বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই টুকটাক লিখতাম। ফিচার, ছোটখাটো আর্টিকেল— যা পারতাম। পত্রিকায় ও ম্যাগাজিনে। কিছু টাকা-পয়সাও আসতো। কিন্তু তার চেয়েও বড় ছিল— একটা অদ্ভুত ভালো লাগা। নিজের লেখা কোথাও ছাপা হচ্ছে, নিজের নামটা ছাপার অক্ষরে দেখা যাচ্ছে। এটাও একটা বড় প্রাপ্তি।
নাম ছাপা হওয়ার আনন্দ ও আত্মপ্রতিষ্ঠা
নিজের নামটা ছাপার অক্ষরে দেখার আনন্দ আসলে এক ধরনের আত্মপ্রতিষ্ঠার অংশ। বড় বড় কবি, সাহিত্যিকদের লেখার পেছনেও শুরুর দিকে এই আত্মপ্রকাশের তাগিদ থাকে। তবে পরে সেটা পাল্টে যেতে পারে। যেমন, গবেষকদের মতে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে লেখা ছিল একটি আধ্যাত্মিক সাধনার মতো।
তবে লেখা ছাড়াও বিভিন্নভাবে মানুষ নিজের নামকে প্রকাশ বা পরিচিত করতে চায়। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, রাজা-জমিদাররা নিজেদের নামে পুকুর, রাস্তা স্থাপনা করতেন। আজও আমরা দেখি, ক্ষমতাবানরা সুযোগ পেলেই নিজেদের বা পরিবারের নামে জায়গা বা প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করেন।
বগুড়ার এমপির নামকরণ বিতর্ক
আমাদের বগুড়া জেলার এক এমপি, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম তার নির্বাচনি এলাকায় নতুন করে চারটি ইউনিয়নের নামকরণ করেছেন। এগুলোর নাম— মীরবাড়ি, সীমান্ত, দিগন্ত এবং স্বর্ণগ্রাম ইউনিয়ন। অভিযোগ রয়েছে, মীর শাহে আলম তার বংশ, দুই সন্তান ও তার এক ভাতিজির নামে এই চারটি ইউনিয়নের নাম রেখেছেন। তার বাড়ির নাম মীরবাড়ি, তার দুই ছেলের একজনের নাম মীর সীমান্ত ও মীর দিগস্ত। তার এক ভাতিজির নাম স্বর্নালী।
শেখ হাসিনার শাসনামলে নামকরণের নজির
শেখ হাসিনা সরকারের আমলে আমরা— এই চিত্র দেখেছি। তার টানা ১৫ বছরের শাসনামলে (২০০৯-২০২৪) নিজের এবং পরিবারের সদস্যদের নামে দেশজুড়ে রাষ্ট্রীয় খরচে নামকরণের এক নজিরবিহীন নজির স্থাপন করেছিলেন। সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক হিসাব অনুযায়ী, শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে হাজারের কাছাকাছি সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থাপনা ও অবকাঠামোর নামকরণ করা হয়েছিল। অবশ্য ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা ৮০৮টি প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনার নাম পরিবর্তন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।
প্রতীকী অমরত্বের মনস্তত্ত্ব
মনোবিজ্ঞান বলে, মানুষ স্বাভাবিকভাবেই চায় তাকে মনে রাখা হোক। নিজের অস্তিত্বকে একটু দীর্ঘায়িত করতে— কাজের মাধ্যমে, লেখার মাধ্যমে, নামের মাধ্যমে। এটাকে বলা হয় প্রতীকী অমরত্ব। আমরা বাঁচি না, কিন্তু আমাদের নামটা বেঁচে থাকে— এই ভাবনাটা আমাদের গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
কিন্তু জনগণের ট্যাক্সের টাকায় নির্মিত রাষ্ট্রীয় সম্পদে রাজনীতিবিদদের এই যে নিজের বা পরিবারের নাম জুড়ে দেওয়ার তাড়না, এর পেছনে আসলে কী মনস্তত্ত্ব কাজ করে? সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন কাজটা মাধ্যম না হয়ে উদ্দেশ্য হয়ে যায় নাম। তখন আমরা কাজ করি না, আমরা কাজ দেখাই।
ক্ষমতার অহংবোধ ও ফ্যাসিবাদ
রাজনীতিবিদরা মনে করেন, পাথরের ফলকে বা ভবনের গায়ে নাম খোদাই করে দিলে ইতিহাসের পাতায় তাদের নাম চিরস্থায়ী হয়ে যাবে। এটা এক ধরনের উত্তরাধিকার ছেড়ে যাওয়ার অবসেসন। ক্ষমতার চূড়ায় থাকলে অনেক সময় রাজনীতিবিদরা বাস্তবতাবোধ হারিয়ে ফেলেন। তারা বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, দেশের যা কিছু উন্নয়ন হচ্ছে, তা তাদের ব্যক্তিগত দয়ায় হচ্ছে।
