কয়েক দশক ধরে গলায় সুগন্ধি বা পারফিউম ব্যবহারকে মার্জিত ও স্বাভাবিক নিয়ম হিসেবে গণ্য করা হয়। অনেকে এই কাজটি খুব স্বাভাবিক চিত্তেই করে থাকেন। শরীরের ‘পালস পয়েন্ট’ বা নাড়ির স্পন্দন অনুভূত হয় এমন স্থানে সুগন্ধি মাখলে তার ঘ্রাণ দীর্ঘস্থায়ী হয়। কিন্তু চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা, এই অভ্যাসটি শরীরের অন্যতম সংবেদনশীল এবং ঝুঁকিপূর্ণ অংশের জন্য হতে পারে ক্ষতিকর।
থাইরয়েড ও লিম্ফ নোডের ওপর প্রভাব
গলার ঠিক নিচেই অবস্থিত থাইরয়েড গ্রন্থি, যা শরীরের বিপাক প্রক্রিয়া, শক্তি উৎপাদন এবং হরমোনের ভারসাম্য রক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই স্পর্শকাতর অংশের ওপর সরাসরি রাসায়নিকের সংস্পর্শ অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। এছাড়া গলায় রয়েছে লিম্ফ নোড বা লসিকা গ্রন্থির একটি ঘন নেটওয়ার্ক, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সচল রাখতে এবং টক্সিন বা বিষাক্ত পদার্থ ফিল্টার করতে সাহায্য করে। দিল্লির একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের মতে, ‘গলার ত্বক শরীরের অন্যান্য অংশের তুলনায় অনেক পাতলা এবং প্রবেশযোগ্য। ফলে সুগন্ধিতে থাকা অ্যালকোহল, কৃত্রিম সুগন্ধি এবং প্রিজারভেটিভগুলো সহজেই চামড়া ভেদ করে শরীরের ভেতরে শোষিত হতে পারে।’
হরমোন বিপর্যয় ও রাসায়নিক ঝুঁকি
সুগন্ধিতে ব্যবহৃত অনেক কৃত্রিম উপাদানকে ‘এন্ডোক্রাইন-ডিসরাপ্টিং কেমিক্যালস’ বা হরমোন ব্যাহতকারী রাসায়নিক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। চিকিৎসকদের মতে, এই রাসায়নিকগুলো শরীরের হরমোন সংকেত চলাচলে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। যদিও সাময়িক ব্যবহারে তাৎক্ষণিক ক্ষতি দৃশ্যমান হয় না, তবে বছরের পর বছর অভ্যাসবশত গলায় পারফিউম ব্যবহারের ফলে থাইরয়েড বা অটোইমিউন রোগীদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বাড়তে পারে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, আমরা প্রতিদিন কেবল পারফিউম নয়, বরং সাবান, শ্যাম্পু, লোশন এবং ডিওডোরেন্টের মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে রাসায়নিকের সংস্পর্শে আসছি। এই ‘সম্মিলিত রাসায়নিক চাপ’ শরীরের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে।
ত্বক ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ক্ষতি
গলার পাতলা ত্বকে অ্যালকোহল ও কৃত্রিম সুগন্ধি সরাসরি ব্যবহারের ফলে লালচে ভাব, চুলকানি এবং দীর্ঘস্থায়ী পিগমেন্টেশন (কালো দাগ) হতে পারে। এছাড়া লসিকা গ্রন্থিগুলোর ওপর নিয়মিত রাসায়নিকের প্রভাব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর চাপ সৃষ্টি করে। চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, ‘গলা হলো শরীরের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক অঞ্চল; এটি শরীরের ভেতর প্রক্রিয়াজাত করা প্রয়োজন এমন কোনো রাসায়নিক পদার্থ প্রয়োগ করার উপযুক্ত স্থান নয়।’
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ: বিকল্প উপায় কী?
চিকিৎসকরা সুগন্ধি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার কথা বলছেন না, বরং ব্যবহারের পদ্ধতিতে পরিবর্তনের পরামর্শ দিচ্ছেন। এক্ষেত্রে সরাসরি ত্বকে না লাগিয়ে কাপড়ে সুগন্ধি স্প্রে করা সবচেয়ে নিরাপদ। এতে শরীর রাসায়নিক শোষণ করার সুযোগ পায় না। বিকল্প হিসেবে কবজি, কানের পেছনের অংশ (চুল বা হাড়ের কাছে) কিংবা হাঁটুর পেছনে সুগন্ধি ব্যবহার করা যেতে পারে, যেখানে ত্বক তুলনামূলক মোটা। সম্ভব হলে কৃত্রিম কেমিক্যালমুক্ত বা প্রাকৃতিক সুগন্ধি বেছে নেওয়া ভালো। নতুন কোনো সুগন্ধি ব্যবহারের আগে শরীরের ছোট কোনো অংশে পরীক্ষা করে নেওয়া জরুরি।
এই সতর্কতা কোনো আতঙ্ক তৈরির জন্য নয়, বরং সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য। জীবনযাত্রার ছোট ছোট পরিবর্তন যেমন পারফিউম ব্যবহারের সঠিক স্থান নির্বাচন করা—আমাদের দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার পথে একটি বড় পদক্ষেপ হতে পারে। বর্তমান গতিশীল সময়ে নিজেকে আত্মপ্রকাশের পাশাপাশি স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়াই এখন আধুনিক সচেতনতার মূল লক্ষ্য।



