হাসপাতালের বিছানায় কঙ্কালসার শরীর নিয়ে পড়ে ছিলেন লুইস চিফুতা। জ্বরে কাঁপছিলেন তিনি। পাশে দাঁড়ানো ভাইবোনদেরও ঠিকমতো চিনতে পারছিলেন না। এই দৃশ্য এখন জাম্বিয়ার এমপংওয়ে শহরের মিশন হাসপাতালে সাধারণ হয়ে গেছে। মাত্র এক বছর আগেও এই হাসপাতালে এমন রোগী মাসে একজন বা দুজন পাওয়া যেত। কিন্তু ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে এসেছে আঠাশজন, ফেব্রুয়ারিতেও আঠাশজন, মার্চে সাতজন।
হঠাৎ পরিবর্তনের পেছনে মার্কিন সিদ্ধান্ত
এই হঠাৎ পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে নেওয়া এক সিদ্ধান্ত। তিনি বৈশ্বিক বেশ কিছু সহায়তা কর্মসূচি বন্ধ করে দেন, যার মধ্যে ছিল বিশ্বের অন্যতম বড় এইচআইভি সহায়তা কর্মসূচি পেপফার (প্রেসিডেন্টস ইমারজেন্সি প্ল্যান ফর এইডস রিলিফ)। এই কর্মসূচি বহু বছর ধরে জাম্বিয়ায় লাখো মানুষের জীবন বাঁচিয়েছিল। কিন্তু অর্থায়ন বাতিল হওয়ায় জাম্বিয়া সরকার জরুরি অবস্থার মতো পরিস্থিতিতে পড়ে গেছে।
স্বাস্থ্যব্যবস্থার পতন
জাম্বিয়ার স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখন অনেক ছোট হয়ে গেছে। আগে যে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ছিল, সেগুলোর বেশিরভাগই বন্ধ। আগে কেউ এইচআইভিতে আক্রান্ত হলে তার যৌনসঙ্গীদের খুঁজে বের করে পরীক্ষা করা হতো। সংক্রমিত হলে চিকিৎসা শুরু করা হতো। প্রতিবছর শনাক্ত হওয়া সংক্রমণের ৭০ শতাংশই এই ব্যবস্থায় ধরা পড়ত। এখন সেটি বন্ধ।
আগে গর্ভবতী এইচআইভি আক্রান্ত নারীদের তিনবার ভাইরাসের মাত্রা পরীক্ষা করা হতো, এখন হয় একবার। আক্রান্ত মায়ের শিশুর জন্মের পরপরই জিনগত পরীক্ষা হতো, এখন হয় ছয় সপ্তাহ পরে। আগে যেকোনো রোগে চিকিৎসা নিতে এলেই মানুষকে এইচআইভি পরীক্ষা করা হতো, এখন শুধু যারা নিজেরা চান বা যাদের যক্ষ্মা বা যৌনরোগের উপসর্গ আছে।
নতুন সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের অভাবে মৃত্যু বাড়ছে
আগে নতুন সংক্রমণের জিনগত বিশ্লেষণ করে বোঝা হতো কোথায় ভাইরাস দ্রুত ছড়াচ্ছে। কোনো ট্রাক চলাচলের রুট বা খনির শহরে হঠাৎ সংক্রমণ বাড়লে বিশেষ দল পাঠানো হতো। এখন সেই ব্যবস্থাও বন্ধ। আগে বাজার, গির্জা বা কমিউনিটি কেন্দ্র থেকেই মানুষ গোপনে ও সহজে ওষুধ নিতে পারত। এখন সেসব কেন্দ্র নেই। কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীরা রোগীদের ফোন করতেন, বাড়িতে যেতেন, খোঁজ নিতেন। তাঁদের বেশির ভাগই এখন চাকরি হারিয়েছেন।
যৌনকর্মী বা সমাজে বৈষম্যের শিকার মানুষের জন্য আলাদা নিরাপদ সেবাকেন্দ্র ছিল, সেগুলোও বন্ধ। কিশোরীদের জন্য ছিল আলাদা শিক্ষা ও প্রতিরোধ কর্মসূচি, বহু বছর ধরে এই বয়সী মেয়েরাই ছিল সবচেয়ে ঝুঁকিতে, সেই কর্মসূচিও আর নেই। প্রতিবছর এক লাখের বেশি পুরুষকে বিনা মূল্যে খৎনা করা হতো, কারণ এতে সংক্রমণের ঝুঁকি কমে, সেটিও বন্ধ। ভ্রাম্যমাণ দল রোগীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ওষুধ পৌঁছে দিত, সেই দল আর নেই।
হাসপাতালে ফিরছে পুরনো দৃশ্য
