হাসপাতালেই হামে আক্রান্ত শিশুরা: টিকা না নেওয়ায় মৃত্যুহার বেড়ে ১০ জনে
সাত মাস বয়সি নাহিদের ঠান্ডার সমস্যা দুই মাস বয়স থেকেই চলছে। তার মা শান্তা আক্তার বলেন, ‘সমস্যা বেশি হলে হাসপাতালে নিতে হয়। নিউমোনিয়া নিয়ে কুর্মিটোলা হাসপাতালে সাত দিন ছিলাম, তারপর কুমিল্লা বাড়ি ফিরি। আবার শ্বাসকষ্ট ও জ্বর শুরু হলে কুমিল্লা সদর হাসপাতালে ভর্তি করাই, পরে প্রাইভেট ক্লিনিক থেকে পিআইসিইউ সাপোর্টের জন্য ঢাকা শিশু হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে সিট না পেয়ে দুই দিন ঘুরে পিআইসিইউতে জায়গা পাই, কিন্তু এখানে এসে বাচ্চার হাম হয়ে যায় এবং শ্বাসকষ্ট আরো বেড়ে যায়।’
অন্যান্য শিশুদেরও একই পরিস্থিতি
ছয় মাস বয়সি আবিদের হার্টের সমস্যা আছে। তার মা মৌসুমি বলেন, ‘বরিশাল শেরে বাংলা মেডিক্যাল থেকে এখানে পাঠানো হয়। সাধারণ ওয়ার্ডে চার দিন থাকার পর আবিদ হামে আক্রান্ত হয়, তখন আমাদের হামের ওয়ার্ডে পাঠানো হয়।’ মোহাম্মদপুর বসিলা থেকে আসা আজানের মা বলেন, ‘প্রস্রাবের ইনফেকশন নিয়ে ডাক্তার দেখাতে এসেছিলাম, তখন জ্বর ছিল, এখন গায়ে লাল র্যাশ উঠেছে। আমার বাচ্চার আগে হাম ছিল না।’
নাহিদ, আবিদ ও আজানের মতো অনেক শিশু অন্য রোগের চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে এসে হামে আক্রান্ত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম অতি ছোঁয়াচে ভাইরাস, একজন রোগী ১৬ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। হাসপাতালে রোগীদের সমন্বয় না করতে পারলে সেখান থেকেও সংক্রমণ ছড়াতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক আবু মোহাম্মদ জাকির হোসেন বলেন, ‘হাম সংক্রমণ করোনার চেয়েও দ্রুত হয়। টিকা দিলেও দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগে কার্যকারিতা পেতে। বর্তমান সংকট মোকাবিলায় হাসপাতালের সেবা প্রান্তিক পর্যায়ে নিতে হবে। আগে হামে আক্রান্তদের মধ্যে প্রতি হাজারে তিন জনের মৃত্যু হতো, এবার তা দশ জনে পৌঁছেছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘মৃত্যুহার বাড়ার কারণ উদ্ঘাটনে সরকারকে গুরুত্বের সঙ্গে বিশ্লেষণ করতে হবে।’ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালের শিশু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. বিলকিস সুলতানা বলেন, ‘হাসপাতালে আসা হামে আক্রান্ত শিশুরা খারাপ অবস্থাতেই আসছে। তাদের বেশির ভাগের টিকা দেওয়া নেই। টিকা নেওয়ার পরও আক্রান্ত হলে জটিলতা কম হবে।’
তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘যেসব শিশুর হার্টের সমস্যা, ব্লাড ক্যানসার বা কিডনির জটিলতা আছে, তারা হামে দ্রুত আক্রান্ত হচ্ছে এবং জটিলতা তৈরি হচ্ছে।’
জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু
দেশে হামের প্রকোপ ও মৃত্যু আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় গতকাল সোমবার থেকে সারা দেশে একযোগে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সি সব শিশুকে এই টিকা দেওয়া হবে। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হাম ও এ রোগের উপসর্গ নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে আরো তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) জানিয়েছে, তিন সপ্তাহের এই কর্মসূচির আওতায় ১১ কর্মদিবসে ১ কোটি ৭০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হবে। গতকাল প্রথম দিনই ১১ লাখ ২৩ হাজারের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সারা দেশে ২ লাখ ৮২ হাজার ৫১০টি কেন্দ্রে এই কার্যক্রম চলবে, যার মধ্যে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজারই অস্থায়ী কেন্দ্র।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন পৃথক কেন্দ্রে উপস্থিত থেকে টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, এক দিনে দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে আরো তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা সংক্রমণের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে।



