সম্প্রতি আদ-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় আস্থা আরও নড়ে গেছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই সঙ্কট কি শুধু একটি হাসপাতালের মধ্যে সীমাবদ্ধ?
ঢাকাজুড়ে হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসা অবহেলা, ভুল চিকিৎসা, অবকাঠামোগত ত্রুটি, সেবার ঘাটতি ও ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার অভিযোগ বছরের পর বছর ধরে চলছে। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সমস্যাটি বিচ্ছিন্ন নয় বরং পদ্ধতিগত। অনিয়ম এতটাই বিস্তৃত যে অনেক প্রতিষ্ঠানকে সমালোচকেরা 'মৃত্যুফাঁদ' হিসেবে বর্ণনা করছেন।
নিবন্ধিত হাসপাতালেও অনিয়ম
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা জেলায় ৮২৭টি নিবন্ধিত বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক, ১,৫৪৪টি ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ১৫২টি ব্লাড ব্যাংক রয়েছে। আদ-দ্বীন হাসপাতাল তার মধ্যে একটি। নিবন্ধন সত্ত্বেও অবহেলার অভিযোগে ইতিমধ্যেই প্রাণহানি ঘটেছে। কর্মকর্তা ও পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এটি ব্যতিক্রম নয়।
ঢাকার বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাপক অনিয়মের মধ্যে কাজ করছে। রোগীরা সেবার জন্য অর্থ দিলেও প্রায়শই নিম্নমানের সেবা ও প্রাণহানির ঝুঁকির মুখে পড়ছেন।
মিরপুরের হাসপাতালে অনিয়মের চিত্র
সম্প্রতি মিরপুরের কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিদর্শনে নানা অনিয়ম ধরা পড়েছে।
অনেক প্রতিষ্ঠান আবাসিক বা বাণিজ্যিক ভবনের সংকীর্ণ জায়গায় কাজ করছে। কিছু ক্ষেত্রে হাসপাতাল মাদ্রাসা, গার্মেন্টস কারখানা বা ফ্ল্যাটের সাথে একই ভবনে অবস্থিত। জরুরি বিভাগ অনেক ক্ষেত্রে নামেমাত্র, মৌলিক অবকাঠামো ও ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা মান অনুপস্থিত।
বিএমআই হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী, বেসরকারি ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে প্রবেশপথে লাইসেন্স প্রদর্শন করতে হয়। কিন্তু এই নিয়ম প্রায়ই উপেক্ষিত হয়।
মিরপুর সেকশন ৬-এর বিএমআই হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার একটি ছয়তলা ভবনের দুই তলায় কাজ করে। তৃতীয় তলায় একটি মাদ্রাসা ও উপরের তলায় আবাসিক ফ্ল্যাট রয়েছে। ১৫ জন চিকিৎসকের তালিকা থাকলেও কর্মীরা জানান, সন্ধ্যায় মাত্র তিন-চারজন ডাক্তার নিয়মিত রোগী দেখেন, বাকিরা কল দিয়ে আসেন। হাসপাতালে কোনো আনুষ্ঠানিক জরুরি বিভাগ নেই। রিসেপশন স্টাফরা 'জরুরি' নামের একটি কক্ষ দেখালেও সেখানে কোনো ডাক্তার নেই। আউটডোর সার্ভিস ও প্যাথলজি ল্যাব একই সীমিত জায়গায় কাজ করে। বাইরের ব্যানারে সরকারি অনুমোদন ও 'বিএমডিসি রেজি নং: এইচএসএম ৯১৩৫৬' লেখা থাকলেও বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) ডাক্তারদের রেজিস্ট্রেশন দেয়, হাসপাতালের নয়। স্থানীয়রা জানান, রোগী আসে মাঝারি, বেশিরভাগ সন্ধ্যায় এবং এখানে প্রসব ও অস্ত্রোপচার হয়।
মিরপুর হলি ক্রিসেন্ট হাসপাতাল
মিরপুর-১-এর শাহ আলী মাজার সংলগ্ন মিরপুর হলি ক্রিসেন্ট হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক কমপ্লেক্স একটি সাততলা ভবনে কাজ করে। নিচতলায় জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ ও রিসেপশন, দ্বিতীয় তলায় ডায়াগনস্টিকস, তৃতীয় তলায় বেড ও কেবিন। বাকি চার তলায় একটি গার্মেন্টস কারখানা। সারাদিন জোরে মেশিনের শব্দ ও কম্পন থাকে। হাসপাতালের সিঁড়ি ব্যবহার করে কারখানার মালামাল তোলা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, হাসপাতালে প্রায় ২৬-২৭টি বেড আছে, অধিকাংশই ভর্তি থাকে। বর্তমানে আইসিইউ, এনআইসিইউ ও সিসিইউ নেই। তিনি বলেন, 'আমরা তিন তলায় কাজ করছি, বাকিটা কারখানায় ভাড়া দেওয়া। আমরা আইসিইউ, এনআইসিইউ ও সিসিইউসহ নতুন ভবনে যাব।'
