চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যযুদ্ধ: বিশ্ব অর্থনীতির নতুন বাস্তবতা
চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যযুদ্ধ: বিশ্ব অর্থনীতির নতুন বাস্তবতা

চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। গত বছরের ২ এপ্রিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন, যাকে তিনি 'যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস' হিসেবে অভিহিত করেন। এরপর থেকে বিভিন্ন দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে পাশ কাটিয়ে নতুন বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।

বাণিজ্যযুদ্ধের প্রভাব

ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের পর দক্ষিণ আমেরিকার মারকোসুর জোটের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দীর্ঘদিনের ঝুলে থাকা বাণিজ্যচুক্তি দ্রুত সম্পন্ন হয়। চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো নিজেদের মধ্যে বাণিজ্যিক সহযোগিতা আরও গভীর করে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিও বেইজিং সফর করেন চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারের আশায়।

কিন্তু উন্মুক্ত বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থা পুনর্গঠনের আশা সম্ভবত অবাস্তব। নতুন বাস্তবতায় বিশ্ববাণিজ্য পরিচালিত হবে চীনের রপ্তানি-আধিপত্য ঠেকানো এবং ওষুধের কাঁচামাল, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও চিপের মতো কৌশলগত উপকরণের সরবরাহে দেশটির একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ভাঙার লক্ষ্যে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

চীনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা

এই লড়াইয়ে চীনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্র। তবে ইউরোপসহ অন্যান্য দেশও নিজেদের নীতিগত বিকল্প খতিয়ে দেখছে। শুল্ক আরোপ, দেশীয় ভর্তুকি, রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুই এখন বিবেচনায় রয়েছে।

এ সংঘাতের অর্থনৈতিক মূল্যও কম নয়। চীনা পণ্যের আমদানি সীমিত হলে ভোক্তাপণ্যের দাম বাড়বে। উৎপাদকদের বেশি দামে চীনা উপকরণ কিনতে হবে। চীনা রপ্তানিকারকেরা বাজার খুঁজে পেতে হিমশিম খাবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশের রপ্তানিকারকেরা চীনের বাজার থেকে ছিটকে পড়তে পারে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ পণ্য ও কাঁচামালের সরবরাহব্যবস্থা এককভাবে চীনের নিয়ন্ত্রণে থাকা। এখন সেই নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে তারা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। অতীতেও দেশটি এমন করেছে। কোনো দেশ যদি চীনা পণ্যের প্রবেশে বাধা দেয় বা চীনের আধিপত্য কমানোর চেষ্টা করে, তাহলে বেইজিং প্রতিশোধ হিসেবে সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারে।

ট্রাম্প এ পরিস্থিতি দক্ষতার সঙ্গে সামলাতে পারবেন বলে মনে হয় না। সুস্পষ্ট কৌশল ছাড়াই প্রায় সব ধরনের আমদানিতে শুল্ক আরোপ এবং সম্ভাব্য মিত্রদেশগুলোর প্রতিও তাঁর অবস্থান আক্রমণাত্মক। ফলে এটা নিশ্চিত, ট্রাম্পের এই মেয়াদে মার্কিন বাণিজ্যনীতিতে বিশৃঙ্খলা থাকবে। আশা করা যায়, পরবর্তী প্রশাসন এই লড়াইয়ে আরও কৌশলগত অবস্থান নেবে।

চীনের উত্থান

বিশ্ব অর্থনীতি কীভাবে এ অবস্থায় পৌঁছাল, তা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর। ১৯৯৫ সালে বৈশ্বিক উৎপাদন খাতের মাত্র ৫ শতাংশ ছিল চীনের দখলে। বর্তমানে তা প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। একই সময়ে উৎপাদিত পণ্যের রপ্তানিতে দেশটির অংশীদারত্ব ৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০ শতাংশে পৌঁছেছে। শত শত শিল্পপণ্যের বৈশ্বিক রপ্তানির ৫০ শতাংশের বেশি এখন চীনের নিয়ন্ত্রণে। শক্তিশালী শিল্পভিত্তির জন্য পরিচিত জার্মানিরও আশঙ্কা, চীনের প্রতিযোগিতার মুখে তাদের শিল্প খাত টিকে থাকবে কি না।

