ভারতের রাজধানী দিল্লির দক্ষিণাঞ্চলের সাকেত মেট্রো স্টেশন সংলগ্ন একটি পাঁচতলা বাণিজ্যিক ভবন ধসে অন্তত ১২ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে পুলিশ জানিয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও শতাধিক মানুষ আটকেপড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ঘটনার বিবরণ
শনিবার সন্ধ্যায় সাইদুলাজাব এলাকার ওয়েস্টার্ন মার্গে অবস্থিত ভবনটি হঠাৎ ধসে পড়ে। পুরো স্থাপনাটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় এবং চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ভাঙা কংক্রিটের স্ল্যাব, লোহার কাঠামো ও স্তম্ভের ধ্বংসাবশেষ। এনডিটিভির খবরে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এক জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, 'এ পর্যন্ত ১২ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে দুজন গুরুতর আহত। আপাতদৃষ্টিতে আর কেউ আটকা পড়ে আছে বলে মনে হচ্ছে না, তবে অনুসন্ধান অভিযান এখনও চলছে। এ ঘটনায় মামলা করা হবে।'
ভবনের ব্যবহার ও ধসের সময়
পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, ভবনটিতে একটি মেডিকেল কোচিং ইনস্টিটিউট, কয়েকটি ক্যাফে ও অফিস পরিচালিত হচ্ছিল। এছাড়া তৃতীয় তলায় নির্মাণকাজ চলছিল। সন্ধ্যা প্রায় ৭টা ৪৫ মিনিটে ভবনটি ধসে পড়ে।
দিল্লি ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, ভবনটি পাশের একটি অস্থায়ী টিনশেড ক্যান্টিনের ওপর ভেঙে পড়ে। ওই সময় সেখানে শিক্ষার্থীরা রাতের খাবার খাচ্ছিল।
প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ধসের পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে সাহায্যের জন্য চিৎকার শোনা যাচ্ছিল। এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, 'আমরা শুধু ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে চিৎকার শুনতে পাচ্ছিলাম। চারদিকে ধুলোর বিশাল মেঘ তৈরি হয়েছিল। পরে বুঝতে পারি, পাশের একটি অংশও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।'
আহতদের একজন নীলম যাদব, যিনি সম্প্রতি বিদেশ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করে দেশে ফিরেছেন। তিনি সাকেতের একটি মেডিকেল একাডেমিতে স্নাতকোত্তর ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তার বাবা বলবন্ত যাদব বলেন, 'ঘটনার সময় ক্যান্টিনে ৩০ থেকে ৩৫ জন শিক্ষার্থী ছিল। আমার মেয়ের পায়ে ভাঙন ধরেছে এবং বর্তমানে তার চিকিৎসা চলছে।'
আটকেপড়ার সংখ্যা নিয়ে ধোঁয়াশা
স্থানীয়দের দাবি, ভবনটিতে নিয়মিত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ও অফিসকর্মীর যাতায়াত ছিল। ঘটনার পর স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা দাবি করেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে ১০০ থেকে ১৫০ জন পর্যন্ত আটকা পড়ে থাকতে পারে। স্থানীয় বাসিন্দা রবীন্দ্র সিং বলেন, 'ভবনটিতে কয়েকটি ক্যাফে, কোচিং সেন্টার ও করপোরেট অফিস ছিল। এটি তুলনামূলক নতুন ভবন, সম্ভবত চার বা পাঁচ বছর আগে নির্মিত হয়েছিল।' তবে প্রশাসন এখনও আটকে পড়া মানুষের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিশ্চিত করেনি। জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা ধর্মবীর সিং বলেন, 'সব আটকে পড়া ব্যক্তিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানোর পরই হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।'
উদ্ধার অভিযান
দুর্ঘটনার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট ও একটি জরুরি সাড়া-দানকারী যান ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়। পরে পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় অতিরিক্ত ফায়ার ইঞ্জিন ও আলোকসজ্জা যান মোতায়েন করা হয়। বর্তমানে জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ), দিল্লি পুলিশ, দমকল বিভাগ এবং স্থানীয় বাসিন্দারা যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছেন।
ধ্বংসস্তূপ সরাতে জেসিবি খননযন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া স্টিলের বিম ও কংক্রিট কাটতে হাইড্রোলিক কাটার ও জ্যাক ব্যবহার করা হচ্ছে। উদ্ধারকারীরা ভিকটিম লোকেশন ক্যামেরা, মাটিখোঁড়ার বিশেষ যন্ত্র এবং প্রশিক্ষিত অনুসন্ধানী কুকুরের সাহায্যেও আটকে পড়াদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন।
দক্ষিণ দিল্লির উপ-পুলিশ কমিশনার অনন্ত মিত্তল বলেন, সন্ধ্যা ৭টা ৩৫ মিনিটে ভবন ধসের খবর পাওয়া যায় এবং কয়েক মিনিটের মধ্যেই পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। তিনি বলেন, 'প্রাথমিকভাবে দেখা গেছে একটি পুরোনো ভবন ধসে পড়ে পাশের কেবিনসদৃশ কাঠামোর ওপর আছড়ে পড়েছে। সেখানে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের জন্য একটি ক্যান্টিন ছিল এবং কিছু মানুষ আটকা পড়ে থাকতে পারেন।'
তদন্ত
পুলিশ জানিয়েছে, ভবনটির মালিকানা, নির্মাণকাজের অনুমোদন ছিল কি না এবং কোনো অবহেলা বা ত্রুটি ভবন ধসের জন্য দায়ী কি না—এসব বিষয় তদন্ত করে দেখা হবে।



