড়ির মতো। আমরা এর ভিত্তি তৈরি করেছি। আমরা এখনো বাড়ি তৈরি করিনি, তবে একটি ভালো ভিত্তি স্থাপন করেছি।’ সামনে এখনো অনেক কাজ বাকি রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।



