ট্রাম্প-শি বেইজিং বৈঠক: বড় চুক্তি ছাড়াই সমাপ্ত
ট্রাম্প-শি বেইজিং বৈঠক: বড় চুক্তি ছাড়াই সমাপ্ত

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বেইজিংয়ে দ্বিতীয় বার বৈঠক করেছেন। এর মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার চীন সফর শেষ করেছেন। শীর্ষ সম্মেলন ঘিরে সৌহার্দ্যপূর্ণ আলাপ এবং সতর্কভাবে পরিচালিত প্রতীকী কর্মকাণ্ড দেখা গেলেও আলোচনা থেকে বড় কোনো অর্থনৈতিক ফলাফল কমই সামনে এসেছে।

প্রথম দিনের জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন

প্রথম দিনে শীর্ষ ব্যবসায়িক নেতাদের উপস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী ভাষণসহ ছিল জাঁকজমকপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতা। তারপরও কোনো ব্যাপক বাণিজ্যিক অগ্রগতি বা উল্লেখযোগ্য ব্যবসায়িক চুক্তির ঘোষণা আসেনি। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত বৃহস্পতিবার চীনের প্রেসিডেন্ট শির সঙ্গে দুই ঘণ্টারও বেশি সময় বৈঠক করেন। এ সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্ককে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পর্ক হিসেবে বর্ণনা করেন।

হোয়াইট হাউজের প্রতিক্রিয়া

হোয়াইট হাউজ বৈঠকটিকে অত্যন্ত ফলপ্রসূ বলে উল্লেখ করেছে। গ্রেট হল অব দ্য পিপলে বক্তব্য দিতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, এটি সম্ভবত এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় শীর্ষ বৈঠক। বড় চুক্তি নয়, নাজুক বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি বহাল সব আয়োজন ও কূটনৈতিক প্রদর্শনের পরও বড় কোনো বাণিজ্য চুক্তি বা কাঠামোগত সমঝোতা হয়নি। এর পরিবর্তে উভয় পক্ষ অক্টোবরের বাণিজ্য যুদ্ধবিরতির ধারাবাহিকতার কথাই তুলে ধরেছে। ঐ সমঝোতার আওতায় ওয়াশিংটন চীনা পণ্যের ওপর বড় ধরনের শুল্ক বৃদ্ধি স্থগিত করে, আর বেইজিং বিরল খনিজ রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ থেকে সরে আসে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বোর্ড অব ট্রেড গঠন

হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, দুই নেতা একটি ‘বোর্ড অব ট্রেড’ গঠনে সম্মত হয়েছেন, যার মাধ্যমে নতুন করে শুল্ক আলোচনা শুরু না করেই দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্ক পরিচালনা করা হবে। ওয়াশিংটনের পক্ষে বাণিজ্য আলোচনায় নেতৃত্ব দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট ব্যবসায়িক সংবাদমাধ্যম সিএনবিসিকে দেওয়া পূর্বধারণকৃত এক সাক্ষাৎকারে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ সহায়তার জন্য একটি কার্যকর কাঠামো গঠনে অগ্রগতির বিষয়ে আশা প্রকাশ করেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, এসব ব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর করতে এখনো অনেক কাজ বাকি রয়েছে।

বাজারে প্রবেশাধিকার ও সহযোগিতা

হোয়াইট হাউজের তথ্য অনুযায়ী, আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর জন্য চীনা বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শিল্পখাতে চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। বেইজিং ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য ও জ্বালানি পণ্যের আমদানি বাড়াবে। যুক্তরাষ্ট্রের কৃষকেরা দীর্ঘদিন ধরে সয়াবিন, গরুর মাংস ও পোলট্রি পণ্যের জন্য চীনা বাজারে আরো বেশি প্রবেশাধিকার চেয়ে আসছেন। তবে এ বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট বিস্তারিত ঘোষণা দেওয়া হয়নি।

কৃষিপণ্য নিয়ে বড় ধরনের নতুন অগ্রগতির সম্ভাবনাকে কিছুটা কম দেখছেন বেসেন্ট। সয়াবিন-সংক্রান্ত কিছু প্রতিশ্রুতি আগের চুক্তিগুলোর আওতায় ইতিমধ্যেই সমাধান করার ইঙ্গিত দেন তিনি। তবে এ-ও বলেন, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস-এলএনজিসহ যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি পণ্য কেনার পরিমাণ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে চীনের। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রির বলেছেন, চলতি বছরের মধ্যেই একটি কৃষি চুক্তি হওয়ার আশা করছেন তিনি।

শি জিনপিংয়ের বক্তব্য

চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিনহুয়ার তথ্য অনুযায়ী, শি জিনপিং যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়িক নেতাদের বলেছেন, চীনের দরজা আরো উন্মুক্ত হবে এবং চীনা বাজারে মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য আরো বিস্তৃত সম্ভাবনা তৈরি হবে। তিনি বাণিজ্য, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন এবং আইন প্রয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পারস্পরিকভাবে লাভজনক এবং উভয় পক্ষের জন্যই সুফল বয়ে আনে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোর জন্য চীন এখনো একদিকে যেমন একটি বড় বাজার, অন্যদিকে নিয়ন্ত্রণনীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে এটি একটি কঠিন ব্যবসায়িক পরিবেশ হিসেবেও রয়ে গেছে।

