ইরান যুদ্ধের সুযোগে তুরস্কের বিনিয়োগ আকর্ষণ: কর সুবিধা ও চ্যালেঞ্জ
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলো ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক বিনিয়োগকারী ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজ দেশে টানতে সক্রিয় উদ্যোগ নিচ্ছে তুরস্ক। মিডল ইস্ট আই-এর সূত্র অনুযায়ী, তুরস্কের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জানিয়েছেন, ইস্তাম্বুল ফিন্যান্স সেন্টারের মতো বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে কর সুবিধাসহ নানা সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে আঙ্কারা।
কর সুবিধার বিস্তারিত
তুরস্কের কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন, ইরান সম্ভবত আবুধাবি ও দুবাইয়ের আন্তর্জাতিক কোম্পানি ও আর্থিক কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করতে পারে। এই আশঙ্কায় অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যক্রম তুরস্কে সরিয়ে নিতে উৎসাহিত হতে পারে। বর্তমানে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোয় আন্তর্জাতিক ব্যাংক, আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোম্পানি, ডেটা সেন্টার ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় ধরনের বিনিয়োগ রয়েছে।
ইস্তাম্বুলের বাণিজ্যিক এলাকা আইএফসিতে ব্যাংক ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে ইতিমধ্যেই নানা কর সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। এখান থেকে বিদেশে পাঠানো আর্থিক সেবার আয় পুরোপুরি করমুক্ত। এ ছাড়া এসব লেনদেনে কোনো বাড়তি ফি বা চার্জও দিতে হয় না। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মীদের জন্যও রয়েছে বড় কর সুবিধা। প্রবাসে কাজের মেয়াদের ওপর ভিত্তি করে তাঁদের মাসিক বেতনের ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত আয়কর ছাড় দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বৈঠক ও ইঙ্গিত
তুরস্কে বিদেশি কোম্পানিগুলোর আগ্রহ বৃদ্ধি পাওয়ার কিছু প্রাথমিক ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে ইস্তাম্বুলে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের আয়োজনে ৪০ জন বিশ্বখ্যাত প্রধান নির্বাহীর সঙ্গে বৈঠক করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। এসব কোম্পানির সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ শতকোটি ডলার। এই বৈঠকের অন্যতম আয়োজক ছিলেন বিশ্বের বৃহত্তম সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকরকের প্রধান নির্বাহী ল্যারি ফিঙ্ক।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট অ্যালোইস জুইঙ্গি বলেন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও উৎপাদন খাতে তুরস্কের কৌশলগত ভূমিকা ক্রমেই বাড়ছে। তুরস্কবিষয়ক বিশেষজ্ঞ জেরেন কেনার মনে করেন, এই বৈঠকের মধ্য দিয়ে এরদোয়ানের সঙ্গে দাভোসের দূরত্ব কমানোর চেষ্টা করছে ডব্লিউইএফ। তিনি বলেন, নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তুরস্কের অর্থনীতির ওপর আস্থার প্রতিফলন হিসেবে বৈঠকটিকে দেখা যেতে পারে।
চ্যালেঞ্জ ও বাধাসমূহ
সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক বিনিয়োগকারী ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে তুরস্কে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেও বিশ্লেষক ও বিনিয়োগকারীদের মতে, এই লক্ষ্য অর্জনে তুরস্ককে বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে হবে। প্রথমত, তুরস্কে মূল্যস্ফীতি এখন বেশ চড়া। চলতি বছর এই হার ২৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাশাপাশি বাড়ছে বাণিজ্যঘাটতিও।
