ইরানের ওপর মার্কিন হামলার কারণে বিশ্বের তেলের বাজার বড় সংকটময় মুহূর্ত পার করছে। এই চাপ সামলাতে এবং তেলের বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে নতুন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। রবিবার গৃহীত এই পদক্ষেপের মাধ্যমে তেলের উৎপাদন বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে রাশিয়া ও সৌদি আরবসহ ওপেক প্লাসভুক্ত সাতটি দেশ। এদিকে ইরান যুদ্ধ শেষ হলে জ্বালানির দাম কমবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট।
মধ্যপ্রাচ্যের তেল স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত
যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন বাহিনীর অবরোধ আরোপ করায় বৈশ্বিক এ সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে ২৮ এপ্রিল ওপেক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বে তেল সরবরাহে ঘাটতি পূরণে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংবাদ প্রকাশ করেছে সৌদি প্রেস এজেন্সি।
জুন থেকে উৎপাদন বৃদ্ধি
ওপেক প্লাস দেশগুলো জানিয়েছে, জুন মাস থেকে উৎপাদন বৃদ্ধি শুরু হবে এবং এর বেশির ভাগই আসবে সৌদি আরব ও রাশিয়া থেকে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, রবিবার সৌদি আরব, রাশিয়া, ইরাক, কুয়েত, কাজাখস্তান, আলজেরিয়া ও ওমান ভার্চুয়াল বৈঠকে মিলিত হয়। এই বৈঠকের সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্রতিদিন ১ লাখ ৮৮ হাজার ব্যারেল তেল উৎপাদন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব
হিউস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্বালানি অর্থনীতিবিদ এড হির্স আগে দ্য ন্যাশনাল নিউজ ডেস্ককে বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালি বিশ্ব তেল সরবরাহের জন্য একটি সংকীর্ণ পথ। এই জলসীমা দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশের বেশি তেল রপ্তানি করা হয়। হির্স বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে যে কোনো সংঘাতের ক্ষেত্রে ইরান প্রণালিটি বন্ধ করার হুমকি দিতে পারে। এই ঝুঁকি আমরা জানতাম। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ থেকে ২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেল এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ। এর বেশির ভাগই যায় এশিয়ার দেশগুলোতে।
যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি
যুদ্ধের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি খাতেও পড়েছে। রবিবার পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন গ্যাসের গড় মূল্য দাঁড়িয়েছে ৪.৪৫ ডলারে, যা ইরানে যুদ্ধ শুরুর আগে ছিল ২.৯৮ ডলার। এদিকে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের চলমান সংঘাতের কারণে বর্তমানে জ্বালানির দাম বাড়লেও বছরের শেষের দিকে তা কমে আসবে বলে প্রত্যাশা করেছেন মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। রবিবার মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজের বিজনেস নেটওয়ার্কের 'সানডে মর্নিং ফিউচারস' অনুষ্ঠানে এই প্রত্যাশা প্রকাশ করেন তিনি।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বলেন, এই সংঘাতের পরবর্তী পর্যায়ে তেলের দাম অনেক কম হতে যাচ্ছে। সংঘাত অব্যাহত থাকায় বর্তমানে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে পরিস্থিতি শান্ত হলে তা আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসবে বলে প্রত্যাশা করছেন বেসেন্ট।
যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের দাম চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ
আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসোলিনের গড় দাম গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে। এএএ বলছে, গত মঙ্গলবার খুচরা পর্যায়ে গ্যাসোলিনের গড় দাম ৭ সেন্ট বেড়ে প্রতি গ্যালন ৪ দশমিক ১৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে; যা এক মাসের মধ্যে একদিনে সর্বোচ্চ বৃদ্ধির রেকর্ড। ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে এখন পর্যন্ত গ্যাসোলিনের দাম প্রতি গ্যালনে ১ দশমিক ১৯ ডলার কিংবা ৪০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ জলপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় জ্বালানি ব্যয় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এদিকে, এনার্জি সার্ভিস ফার্ম বেকার হিউজ গত শুক্রবার বলেছে, মার্কিন জ্বালানি কোম্পানিগুলো টানা দ্বিতীয় সপ্তাহের মতো তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের খনন যন্ত্র সংখ্যা বাড়িয়েছে। গত মার্চের মাঝামাঝি সময়ের পর এই প্রথম টানা দুই সপ্তাহ যন্ত্র সংখ্যা বাড়ানো হয়।



