সংযুক্ত আরব আমিরাত পাকিস্তানি শিয়া মুসলিমদের গণহারে বহিষ্কার করছে, যা পাকিস্তানের শিয়া সম্প্রদায়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। পাকিস্তানের গ্রামীণ জেলা চাকওয়ালের একাধিক গ্রাম থেকে ১০০ জনেরও বেশি শিয়া মুসলিম আমিরাত থেকে ফিরে এসেছেন। তাদের এখন কোনো চাকরি নেই, মালামাল নেই, এমনকি বিদেশে বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা সঞ্চয়ও ব্যবহার করতে পারছেন না।
বহিষ্কারের ঘটনা
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে পাকিস্তানে সম্ভাব্য হাজার হাজার শিয়াকে বহিষ্কার করা হচ্ছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স ১০৩ জন পাকিস্তানির অভিবাসন নথি, ভিসা অবস্থার স্ক্রিনশট এবং ফ্লাইটের বিবরণ পর্যালোচনা করেছে। এই পাকিস্তানিরা নিজেদের বহিষ্কৃত শিয়া বলে দাবি করেছেন। তাদের মধ্যে ২৪ জনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। সাক্ষাৎকার দেওয়া প্রত্যেকেই বলেছেন, অন্যান্য কয়েক ডজন বহিষ্কৃত শিয়ার সঙ্গে ফ্লাইটে তুলে দেওয়ার আগে নিজেদের মালামাল বা সঞ্চয় ফেরত নিতে পারেননি তারা।
ডেটাবেস ও পরিসংখ্যান
পাকিস্তানি শিয়া রাজনৈতিক সংগঠন মজলিস ওয়াহদাত-ই-মুসলেমিনের তৈরি একটি ডেটাবেস রয়টার্স দেখেছে। সেখানে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলা শুরুর পর থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে সাড়ে ৭ হাজার পাকিস্তানি শিয়াকে বহিষ্কারের তালিকা রয়েছে। সংগঠনের মুখপাত্র মহসিন আবিদি বলেন, প্রকৃত সংখ্যা সম্ভবত আরও অনেক বেশি।
বহিষ্কারের গতি বৃদ্ধি
পাকিস্তানের শিয়া সম্প্রদায়ের নেতারা বলছেন, যুদ্ধ চলাকালে এই বহিষ্কারের গতি আরও বেড়েছে, যা পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পর শিয়াদের ফেরত পাঠানোর গতি ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে।
কর্তৃপক্ষের অবস্থান
সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্তৃপক্ষ কোন মানদণ্ডের ভিত্তিতে এই পাকিস্তানি শিয়াদের বহিষ্কারের জন্য নির্বাচন করেছে, তা নিশ্চিত হতে পারেনি রয়টার্স। বহিষ্কারের বিষয়ে রয়টার্সের পাঠানো প্রশ্নের জবাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত কোনো সম্প্রদায় বা গোষ্ঠীর ওপর ভিত্তি করে কাউকে বহিষ্কার করেনি। তারা বলেছে, যেকোনো বহিষ্কারের ঘটনা সংযুক্ত আরব আমিরাতের নিয়ম লঙ্ঘনের কারণে হয়েছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো বিস্তারিত তথ্য না দিয়েই জানিয়েছে, চলতি বছর বহিষ্কারের সংখ্যা স্থিতিশীল রয়েছে।
সরকারি সূত্রের তথ্য
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পাকিস্তানের একজন ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তা বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে বহিষ্কৃত হাজার হাজার পাকিস্তানি নাগরিককে ফেরত পাওয়ার পর ইসলামাবাদ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছে; যাদের অধিকাংশই শিয়া। তিনি বলেন, পাকিস্তানি সরকার কূটনৈতিক কারণে প্রকাশ্যে এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলেনি। তবে এর বেশি বিস্তারিত জানাননি তিনি।
মানবাধিকার সংস্থার প্রতিক্রিয়া
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিষয়ক উপ-পরিচালক মাইকেল পেজ বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে পাকিস্তানি শিয়া বাসিন্দাদের বহিষ্কারের খবর গভীর উদ্বেগজনক। সংস্থাটি এই গুরুতর অভিযোগ তদন্ত করছে বলে জানিয়েছেন তিনি। মানবাধিকার সংস্থা মেনার কর্মকর্তা ফালাহ সায়েদ বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে শিয়া মুসলিমদের ওপর এই দমন-পীড়ন নতুন কিছু নয়। জেনেভাভিত্তিক এই সংস্থাটি বছরের পর বছর ধরে শিয়া বংশোদ্ভূত বিদেশি নাগরিকদের নির্বিচারে আটক ও জোরপূর্বক গুমের ঘটনা নথিবদ্ধ করেছে। তবে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই দমন-পীড়ন আরও তীব্র হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
প্রবাসী পাকিস্তানির অবস্থা
অ্যাসোসিয়েশন অব ওভারসিজ পাকিস্তানিসের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৮ লাখ পাকিস্তানি সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাস ও কাজ করেন। এই প্রবাসীরা পাকিস্তানের বার্ষিক রেমিট্যান্স হিসেবে ৬০ কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ দেশে পাঠান। ইরানের সঙ্গে ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের অবসানে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে পাকিস্তান। ইরানের পর পাকিস্তানেই বিশ্বের সবচেয়ে বেশিসংখ্যক শিয়া জনসংখ্যা রয়েছে; যা প্রায় ৪ কোটি বা পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ১৭ শতাংশ। সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং অন্যান্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলো সুন্নি শাসিত।



