শিলাবৃষ্টির ঘটনা তুলনামূলকভাবে কম ঘটলেও এর ধ্বংসক্ষমতা মারাত্মক। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে শিলাবৃষ্টির চরিত্র ও আচরণ বদলে যাওয়ার আশঙ্কাজনক চিত্র সম্প্রতি দুটি গবেষণায় তুলে ধরা হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শিলাবৃষ্টি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক এবং শিলা বড় আকারের হতে পারে।
গবেষণার ফলাফল
নেচার ক্লাইমেট চেঞ্জ সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়ার কারণে শিলাবৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ এখন মেরু অঞ্চলের দিকে ধাবিত হচ্ছে। একই সঙ্গে এর সময়কাল গ্রীষ্ম থেকে শীতকালের দিকে কিছুটা সরে যাচ্ছে। এ বিষয়ে অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী টিমোথি রপাস জানিয়েছেন, শিলাবৃষ্টির অনুকূল পরিবেশের সময়কাল পরিবর্তনের ফলে উত্তর ইউরোপ, কানাডা, দক্ষিণ-পূর্ব অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের সাউথ আইল্যান্ডের মতো অঞ্চলগুলোতে শিলাবৃষ্টির প্রকোপ অনেক বেড়ে যেতে পারে।
চীনের পিকিং ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানী শিয়ি ঝাংয়ের নেতৃত্বে পরিচালিত আরেকটি গবেষণায় বলা হয়েছে, শিলাবৃষ্টির কারণে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ভবিষ্যতে অনেক গুণ বৃদ্ধি পাবে। গবেষণাপত্রে যে ম্যাপ প্রকাশ করেছেন বিজ্ঞানীরা, সেখানে বাংলাদেশের শিলাবৃষ্টির ধরনেও পরিবর্তন দেখা গেছে।
শিলাবৃষ্টির সৃষ্টি প্রক্রিয়া
শিলাবৃষ্টির সৃষ্টি প্রক্রিয়ার পেছনে মূলত শক্তিশালী বজ্রঝড় কাজ করে। এর জন্য বায়ুমণ্ডলে প্রয়োজন একটি শক্তিশালী ঊর্ধ্বমুখী বায়ুপ্রবাহ। কোনো নির্দিষ্ট এলাকার উষ্ণ ও হালকা বাতাস যখন ওপরের দিকে উঠে যায়, তখন তা সঙ্গে করে প্রচুর জলীয়বাষ্প নিয়ে যায়। এই বাষ্প ঘনীভূত হয়ে ক্ষুদ্র জলকণায় পরিণত হয় এবং মেঘের সৃষ্টি করে। মেঘের ভেতরে এই জলকণাগুলো যখন একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খায় এবং সেখানে যদি তাপমাত্রা পর্যাপ্ত পরিমাণে কম থাকে, তবে তরল ফোঁটাগুলো জমে বরফকণায় রূপ নেয়। এই বরফকণাগুলো মাটিতে পড়ে যাওয়ার আগে যতক্ষণ পর্যন্ত শক্তিশালী ঊর্ধ্বমুখী বাতাস তাদের ওপরের আকাশে ধরে রাখতে পারে, তারা আকারে তত বড় হতে থাকে। বাতাসের গতি ও উচ্চতার তারতম্য এই ঝড়কে আরও শক্তিশালী করে তোলে, যা বড় আকারের শিলা তৈরিতে সাহায্য করে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বায়ুমণ্ডলে একদিকে যেমন তাপমাত্রা বাড়ছে, অন্যদিকে আর্দ্রতা বা জলীয়বাষ্পের পরিমাণও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই অতিরিক্ত আর্দ্রতাই মূলত ঝড়ের জ্বালানি হিসেবে কাজ করে। উষ্ণ বায়ুমণ্ডল আরও শক্তিশালী ঊর্ধ্বমুখী বায়ুপ্রবাহ তৈরি করতে পারে, যা আকাশে অনেক বড় আকারের শিলাখণ্ডকে ধরে রাখতে সক্ষম। তবে এখানে একটি বিপরীতমুখী প্রক্রিয়াও কাজ করে। বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বেশি থাকায় আকাশ থেকে নিচে পড়ার সময় শিলাগুলো দ্রুত গলতে শুরু করে। এর ফলে অনেক ছোট শিলা মাটিতে পৌঁছানোর আগেই পুরোপুরি পানিতে পরিণত হয়। এই দুই বিপরীতমুখী প্রভাবের কারণে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, ভবিষ্যতে সামগ্রিকভাবে শিলাবৃষ্টির সংখ্যা কমে যাবে, কিন্তু যখনই শিলাবৃষ্টি হবে, তখন শিলার আকার হবে অনেক বড়।
গবেষণায় আটটি জলবায়ু মডেলের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২ ডিগ্রি থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে শিলাবৃষ্টির প্রবণতা মধ্য-অক্ষাংশ থেকে মেরু অঞ্চলের দিকে সরে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের ফলে উত্তর ইউরোপ, কানাডা, আমেরিকার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল ও নিউজিল্যান্ডে শিলাবৃষ্টির প্রকোপ বাড়বে। বিপরীতে উত্তর অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকার বেশির ভাগ অংশ, দক্ষিণ ভারত এবং দক্ষিণ-পূর্ব চীনে এর প্রকোপ কমে আসবে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, গ্রীষ্মকালের তুলনায় শীতকালে শিলাবৃষ্টির সম্ভাবনা বাড়ছে।