এই মনস্তত্ত্ব থেকেই তারা ভাবেন, যেহেতু প্রজেক্টটি আমি পাস করিয়েছি, তাই এতে আমার বা আমার পরিবারের নাম থাকাটাই স্বাভাবিক।
নিজের বা পরিবারের নামে প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করার অর্থ হলো— সেই এলাকায় নিজের রাজনৈতিক একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা। এটাও এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, যার মাধ্যমে বিরোধীদের এবং সাধারণ জনগণকে প্রতিনিয়ত স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়—এই অঞ্চলের ভাগ্যবিধাতা আমরাই।
নামকরণের কুফল
অনেকে বলতে পারেন, নাম দিলে সমস্যা কী, কাজ তো হচ্ছে! কিন্তু গভীরভাবে দেখলে এর কুফল সুদূরপ্রসারী। কারণ রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে যা কিছু তৈরি হয়, তার প্রকৃত মালিক জনগণ। কিন্তু যখন সেখানে কোনও ব্যক্তির নাম বসিয়ে দেওয়া হয়, তখন জনগণের মনে একটা স্থূল বার্তা যায় যে— এটি সরকারের বা কোনও পরিবারের দান, তাদের অধিকার নয়।
একটি নির্দিষ্ট পরিবারের নামে সবকিছু নামকরণ করলে দেশের অন্যান্য বীর, মুক্তিযোদ্ধা, ভাষা শহীদ বা গুণীজনদের অবদান আড়ালে চলে যায়। নতুন প্রজন্ম একপেশে ইতিহাস নিয়ে বড় হয়। এছাড়া আমাদের মতো দেশগুলোতে ক্ষমতার পরিবর্তন হলেই নতুন সরকার এসে আগের নামগুলো মুছে ফেলে নিজেদের পছন্দের নাম বসায়। এতে সাইনবোর্ড, গেজেট, পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তনের পেছনে কোটি কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় তহবিল অপচয় হয়।
ব্যক্তিগত শোক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ
প্রিয়জনকে হারানোর পর মানুষের মনে যে তীব্র শূন্যতা তৈরি হয়, সেটাকে অনেকেই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে। আমি নিজেও করেছি। আবার আমার ছোট বোন মারা যাওয়ার পর, বারবার মনে হতো— ওর নামটা কি পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাবে? এই ভাবনা থেকেই কিন্তু আমি আমাদের এলাকার গার্লস স্কুলের কিছু গরিব ও মেধাবি ছাত্রীকে বৃত্তি দেওয়ার কাজটা শুরু করেছি। আমি ও আমার বোন ওই স্কুলেই পড়তাম। গত বছর ১০ জনকে বৃত্তি দিয়েছি। এবছর সংখ্যাটা দাঁড়িয়েছে ২১ জনে। তারপর থেকেই মনে কিছুটা প্রলেপ পড়েছে। একটা ফাউন্ডেশন বা ট্রাস্ট গঠন করে ওর নামে আরও কিছু কাজ করার ইচ্ছে আছে।
তো শেখ হাসিনাও তার প্রয়াত বাবা-মা, ভাইয়ের নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করেছেন। তিনিও তো একসঙ্গে তার প্রায় সবগুলো প্রিয় মানুষকে হারিয়েছেন। এতে সমস্যা কোথায়? সমস্যা আছে। প্রিয়জনের চলে যাওয়াটা আমাদের জীবনের স্বাভাবিক অর্থকে ওলটপালট করে দেয়। তখন মন প্রশ্ন করে, এত বড় একটা বিয়োগান্তক ঘটনার পর এখন আমার জীবনের উদ্দেশ্য কী? এই প্রশ্নটা আমাকেও তাড়া করতো বলেই— আমি আমার বোনের জন্য একটা কিছু করার চেষ্টা করছি।
কারণ মানুষ যেকোনও চরম কষ্টের মধ্যেও বেঁচে থাকার একটা অর্থ বা উদ্দেশ্য খোঁজে। প্রিয়জনকে হারানোর পর মানুষের মনে যে তীব্র শূন্যতা তৈরি হয়, সেটাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চেষ্টাকে মনোবিজ্ঞানে বলে ট্রমা-পরবর্তী মানসিক বিকাশ। এর ফলে মানুষের অবচেতন মন এই চরম কষ্টের মাঝেও একটা গভীর ও পবিত্র উদ্দেশ্য খুঁজে পায়, যা তাকে সান্ত্বনা দেয়।
