ইরানের অর্থনীতি যুদ্ধের ধাক্কায় স্থবির, লাখ লাখ মানুষ বেকার
ইরানের অর্থনীতি যুদ্ধের ধাক্কায় স্থবির, বেকার লাখ লাখ

ইরানের অর্থনীতির হৃদপিণ্ড হিসেবে পরিচিত কার্পেট শিল্প আজ প্রায় স্তব্ধ। দুধ ও মাখনের প্যাকেজিংয়ের সংকট দেখা দিয়েছে, এমনকি দেশটির শিল্প উৎপাদনের মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত বিশাল স্টিল মিলগুলোও এখন নীরব। যুদ্ধের পাঁচ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা অবিরাম বোমাবর্ষণে ইরানের অর্থনীতির যে ছবি ফুটে উঠেছে, তা যেমন ভয়াবহ, তেমনি উদ্বেগজনক। হাজার হাজার কারখানা ধ্বংস হওয়ার পর দেশটিতে এখন লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে, আর বাজারে নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে।

প্রতিরোধের কৌশল

এই প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব একটি দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণকে তারা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য একটি 'অস্ত্র' হিসেবে দেখছেন। তেহরান বলছে, অবরোধ তুলে নেওয়া এবং যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ তারা খুলবে না। তাদের বিশ্বাস, কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে নিজেকে স্বনির্ভর করে গড়ে তোলা ইরানের অর্থনীতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ধৈর্যের চেয়ে বেশি সময় টিকে থাকতে পারবে।

কীসের সংকট?

ব্রান্দেইস ইউনিভার্সিটির রিসার্চ ফেলো এবং অর্থনীতিবিদ হাদি কাহালজাদেহর মতে, বিমান হামলায় ইরানের ২০ হাজার কারখানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা দেশটির মোট উৎপাদন ইউনিটের প্রায় ২০ শতাংশ। হামলার শিকার হওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ইরানের বৃহত্তম ওষুধ কোম্পানি তোফিগ দারু, যা ক্যানসারের ওষুধসহ জীবন রক্ষাকারী ওষুধ উৎপাদন করত। এছাড়া অ্যালুমিনিয়াম ও সিমেন্ট কারখানাও রেহাই পায়নি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

ইরানের সবচেয়ে বড় স্টিল ও পেট্রোকেমিক্যাল কারখানাগুলোতে চালানো বিমান হামলা অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। মোবারকেহ স্টিল ও খুজেস্তান স্টিলের মতো বড় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে। ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা জামারান-এর তথ্য অনুযায়ী, ৫০টির বেশি পেট্রোকেমিক্যাল কমপ্লেক্স বন্ধ হয়ে গেছে।

ভুক্তভোগী কারা?

যুদ্ধে সৃষ্ট এই অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থানে। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, উপ-শ্রমমন্ত্রী গোলামহোসেইন মোহাম্মাদী জানিয়েছেন, যুদ্ধের কারণে অন্তত ১০ লাখ মানুষ সরাসরি চাকরি হারিয়েছেন। অর্থনীতিবিদ হাদি কাহালজাদেহর মতে, এর প্রভাবে ১০ থেকে ১ কোটি ২০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ঝুঁকির মুখে, যা ইরানের মোট শ্রমশক্তির প্রায় অর্ধেক।

বাজারে নিত্যপণ্যের দাম লাফিয়ে বাড়ছে। গত এক মাসে মুরগির দাম বেড়েছে ৭৫ শতাংশ, আর গরু ও খাসির মাংসের দাম বেড়েছে ৬৮ শতাংশ। দুগ্ধজাত পণ্যের দামও অর্ধেকের বেশি বেড়েছে।

ইরানের কার্পেট শিল্পের কেন্দ্রস্থল কাশানের এক কার্পেট ব্যবসায়ীর ছেলের ভাষ্যমতে, ওই শিল্পাঞ্চলের ৮০ শতাংশ কারখানা এখন বন্ধ। তিনি বলেন, আমার বাবাকে এর আগে কখনও এতটা ভেঙে পড়তে দেখিনি। তার পারিবারিক কারখানায় ২০ থেকে ৩০ জন কর্মী কাজ করতেন, কিন্তু এখন উৎপাদন শূন্যের কোঠায়।

শিল্পের প্রতিটি খাতে অস্থিরতা

ভেন্টিলেশন ও এয়ার কন্ডিশন ফ্যাক্টরির মালিক মেহদি বোস্তানচি বলেন, তার কারখানা এখনও চালু থাকলেও নির্মাণ খাতের সংকটে তারা বড় ধাক্কা খাচ্ছেন। কারণ ইরানের নির্মাণ খাত ব্যাপকভাবে পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পের ওপর নির্ভরশীল। এই শিল্পের সংকট মানেই এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি খাতের স্থবিরতা।

এক রাসায়নিক প্রকৌশলী জানান, তার কোম্পানি প্রকল্পের কাজ বন্ধ করতে বাধ্য হওয়ায় ১ হাজার মানুষ কর্মসংস্থান হারিয়েছে এবং তিনি নিজেও তাদের ১৮০ জন হেডকোয়ার্টার কর্মীর অর্ধেককে ছাঁটাই করতে দেখেছেন। যুদ্ধের ঠিক আগে চাকরি ছেড়ে দেওয়া তেহরানের এক প্রকৌশলী বলেন, আমি সমাজের শীর্ষ ১ শতাংশের মধ্যে থাকা সত্ত্বেও এখন বেকার। আমার ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন।

সংকটের শেষ কোথায়?

বোর্স অ্যান্ড বাজার ফাউন্ডেশনের প্রধান ও অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞ এসফান্দিয়ার বাতমঙ্গলিচের মতে, ইরান পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে তাদের কাছে আট মাসের জন্য প্রয়োজনীয় ইলেকট্রিক্যাল যন্ত্রপাতি, ছয় মাসের সিমেন্ট এবং চার মাসের স্টিল ও লোহার মজুদ ছিল।

তবে এই সংকটের মূলে রয়েছে পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পে স্থবিরতা, যা দেশটির পুরো অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় অনলাইন ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল মাঝারি মানের ব্যবসায়ীরাও ধ্বংসের মুখে। মার্কিন নৌ-অবরোধ ইরানের আমদানি ও তেল রফতানিকে কার্যত রুদ্ধ করে দিয়েছে, যা দেশটির জন্য বিলিয়ন ডলারের রাজস্ব আয়ের পথ বন্ধ করেছে।

যদিও সরকার বেকারত্ব বিমা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু সামাজিক নিরাপত্তা খাতের তহবিল পেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় সেখানেও টান পড়েছে। কারখানা মালিক বোস্তানচির মতে, যুদ্ধ শেষ হলে অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে পারে, কিন্তু যদি কোনও চুক্তির মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞাগুলো তুলে নেওয়া না যায়, তবে আশাবাদী হওয়ার মতো কোনও সুযোগ নেই।