তবে বিনিয়োগকারীদের বড় দুশ্চিন্তা আইনের শাসনের অভাব নিয়ে। একজন আন্তর্জাতিক ব্যাংকার বলেন, তুরস্কের আদালতের ওপর আসলে কারও কোনো আস্থা নেই। উদাহরণ হিসেবে দুবাই ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স সেন্টারের কথা বলা যাক, সেখানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাধারণ আইনের বাইরে নিজস্ব দেওয়ানি ও বাণিজ্যিক আইন চলে। তুরস্কে এ ধরনের কোনো স্বতন্ত্র আইনি ব্যবস্থা চালু করা বেশ বিতর্কিত হতে পারে।
তুলনামূলক বিশ্লেষণ ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
বৈশ্বিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আন্থোসিস গ্রুপের ভূরাজনীতি বিশেষজ্ঞ গুনেয় ইলদিজ বলেন, ইস্তাম্বুল ফিন্যান্স সেন্টারে ২০৩১ সাল পর্যন্ত ব্যাংকিং সেবায় কোনো কর দিতে হবে না। কাগজে-কলমে এটি দুবাইয়ের চেয়েও ভালো প্রস্তাব, কারণ দুবাইয়ে ব্যাংক ও বিমা প্রতিষ্ঠানকে ৯ শতাংশ কর দিতে হয়। তবে ইলদিজ মনে করেন, শুধু কর ছাড়ই যথেষ্ট নয়। বিনিয়োগকারীরা তুর্কি লিরার দরপতন, মূল্যস্ফীতি ও নিম্ন ক্রেডিট রেটিং নিয়ে চিন্তিত।
তুরস্কের সবচেয়ে বড় শক্তি এর উৎপাদন খাত। এ অঞ্চলে তুরস্ক এখন অন্যতম শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। তুর্কি অর্থনীতিবিদ গুভেন সাক বলেন, গৃহযুদ্ধের কারণে বৈরুত যে সম্ভাবনা হারিয়েছিল, দুবাই মূলত সেই শূন্যস্থান পূরণ করেছে। এখন সঠিক সুযোগ-সুবিধা দিলে আরব আমিরাতের জেবল আলী ফ্রি জোনে থাকা বড় চীনা বিনিয়োগকারীদের তুরস্ক টানতে পারবে।
বিশেষজ্ঞ গুনেয় ইলদিজ অবশ্য সব শহরে ঢালাও সুবিধা দেওয়ার বিপক্ষে। তাঁর মতে, এতে বিনিয়োগকারীদের কাছে ভুল বার্তা যেতে পারে। তিনি ইস্তাম্বুল ফিন্যান্স সেন্টারকে মূল কেন্দ্র রেখে অন্যান্য ছোট শহরকে বিশেষায়িত ফিনটেক হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরামর্শ দেন। ইলদিজ আরও বলেন, দুবাইয়ের যা নেই, তুরস্কের সেই বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার রয়েছে। ৮ কোটি ৫০ লাখ মানুষের এই দেশে বিমা, পেনশন ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা খাত এখনো সেভাবে বিকশিত হয়নি।
সামগ্রিক মূল্যায়ন
ইউরোপীয় আরেক বিনিয়োগ পরামর্শক বলেন, সঠিক কৌশল প্রণয়ন ও তা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বিনিয়োগকারীদের টানা সম্ভব। তবে এ জন্য তুরস্ককে আগে নিজের ঘর সামলাতে হবে। দেশজুড়ে বিরোধী মেয়রদের বরখাস্ত ও ইস্তাম্বুলের মেয়র একরেম ইমামোলুকে গ্রেপ্তারের ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করে ওই পরামর্শক বলেন, যত দিন এরদোয়ানের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক লক্ষ্যই প্রাধান্য পাবে, তত দিন এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সম্ভাবনা ক্ষীণ।
সামগ্রিকভাবে, তুরস্ক ইরান যুদ্ধের সুযোগে বিনিয়োগ আকর্ষণে কর সুবিধা ও কৌশলগত উদ্যোগ নিলেও মূল্যস্ফীতি, আইনের শাসনের অভাব ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে। ভবিষ্যতে এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে পারলে তুরস্ক পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের জন্য একটি বিকল্প বিনিয়োগ গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে।