‘সবচেয়ে স্পর্শকাতর’ ইস্যু

এই শীর্ষ বৈঠক থেকে উঠে আসা সবচেয়ে স্পষ্ট পরিবর্তনগুলোর একটি হলো বেইজিং এখন তাইওয়ান ইস্যুকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৃহত্তর অর্থনৈতিক সম্পর্কের সঙ্গে আরো সরাসরি যুক্ত করছে। গত এক বছরের বাণিজ্য আলোচনায় তাইওয়ানকে মূলত যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের বিভিন্ন বিরোধপূর্ণ বিষয়ের একটি হিসেবে দেখা হয়েছে। বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানিগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা, যুক্তরাষ্ট্র-তাইওয়ান বাণিজ্য সম্পর্ক এবং তাইপের কাছে অস্ত্র বিক্রির বিষয়গুলো নিয়ে উত্তেজনা ছিল।

তবে বৈঠক ঘিরে চীনের বার্তায় ইঙ্গিত মিলেছে যে, তাইওয়ানকে এখন ক্রমশ যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য সম্পর্কের একটি শর্ত হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। বেইজিংয়ের প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী, শি জিনপিং বলেছেন, উভয় পক্ষ গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীলতার ভিত্তিতে সম্পর্কের জন্য একটি নতুন অবস্থানে সম্মত হয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, তাইওয়ান এখনো সবচেয়ে স্পর্শকাতর ইস্যু। চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকে শি বলেন, তাইওয়ান প্রশ্নটি চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি আরো সতর্ক করেন, ‘এটি ভুলভাবে মোকাবিলা করা হলে দুই দেশ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে পারে, এমনকি সরাসরি দ্বন্দ্বেও পৌঁছাতে পারে।’

চীন সফরে ‘মুগ্ধ’ ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে ‘গঠনমূলক’ একটি নতুন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে পৌঁছানোর কথা জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বেইজিং সফরের দ্বিতীয় দিনেও তার সঙ্গে দেখা করেছেন তিনি। গতকাল শুক্রবার সকালে ট্রাম্পকে জংনানহাই লিডারশিপ কম্পাউন্ড ঘুরে দেখান শি, যেখানে তিনিসহ চীনের শীর্ষ নেতারা বসবাস করেন ও সেখান থেকে কাজকর্ম পরিচালনা করেন। দুই নেতাকে এ সময় বেশ হাসিখুশি ও কিছুটা হালকা মেজাজে দেখা যায়।

হেঁটে হেঁটে ঘোরার সময় শি বলেন, এই জায়গাটি একসময় সম্রাটের উদ্যানের অংশ ছিল, এই প্রাঙ্গণে প্রচুর ইতিহাস রয়েছে। তিনি আরো যোগ করেন, তাদের হাঁটার সময় যে গাছটি তারা দেখেছিলেন, সেটির বয়স ৪৯০ বছর। হাঁটার সময় এক পর্যায়ে ট্রাম্প বলেন, এগুলোই কারো দেখা সবচেয়ে সুন্দর গোলাপ। এ সময় শি জানান, বাগানে তারা যে চীনা গোলাপ দেখেছেন, তার বীজ তিনি ট্রাম্পকে উপহার হিসেবে পাঠাবেন। এতে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি এটি খুব পছন্দ করি, এটি দারুণ।’ পরে চায়ের ঘরের দিকে যাওয়ার সময়ও ট্রাম্পকে বলতে শোনা যায়, শি তাকে হোয়াইট হাউজের রোজ গার্ডেনের জন্য গোলাপ দেবেন।

জংনানহাই প্রাঙ্গণে ট্রাম্প ও শির হাঁটার সময় ধারণ করা একটি ভিডিওতে তাদের কথোপকথন শোনা গেছে। ট্রাম্প ও শি তাদের দোভাষীদের সঙ্গে একটি বাগানে দাঁড়িয়ে থাকার সময় শির কাছে ট্রাম্প জানতে চান, ‘আমি কি প্রেসিডেন্টকে জিজ্ঞেস করতে পারি—অন্য দেশ থেকে আসা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের, যেমন প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীদের, তিনি কি এখানে নিয়ে আসেন?’ শি জবাব দেন, ‘খুবই কম। আমরা সাধারণত এখানে কূটনৈতিক আয়োজন করি না। যদি এ রকম কিছু আয়োজন শুরু হয়েছে, এরপরও এটি এখনো অত্যন্ত বিরল।’ তিনি আরো বলেন, ‘উদাহরণ হিসেবে, পুতিন।’ পূর্ববর্তী সফরগুলোর সময় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট একাধিকবার জংনানহাই পরিদর্শন করেছেন।

চীনে ‘মুগ্ধ’ ট্রাম্প

সাংবাদিকদের সামনে কথা বলার সময় ট্রাম্প প্রথমে বক্তব্য শুরু করেন এবং বলেন, তারা বাণিজ্য, ইরান এবং আরো অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, তারা ‘ভিন্ন অনেক সমস্যা সমাধান করেছেন, যেগুলো অন্য কেউ সমাধান করতে পারত না।’ ইরান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তাদের পারমাণবিক অস্ত্র থাকুক এটা আমরা চাই না এবং আমরা চাই প্রণালিটি খোলা থাকুক।’ এরপর তিনি শিকে ধন্যবাদ জানান এবং বলেন, বেইজিংয়ে সফর করতে পারা তার জন্য সম্মানের। তিনি জানান, ২৪ সেপ্টেম্বর তারা আবার সাক্ষাৎ করবেন, যখন শি যুক্তরাষ্ট্র সফরে যাবেন। বিষয়টিকে পালটাপালটি শুল্কের মতো পালটাপালটি সফর বলে উল্লেখ করেন ট্রাম্প। শি ও ট্রাম্প দুই জনই বেইজিংয়ে ট্রাম্পের সফরকে ‘অত্যন্ত সফল’ ও ‘ঐতিহাসিক’ বলে উল্লেখ করেছেন।