সমাধানের পথ

অর্থনীতিবিদেরা এ সংকট থেকে শান্তিপূর্ণভাবে বেরিয়ে আসার পথ দেখিয়েছেন। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ারম্যান জেসন ফারম্যানের মতে, চীনের লক্ষ্য যদি হয় জনগণের অধিকতর কল্যাণ নিশ্চিত করা, সেই পরিপ্রেক্ষিতেও বেইজিংয়ের বর্তমান কৌশল ভুল হতে পারে। মানুষকে কম সঞ্চয় করে বেশি ভোগে উৎসাহিত করা—এ নীতিতে চীনের অর্থনীতি চাঙা হতে পারে। সেটা হলে চীনের আগ্রাসী রপ্তানি নীতির রাশ টেনে ধরা সম্ভব হবে।

তবে ফারম্যানের পর্যবেক্ষণ হলো, বেইজিংয়ের লক্ষ্য হয়তো ভিন্ন। তাঁর ভাষায়, চীন নাগরিকদের অর্থনৈতিক কল্যাণের চেয়ে 'চূড়ান্ত ভূরাজনৈতিক আধিপত্য অর্জনের' লক্ষ্যে কাজ করছে। ওয়াশিংটনের বাইরেও অনেক সরকার এখন একই ধারণা পোষণ করে। তাদের মতে, চীন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে রপ্তানি বৃদ্ধি করছে না; বরং বাণিজ্যযুদ্ধের অস্ত্রভান্ডারও গড়ে তুলছে। বেইজিংও এ আশঙ্কা দূর করার মতো পদক্ষেপ নেয়নি।

চীনের অবস্থান

২০২০ সালের এক ভাষণে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং বলেছিলেন, 'সরবরাহব্যবস্থা এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যেন সবাই আরও বেশি চীনের ওপর নির্ভরশীল হয় এবং সরবরাহ বন্ধের যেকোনো চেষ্টার জবাব দেওয়ার মতো শক্ত অবস্থান আমাদের থাকে।'

সক্ষমতার ঝলক

চীন ২০১০ সালে নিজের সক্ষমতার ঝলক দেখিয়েছিল। এক বিতর্কিত দ্বীপপুঞ্জের কাছে মাছ ধরার সময় চীনের এক নৌকার মালিককে আটক করে জাপান। জবাবে বেইজিং জাপানে বিরল খনিজের রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। চলতি বছরও তাইওয়ান প্রসঙ্গে টোকিওর অবস্থানের জবাবে চীন চুম্বক ও খনিজ সরবরাহ সীমিত করে।

চীনের এই কৌশল শুধু জাপানের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, ডাচদের সঙ্গেও তারা একই কৌশল দেখিয়েছে। গত বছর নেদারল্যান্ডসভিত্তিক চিপ কোম্পানি নেক্সপেরিয়ার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের সিদ্ধান্ত থেকে ডাচ সরকারকে সরে আসতে বাধ্য করতে ডংগুয়ানে অবস্থিত নেক্সপেরিয়ার কারখানায় চিপ রপ্তানিতে বাধা দেয় বেইজিং। একই সঙ্গে বিরল খনিজ ও চুম্বকের রপ্তানিতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে; যুদ্ধবিমান, সাবমেরিন, মুঠোফোন ও বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এসব উপকরণ।

বিশ্বায়নের চীনা দৃষ্টিভঙ্গি

গত ৫০ বছরের বিশ্বায়ন থেকে চীন বিপুল সুবিধা পেয়েছে। কিন্তু মনে হয়, অর্থনৈতিক সংযোগ যে পারস্পরিক নির্ভরতা ও যৌথ সমৃদ্ধি গড়ে তোলার জন্য—এ ধারণা বেইজিং গ্রহণ করেনি। সদ্য প্রকাশিত 'হাউ টু উইন আ ট্রেড ওয়ার' বইয়ের সহলেখক ও বাণিজ্য অর্থনীতিবিদ চ্যাড বাউনের ভাষায়, 'তারা পারস্পরিক নির্ভরতা চায় না; বরং তারা চায়, সবাই তাদের ওপর নির্ভরশীল হোক। তাদের লক্ষ্য ছিল বাজারের নিয়ন্ত্রণ অর্জন করা।'