এই পরিবর্তনের প্রভাব এখন হাসপাতালের বিছানায়, ক্লিনিকের করিডরে, কাগজের ফাইলে, এমনকি নবজাতকের কান্নাতেও দেখা যাচ্ছে। অনেক রোগী এখন চিকিৎসার বাইরে চলে গেছেন। এখন নিয়ন্ত্রণহীন এইচআইভির ভয়াবহ লক্ষণ নিয়ে তাঁরা আবার হাসপাতালে ফিরছেন।
উত্তর জাম্বিয়ার তামাখনি অঞ্চলের এমপংওয়ে শহরের মিশন হাসপাতালের পুরুষ ওয়ার্ডে মার্চের এক সকালে নিঃশব্দে মারা যান সাউলো কাসেকেলা। বয়স ছিল মাত্র ৩৭ বছর। পেশায় নিরাপত্তারক্ষী। মৃত্যুর দুই দিন আগে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। তাঁর বুকের এক্স-রে দেখায় ফুসফুস যেন মেঘে ঢেকে গেছে, যক্ষ্মা পুরো বুক গ্রাস করে ফেলেছে। বহুদিন চিকিৎসাহীন ছিলেন তিনি। এইচআইভি সংক্রমণের কারণেই এমন অবস্থা।
চুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা
যুক্তরাষ্ট্র গত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সময় বেঁধে দিয়েছিল নতুন এক স্বাস্থ্য চুক্তিতে সই করতে হবে জাম্বিয়াকে। সেই চুক্তিতে জাম্বিয়া স্বাক্ষর করেনি, কারণ এর সঙ্গে যুক্ত আছে দেশটির খনিজ সম্পদে যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত প্রবেশাধিকার। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, এই চুক্তি হলে পাঁচ বছরের অর্থায়ন নিশ্চিত হবে এবং জাম্বিয়া নিজের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর আরও নিয়ন্ত্রণ পাবে। কিন্তু জাম্বিয়ার কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলছেন, চুক্তি না হলে যদি পুরো সহায়তাই বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে। তবে জাম্বিয়ার কর্মকর্তারা চুক্তি নিয়ে আলাপে আগ্রহী।
ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
দেশটির জাতীয় এইচআইভি কর্মসূচির প্রধান লয়েড মুলেঙ্গা স্বীকার করেছেন, সংক্রমণ বেড়েছে, মৃত্যু বেড়েছে, কষ্টও বেড়েছে। তবু তিনি আশা ছাড়ছেন না। তিনি মনে করেন, নতুন প্রতিরোধমূলক ওষুধ হয়তো আবার পরিস্থিতি বদলাতে পারে, বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি ইনজেকশন লেনাকাপাভির, যার এক ডোজ ছয় মাস পর্যন্ত সুরক্ষা দেয়। এখনো সীমিত আকারে যুক্তরাষ্ট্র কিছু সহায়তা দিচ্ছে, তবে ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। গ্লোবাল ফান্ড থেকে জাম্বিয়া সহায়তা পাচ্ছে বটে, কিন্তু সেই তহবিলও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। এর বাজেটও কমেছে। চুক্তি না হলে জাম্বিয়াকেই ওষুধ কেনা, পরীক্ষাগারের রাসায়নিক আনা এবং সরবরাহব্যবস্থা চালানোর দায়িত্ব নিতে হবে, অথচ দেশটি এখনো এর জন্য প্রস্তুত নয়।
এইডস প্রতিরোধের জন্য যদি প্রয়োজনীয় সামগ্রীর বর্তমান মজুত শেষ হয়ে যায় এবং নতুন চালান না আসে, তাহলে এরপর কী হবে, তা স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা ভাবতেও পারেন না। এমন হলে মৃত্যু ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট থাকবে না।