কারণ মানুষ যখন তার প্রিয় মানুষের জন্য কিছু করার চেষ্টা করে, তখন তার মস্তিষ্ক মূলত ওই প্রিয়জনের অস্তিত্বকে এই পৃথিবীতে চিরস্থায়ী করার চেষ্টা করে। যতকাল ওই কাজটা চলবে এবং তাতে মানুষ উপকৃত হবে, ততদিন প্রিয় মানুষটা মানুষের দোয়ায় এবং কৃতজ্ঞতায় বেঁচে থাকবেন— এই বিশ্বাসটাই মনের ভেতর তীব্র শান্তি এনে দেয়। সিগমুন্ড ফ্রয়েডের তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষ যখন নিজের দুঃখকে অন্যের উপকারে বিলিয়ে দেয়, তখন তার নিজের ভেতরের মানসিক ক্ষত দ্রুত নিরাময় হতে শুরু করে। আমার ক্ষেত্রে এটাই কাজ করেছে। ব্যক্তি পর্যায়ে প্রত্যেকটা মানুষের প্রিয়জন হারানোর ব্যথা কিন্তু একই।
কিন্তু সেই ব্যক্তি যখন ক্ষমতাশালী রাজনীতিবিদ হয়ে রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে নিজের পরিবারের নামে একের পর এক স্থাপনা বানায়— তখন সেখানে শোকের চেয়ে উদ্দেশ্য হাসিল করার প্রয়াসটাই বড় হয়ে যায়। শেখ হাসিনা তার পরিবারের সদস্যদের নামে নামকরণকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, যা জনগণের মনে সম্মান জাগানোর চেয়ে এক ধরনের ভীতি ও বাধ্যবাধকতা তৈরি করত। এটি ছিল মূলত ক্ষমতার দাপট দেখানো এবং দলের নেতাকর্মীদের কাছে নিজের পরিবারকে দেবতার আসনে বসানোর মনস্তাত্ত্বিক চেষ্টা।
উপমহাদেশে নামকরণের সংস্কৃতি
তবে নামকরণের মহামারি বা মোহের সংস্কৃতি শুধু বাংলাদেশের একার নয়, এই উপমহাদেশ যেমন- ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কার রাজনীতিতেও প্রবলভাবে ছিল। এখনও কিছুটা চলমান রয়েছে।
ভারতে দীর্ঘদিন কংগ্রেস দলের একচ্ছত্র ক্ষমতা থাকার কারণে তারা রাষ্ট্র আর নেহেরু-গান্ধী পরিবারকে এক করে ফেলেছিল। পাকিস্তানের রাজনীতিতে ভুট্টো পরিবারের নামে অনেক স্থাপনার নামকরণ হয়েছে। শ্রীলঙ্কায় মাহিন্দা রাজাপাকসের শাসনামলে নামকরণের যে হিড়িক পড়েছিল, তা আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বড় উদাহরণ।
আর রাজনীতিবিদদের সব কিছু নিজের নামে করার এই মানসিকতা কিন্তু অহংবোধ ও ফ্যাসিবাদ থেকেই জন্ম নেয়।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টান্ত
অবশ্য আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর এমন ইচ্ছে এখনও পর্যন্ত চোখে পড়েনি। কেরানীগঞ্জ কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের নাম পরিবর্তন করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নামে করার প্রস্তাব দিয়েছিল প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাতে রাজি হননি। তার এই সিদ্ধান্তটিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একটি দৃষ্টান্তমূলক অনুশাসন বা ধারা পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখছেন।
অনেকেই তারেক রহমানের এই না বলার মধ্যে একটি গণতান্ত্রিক ও প্রাতিষ্ঠানিক মনস্তত্ত্ব দেখছেন। কারণ কেরানীগঞ্জ টিটিসি জনগণের একটি প্রতিষ্ঠান, যা একটি নির্দিষ্ট পরিচয়ে চলছে। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর মায়ের স্মৃতির প্রতি তার শ্রদ্ধা-ভালোবাসা রয়েছে ঠিকই। কিন্তু সেই আবেগকে তিনি রাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে দিতে চাননি। তাহলে তার মন্ত্রী- প্রতিমন্ত্রীরা নিজেদের নামকে স্থায়ী করতে সস্তা কিছু পদ্ধতি বেছে নিচ্ছেন কেন? তারাও কি ফ্যাসিজম বা অহংবোধের পেছনে ছুটছেন?
লেখক: সাইকোলজিস্ট



