রাজধানীর ‘ব্যাংকপাড়া’ হিসেবে পরিচিত মতিঝিল এলাকায় হঠাৎ করেই দেয়ালে দেয়ালে সাঁটা পোস্টার ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে নতুন বিতর্ক। এসব পোস্টারে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডকে কেন্দ্র করে গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছে শিল্পগোষ্ঠী এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে।
পোস্টারগুলোতে ব্যাংক দখল, অর্থপাচার, জোরপূর্বক মালিকানা পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের মতো সংবেদনশীল অভিযোগ তুলে সাধারণ মানুষকে ‘গণপ্রতিরোধে’ অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিষয়টি ইতোমধ্যেই আর্থিক খাত ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
পোস্টারে কী বলা হয়েছে
পোস্টারগুলোতে দাবি করা হয়েছে, রাষ্ট্রযন্ত্রের সহায়তায় এস আলম গ্রুপ দেশের ইতিহাসের ‘বৃহত্তম ব্যাংক লুট’ সংঘটিত করেছে। এতে বলা হয়— শতাধিক দেশের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করা হয়েছে, শত শত ‘ছায়া কোম্পানি’র মাধ্যমে ব্যাংক থেকে অর্থ সরানো হয়েছে, জোরপূর্বক পদত্যাগ ও মালিকানা পরিবর্তনের মাধ্যমে ব্যাংকটি দখল করা হয়েছে।
এছাড়া ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ ঋণ এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়। পোস্টারে আরও দাবি করা হয়েছে, ব্যাংক দখলের পর বিপুলসংখ্যক নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যাদের একটি বড় অংশ নির্দিষ্ট একটি এলাকার বাসিন্দা।
অর্থপাচার ও সম্পদ গঠনের অভিযোগ
পোস্টারে উল্লেখ করা হয়েছে, ব্যাংক থেকে নেওয়া অর্থ বিদেশে পাচার করে সিঙ্গাপুর, সাইপ্রাস, দুবাই, তুরস্ক এবং ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসের মতো স্থানে সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে। এসব সম্পদের মধ্যে বিলাসবহুল বাড়ি, হোটেল এবং বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণের বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে।
যদিও এসব অভিযোগের স্বপক্ষে পোস্টারে কোনো প্রামাণ্য নথি উপস্থাপন করা হয়নি, তবুও অভিযোগের পরিমাণ ও প্রকৃতি অত্যন্ত গুরুতর হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
পাঁচ দফা দাবি
পোস্টারে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরা হয়েছে— ১. ব্যাংকে তথাকথিত ‘মাফিয়া’ গোষ্ঠীর প্রবেশ প্রতিরোধ, ২. পাচার করা অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা, ৩. দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন, ৪. প্রকৃত মালিকদের হাতে ব্যাংকের মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়া, ৫. বিতর্কিত আইনি ধারা বাতিল।
আইন সংশোধন ঘিরে নতুন বিতর্ক
সম্প্রতি ব্যাংক খাতে প্রণীত সংশোধিত আইন— বিশেষ করে ব্যাংক রেজুলেশন আইনের একটি ধারা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সংশোধনী অনুযায়ী, কোনও ব্যাংকের শেয়ারধারীরা সরকারের দেওয়া মূলধনের একটি নির্দিষ্ট অংশ (প্রায় ৭.৫ শতাংশ) জমা দিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মালিকানা পুনরুদ্ধারের সুযোগ পেতে পারেন।
এখানেই আপত্তি তুলছেন অর্থনীতিবিদদের একাংশ। তাদের মতে— অতীতে ব্যর্থ মালিকরা পুনরায় ফিরে এলে ঝুঁকি থেকেই যাবে। সরকারের বিনিয়োগকৃত বাকি অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে। এটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীগুলোর জন্য ‘দ্বিতীয় সুযোগ’ তৈরি করছে।
বাস্তবতা বনাম প্রচারণা
মতিঝিলে হঠাৎ এই পোস্টার প্রচারণা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে— প্রথমত, ব্যাংকিং খাতে করপোরেট নিয়ন্ত্রণ, মালিকানা ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিনের যে বিতর্ক রয়েছে, তা আবারও সামনে এসেছে।
দ্বিতীয়ত, অর্থপাচার, খেলাপি ঋণ এবং রাজনৈতিক প্রভাব— এই তিনটি ইস্যু দেশের আর্থিক খাতের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
তৃতীয়ত, আইন সংশোধনের মাধ্যমে মালিকানা পুনরুদ্ধারের সুযোগ দেওয়া হলে তা সংস্কারের পথ সহজ করবে, নাকি পুরনো সমস্যাকে ফিরিয়ে আনবে— এ নিয়ে মতভেদ বাড়ছে।
সরকারি বা সংশ্লিষ্ট পক্ষের প্রতিক্রিয়া
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক, এস আলম গ্রুপ বা নিয়ন্ত্রক সংস্থার আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া এখনও পাওয়া যায়নি। ফলে পোস্টারে উত্থাপিত অভিযোগগুলো যাচাইযোগ্য তথ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মতিঝিলে ছড়িয়ে পড়া এই পোস্টারগুলো কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়, বরং দেশের ব্যাংকিং খাতের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং সুশাসন নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগকে সামনে এনে দিয়েছে।
অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই, প্রয়োজনীয় তদন্ত এবং নীতিগত সংস্কার— এই তিনটি বিষয় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে মনে করছেন তারা।