এ বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিয়ে চীনকে কেন্দ্র করে নতুন কোনো উন্মুক্ত ও নিয়মভিত্তিক বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার ধারণা টিকবে না।

ইউরোপ ও অন্যান্য দেশের পদক্ষেপ

পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকসের সিসিলিয়া মালমস্ট্রমের হিসাবে, বর্তমানে ইউরোপীয় কমিশনের অধীনে চীনা পণ্যের বিরুদ্ধে ৫০টি অ্যান্টি-ডাম্পিং তদন্ত চলছে। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল মাত্র ৭। চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি, সৌরশক্তি সরবরাহব্যবস্থা, গ্লাস ফাইবার, ইস্পাত সিলিন্ডারসহ বিভিন্ন পণ্যের ওপর ইউরোপ ইতিমধ্যে শুল্ক বা অতিরিক্ত কর আরোপ করেছে।

এদিকে মেক্সিকোর গায়েও যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়া লেগেছে। যেসব দেশের সঙ্গে তাদের বাণিজ্যচুক্তি নেই, সেসব দেশের পণ্যে সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে তারা। মূলত চীনকে লক্ষ্য করে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের পর নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলো চীনা পণ্যের বিরুদ্ধে ৩০০টির বেশি অ্যান্টি-ডাম্পিং তদন্ত শুরু করেছে।

ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও অন্যান্য বড় অর্থনীতির প্রথম কাজ হবে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও শিল্প উপকরণের বিকল্প উৎস গড়ে তোলা। বাইডেন প্রশাসন এ প্রক্রিয়া শুরু করেছিল। তারা চিপ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে ভর্তুকি দেয় এবং প্রয়োজনীয় খনিজের নতুন উৎস খোঁজার উদ্যোগ নেয়।

কিন্তু এই পথ বন্ধুর, সময়ও লাগবে অনেক। বিরল খনিজ বা চুম্বকের মতো পণ্যের বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তুলতে দীর্ঘ সময় লাগবে। চীনও পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে এসব দেশের সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারে। আবার ইন্দোনেশিয়ার মতো সম্ভাবনাময় অংশীদার দেশগুলোর চীনের সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। সম্ভাবনা প্রবল, তারা সহজে ঝুঁকির মুখে পড়তে চাইবে না।

এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ভালো ও খারাপ—দুই ধরনের পথই আছে। সম্ভাব্য মিত্রদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া, কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনা না করে নির্বিচার শিল্প খাতকে সুরক্ষা দেওয়া—ট্রাম্পের এসব পদ্ধতি নিঃসন্দেহে ভুল। চলতি হিসাবের ঘাটতি কমানোর যে লক্ষ্য তিনি ঠিক করেছেন, তারও খুব একটা অর্থ নেই। চীন থেকে আমদানি কমলেও অন্য দেশ থেকে আমদানি বেড়ে যাওয়ায় যে লাউ সেই কদুই থেকে যাচ্ছে। এমনকি ঘাটতি আরও বেড়ে যাচ্ছে।

তবে ট্রাম্পের পর আরও সুপরিকল্পিত নীতি গ্রহণ করা হলেও অর্থনীতির চাপ এড়ানো যাবে না। অর্থাৎ মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয় করে গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহশৃঙ্খল গড়ে তোলা এবং কৌশলগত শিল্পকে সহায়তা দিতে লক্ষ্যভিত্তিক শুল্ক ও ভর্তুকি দেওয়া—এমন নীতি গ্রহণ করা হলেও বিশেষ কাজ হবে না।

এ বাস্তবতায় দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যযুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকাই শ্রেয়।