একই হাসপাতাল কমপ্লেক্স জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এনএসডিএ) অধীনে প্রশিক্ষণের লিফলেট বিতরণ করছে। লিফলেটে বিনামূল্যে কারিগরি কোর্স, ৮০% উপস্থিতি বাধ্যতামূলক, মাসিক ১,৫০০ টাকা ভাতা, দৈনিক ১০০ টাকা ভ্রমণ ভাতা, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য অগ্রাধিকার এবং এনএসডিএ সনদের কথা বলা হয়েছে। তবে এনএসডিএর ওয়েবসাইটে প্রতিষ্ঠানটি অনুমোদিত প্রশিক্ষণ প্রদানকারী হিসেবে তালিকাভুক্ত নয়। কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি জাল সনদ, জাল যাচাইকরণ ব্যবস্থা ও কিউআর কোডের অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছে। পাশাপাশি জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়ন তহবিলের (এনএইচআরডিএফ) নামে প্রতারণার বিষয়ে সতর্ক করে জানিয়েছে, সরকারি প্রক্রিয়ায় কোনো আর্থিক লেনদেন নেই এবং সনদ শুধু জাতীয় দক্ষতা পোর্টালে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই দেওয়া হয়।
ডা. আমানত খান হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার
মিরপুর-১ বাসস্ট্যান্ডের কাছে ডা. আমানত খান হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার পুরো ছয়তলা ভবন স্বাস্থ্যসেবায় ব্যবহার করছে। নিচতলায় রিসেপশন, জরুরি ও ফার্মেসি, উপরের তলায় অপারেশন থিয়েটার, ল্যাব, ওয়ার্ড ও কেবিন। তবে মৌলিক পরীক্ষার বাইরে বেশিরভাগ ডায়াগনস্টিক কাজ আউটসোর্স করা হয়। ভবনে বায়ু চলাচল ও আলোর অভাব রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা অনিক হোসেন বলেন, 'তারা বেশি ফি নেয়, কিন্তু সেবা ভালো না। নার্সরা রোগীদের ঠিকমতো দেখাশোনা করে না, পরিবেশও পরিষ্কার না।'
লতিফা জেনারেল হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার
মিরপুর-১-এর লতিফা জেনারেল হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার পাঁচ তলায় অন্ধকার ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে কাজ করছে।
ডাক্তার এলে তবেই পরিষ্কার
মিরপুরের ৬০ ফুট রোডের কামাল স্মরণীতে মেডিহোম হাসপাতাল তিন তলায় কাজ করে। নিচতলা আবছা আলো ও বায়ু চলাচলের অভাবে ভুগছে, একটি ছোট কক্ষ 'জরুরি বিভাগ' হিসেবে চিহ্নিত। দ্বিতীয় তলায় ল্যাব ও বহির্বিভাগ, উভয়ই নিম্নমানের। এক কর্মী জানান, ডাক্তার এলে তবেই পরিষ্কার ও আলোর ব্যবস্থা করা হয়। তৃতীয় তলায় কেবিন ও ওয়ার্ড, অবস্থা আরও খারাপ—বাতাস চলাচল নেই, স্যাঁতসেঁতে, গরম ও দমবন্ধকর, যদিও ফ্যান চলে। সাভারের খাগান থেকে আসা এক রোগী জানান, স্থানীয় ফার্মেসি তাকে কম খরচে পাঠিয়েছিল, কিন্তু পরে অন্য হাসপাতালের সমান খরচ হয়েছে। তিনি বলেন, 'ভেতরে দমবন্ধ লাগে। বাতাস চলাচল নেই। ফ্যান চলে, তবুও খুব গরম।' কর্মীরা জানান, হাসপাতালে তিন তলায় ১৩টি বেড আছে, চতুর্থ তলায় অন্য অফিস ও জমির মালিকের অংশ।
নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় দুর্বলতা
নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মৃত্যু বা বড় ধরনের অবহেলার পর সক্রিয় হয়, নিয়মিত মনিটরিং সীমিত। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার পরিচালক ডা. আবু হোসেন মো. মাইনুল আহসানের কাছে দুই দিন ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া মেলেনি। অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসও বারবার ফোন ধরেননি।
গত মার্চে অধিদপ্তর নিম্নমানের ও অবৈধ বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে তিন দিনের অভিযান চালিয়ে ঢাকায় ১৬টি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন ও পাঁচটি সিলগালা করে। তখন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সর্দার শাখাওয়াত হোসেন বলেছিলেন, 'মানবজীবন নিয়ে খেলা বরদাশত করা হবে না' এবং অবৈধ ক্লিনিক বন্ধের পাশাপাশি ন্যূনতম মান কঠোরভাবে কার্যকর ও পূর্বের অনুমোদন পুনর্মূল্যায়নের প্রতিশ্রুতি দেন।



