ট্রাম্পের দাবি: ইরান প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রের তেল রপ্তানি বাড়ছে
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাম্প্রতিক এক পোস্টে দাবি করেছেন যে ইরানের নেতৃত্বের কারণে ‘শত শত জাহাজ’ তেলসমৃদ্ধ মার্কিন অঙ্গরাজ্যগুলোর দিকে চলে আসছে। ট্রাম্পের এই বক্তব্য টেক্সাস, লুইজিয়ানা ও আলাস্কার মতো অঙ্গরাজ্যগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে, যদিও তিনি ঠিক কোন ধরনের জাহাজের কথা বলেছেন তা স্পষ্ট নয়।
হরমুজ প্রণালি বন্ধের প্রভাব
জাহাজ পরিবহন ও বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের চাহিদা প্রকৃত অর্থেই বেড়েছে। হরমুজ প্রণালি উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল পরিবহনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ, কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই পথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে।
এই প্রণালির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের তেল সংগ্রহে বাধা পড়ায় আমদানিকারকদের বিকল্প সরবরাহকারীর দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে। মেরিন অ্যানালিটিকস প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৭১টি অপরিশোধিত তেলবাহী বৃহৎ জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের অভিমুখে যাত্রা করেছে, যেখানে গত বছর গড়ে প্রতিদিন এ সংখ্যা ছিল মাত্র ২৭টি।
যুক্তরাষ্ট্রের তেল রপ্তানি বৃদ্ধি
বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান আর্গাস মিডিয়ার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ক্রুড ট্যাংকার ভাড়া নির্ধারণ বিভাগের প্রধান ডেভিড হেডন বলেন, ইউরোপ ও এশিয়ার ক্রেতারা তেলের ঘাটতি পূরণে আটলান্টিক অঞ্চল থেকে তেল নিচ্ছেন। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় উপকূল থেকে তেল সংগ্রহ তাদের কাছে সহজলভ্য বলে মনে হচ্ছে, ফলে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ছে।
সামুদ্রিক গবেষণা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ড্রিউরির তথ্যমতে, ১০ এপ্রিল শেষ হওয়া সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেল রপ্তানি দৈনিক ৫২ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে, যা গত সাত মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। এপ্রিল মাসে এই রপ্তানি দৈনিক প্রায় ৫২ লাখ ব্যারেলে পৌঁছাতে পারে বলে কেপলারের বিশ্লেষক ম্যাট স্মিথ উল্লেখ করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের নিট রপ্তানিকারক হওয়ার সম্ভাবনা
বাস্তবতা হলো, ইরান যুদ্ধের প্রভাবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সুবিধা হয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি এই প্রথম আমদানিকে প্রায় ছাড়িয়ে গিয়েছিল, অর্থাৎ তারা নিট রপ্তানিকারক হওয়ার কাছাকাছি চলে গিয়েছিল।
এ সময় এশিয়া ও ইউরোপের ক্রেতারা তেলের বিকল্প উৎসের খোঁজে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকে পড়ায় দেশটির তেল রপ্তানি প্রায় রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে যায়। বিশ্লেষক ও ব্যবসায়ীদের মতে, পাইপলাইনের সক্ষমতা ও জাহাজের সীমাবদ্ধতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র দৈনিক সর্বোচ্চ প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত তেল রপ্তানি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের তেল উৎপাদনে শীর্ষ অবস্থান
তেল উৎপাদনে এখন শীর্ষ স্থানে আছে যুক্তরাষ্ট্র। ভিজ্যুয়াল ক্যাপিটালিস্টের তথ্যানুসারে, তাদের দৈনিক উৎপাদন ১৩ দশমিক ৫৮ মিলিয়ন বা ১ কোটি ৩৫ লাখ ব্যারেল, যা বৈশ্বিক তেল উৎপাদনে ১৬ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ হিস্যা রাখে।
মূলত গত এক দশকে শেল অয়েল বিপ্লবের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি খাতে যে রূপান্তর ঘটেছে, এ পরিসংখ্যানে তারই প্রতিফলন ঘটেছে। বিশেষ করে টেক্সাস ও নিউ মেক্সিকো অঞ্চলের পারমিয়ান বেসিন এখন দেশটির তেল উৎপাদনের কেন্দ্রবিন্দু। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, যেমন হরাইজন্টাল ড্রিলিং ও হাইড্রলিক ফ্র্যাকচারিং পদ্ধতির কারণে তাদের তেল উৎপাদন এতটা বেড়েছে।
ফলে একসময় তেল আমদানিনির্ভর যুক্তরাষ্ট্র এখন বৈশ্বিক জ্বালানির বাজারে প্রভাবশালী উৎপাদক ও রপ্তানিকারক শক্তিতে পরিণত হয়েছে, যা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।



