মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় বৈশ্বিক অর্থনীতিতে প্রভাব, বাংলাদেশের জন্য সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সোমবার সংসদে জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বাণিজ্যে সম্ভাব্য প্রভাব ফেলতে পারে এবং বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার, যেখানে দেশটি তৈরি পোশাক, ওষুধ, হিমায়িত খাদ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে থাকে।
বাণিজ্যে সম্ভাব্য ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ
মন্ত্রী সংসদে রুলিং পার্টির সংসদ সদস্য মো. শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের (পাবনা-৫) তারকাচিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে বলেন, বর্তমান অস্থিতিশীলতা জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া, জাহাজ ভাড়া ও বীমা খরচ বৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে রপ্তানি হ্রাস, পণ্যমূল্য বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে। তিনি বিশেষভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত ও ওমানের মতো বাজারের কথা উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ
মুক্তাদির বলেন, "পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।" এসব পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে:
- রপ্তানি বাজার বৈচিত্র্যকরণ: ভারত, নেপাল, ভুটান, পূর্ব এশিয়া ও আসিয়ান দেশগুলোর সাথে বাণিজ্য সম্প্রসারণ
- রপ্তানি পণ্যের পরিসর বৃদ্ধি: তৈরি পোশাকের বাইরে ওষুধ, কৃষি ও কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত দ্রব্য, প্লাস্টিক, হিমায়িত খাদ্য, চিংড়ি, আইসিটি পণ্য ও হালকা প্রকৌশল পণ্য অন্তর্ভুক্ত করা
- শিপবিল্ডিং ও ফুটওয়্যার শিল্পে বিনামূল্যে কাঁচামাল আমদানির জন্য নো-অবজেকশন সুবিধা প্রদান
- রুলস অফ অরিজিন সার্টিফিকেট অনলাইনে ইস্যু করে রপ্তানিকারকদের জন্য সুবিধা বৃদ্ধি
দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক বাণিজ্য আলোচনা
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ সক্রিয়ভাবে দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক বাণিজ্য আলোচনায় জড়িত রয়েছে। ভারত, ভুটান, নেপাল, কম্বোডিয়া ও শ্রীলঙ্কার সাথে যৌথ কর্মকমিটি ও বাণিজ্য সচিব পর্যায়ের বৈঠকের মাধ্যমে বাণিজ্য সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে। তিনি বেশ কয়েকটি বড় বাণিজ্য চুক্তির আলোচনার কথাও উল্লেখ করেন:
- বাংলাদেশ-কোরিয়া কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (সিইপিএ)
- বাংলাদেশ-সিঙ্গাপুর ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (এফটিএ)
- বাংলাদেশ-সংযুক্ত আরব আমিরাত সিইপিএ
আঞ্চলিক বাণিজ্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নেপালের সাথে প্রেফারেনশিয়াল ট্রেড এগ্রিমেন্টের (পিটিএ) তিন দফা আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে এবং চতুর্থ দফার আয়োজনের চেষ্টা চলছে। এছাড়া মার্চ ২০২৬ সালে ভুটানের সাথে ১০ম বাণিজ্য সচিব পর্যায়ের বৈঠক আয়োজনের মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য শক্তিশালী করা ও বাধা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জাপানের সাথে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি
বাণিজ্যমন্ত্রী গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন যে, বাংলাদেশ জাপানের সাথে একটি ইকোনমিক পার্টনারশিপ এগ্রিমেন্ট (ইপিএ) স্বাক্ষর করেছে, যা অনুমোদিত হলে দেশটির সাথে প্রথম মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিতে পরিণত হবে। তিনি আরও যোগ করেন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক জোরদার করতে বেশ কয়েকটি দেশের সাথে আলোচনা চলমান রয়েছে।
স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সরকারের নজরদারি
মুক্তাদির বলেন, বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যেও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সরকার উন্নয়নগুলো ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং বাণিজ্য ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। তিনি শপিং মল, মার্কেট, দোকান, বিলবোর্ড, বাণিজ্য মেলা, প্রদর্শনী ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ করার নির্দেশনার কথা উল্লেখ করেন।
মেলায় আলোকসজ্জা নিরুৎসাহিত করা হয়েছে এবং বিদ্যুতের দক্ষ ব্যবহার প্রচারের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান। কৃত্রিম সংকট ও মজুদদারি রোধে বাজার মনিটরিং জোরদার করা হয়েছে এবং প্রয়োজনে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জরুরি পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিতকরণ
মন্ত্রী বলেন, চীন, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোর সাথে সমন্বয় জোরদার করে জরুরি পণ্যের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। অফিসের সময় কমিয়ে আনা, অপ্রয়োজনীয় আলো, পাখা ও এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহার সীমিত করা এবং পরিমার্জিত বাজেট কাঠামোর অধীনে বিদেশি প্রশিক্ষণ, যানবাহন সংগ্রহ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ব্যয় কমানোর নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।
সরকারের এই বহুমুখী পদক্ষেপ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা ও বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সহায়তা করবে বলে আশা প্রকাশ করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।



