বুলিমিয়া নার্ভোসা: কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন
বুলিমিয়া নার্ভোসা: কারণ, লক্ষণ ও চিকিৎসা

বুলিমিয়া নার্ভোসা একটি গুরুতর খাদ্যাভ্যাসজনিত মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা। এতে আক্রান্ত ব্যক্তি অল্প সময়ে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি খাবার খেয়ে ফেলেন, যাকে ‘বিঞ্জ ইটিং’ বলে। তারপরই অতিরিক্ত খাওয়া নিয়ে তার ভেতরে খারাপ লাগা কাজ করতে শুরু করে। এই খারাপ লাগা মূলত মানসিক। সেখান থেকেই শুরু হয় অতিরিক্ত খাওয়ার ‘ক্ষতিপূরণমূলক আচরণ’। এরপর ওজন বেড়ে যাওয়ার ভয়ে বমি করা, অতিরিক্ত ব্যায়াম করা, দীর্ঘ সময় না খাওয়া বা জোলাপের অপব্যবহারের মতো কর্মকাণ্ডও করেন।

জোলাপের অপব্যবহার কী

জোলাপ (ল্যাক্সেটিভ) হলো এমন ওষুধ, যা কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করতে, মলত্যাগ সহজ করতে ব্যবহৃত হয়। বুলিমিয়া নার্ভোসায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা অনেক সময় ওজন কমানোর উদ্দেশ্যে বারবার বা অতিরিক্ত মাত্রায় জোলাপ গ্রহণ করেন। অনেক আক্রান্ত ব্যক্তি মনে করেন, জোলাপ খেলে খাবার শরীর থেকে বের হয়ে যাবে, ক্যালরি শোষিত হবে না, ফলে ওজন কমবে, যা একেবারেই ভুল ধারণা।

বাস্তবে অধিকাংশ ক্যালরি ও পুষ্টি উপাদান ক্ষুদ্রান্ত্রে শোষিত হয়ে যায়, আর জোলাপ মূলত বৃহদান্ত্রে কাজ করে। তাই জোলাপ খেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ক্যালরি কমানো যায় না। বরং দীর্ঘদিন জোলাপের অপব্যবহারে পানিশূন্যতা (ডিহাইড্রেশন), শরীরে পটাশিয়ামসহ গুরুত্বপূর্ণ খনিজের ঘাটতি, দুর্বলতা ও মাথা ঘোরা, অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন থেকে শুরু করে কিডনির মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। এমনকি অন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

কী হয় এই রোগে

এই রোগীরা মূলত একা খান। কারও সামনে সহজে খেতে পারেন না। বুলিমিয়া নার্ভোসার প্রধান লক্ষণগুলোর মধ্যে আছে—ওজন বেড়ে যাওয়ার তীব্র ভয়, বারবার অতিরিক্ত খাবার খাওয়া, খাওয়ার সময় নিয়ন্ত্রণ হারানোর অনুভূতি, একা প্রচুর খাবার খাওয়া, খাওয়ার পর অপরাধবোধ, ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করা, অতিরিক্ত ব্যায়াম, দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা, নিজের শরীর ও ওজন নিয়ে অতিরিক্ত অসন্তোষ, মেজাজের চরম ওঠানামা ইত্যাদি।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্বাস্থ্যঝুঁকি

চিকিৎসা না হলে বুলিমিয়া থেকে—দাঁতক্ষয় ও মাড়ির রোগ, পানিশূন্যতা, কিডনির সমস্যা, অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন, হৃদযন্ত্র বিকল হওয়ার ঝুঁকি, গলাব্যথা বা দাঁতের এনামেল ক্ষয় (বমির অ্যাসিডের কারণে), শরীরে লবণ ও খনিজের ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, খাদ্যনালির ক্ষত ও অপুষ্টি ইত্যাদি দেখা দিতে পারে। এমনকি গুরুতর মানসিক সমস্যা ও আত্মহত্যার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

কেন হয় বুলিমিয়া নার্ভোসা

সঠিক কারণ জানা যায়নি, তবে কয়েকটি বিষয় ঝুঁকি বাড়ায়—জিনগত বা পারিবারিক প্রভাব, বিষণ্নতা ও উদ্বেগ, আত্মবিশ্বাস ও আত্মসম্মানবোধের অভাব, শৈশবের মানসিক আঘাত, ওজন ও সৌন্দর্য নিয়ে সামাজিক চাপ, কঠোর ডায়েটিং বা বারবার ওজন কমানোর চেষ্টা। বুলিমিয়ায় জোরপূর্বক কম খাওয়ার চাপের কারণেই অনেক সময় ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অতিরিক্ত খাবার খেয়ে ফেলা হয়।

বাইরে থেকে বোঝা কঠিন

অ্যানোরেক্সিয়ার মতো বুলিমিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তির ওজন সব সময় কম হয় না। অনেকের ওজন স্বাভাবিক বা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হতে পারে। তাই শুধু শরীর দেখে রোগটি শনাক্ত করা যায় না।

মডেলদের মধ্যে কেন বেশি আলোচিত

ফ্যাশন ও মডেলিং জগতে শরীরের গঠন নিয়ে প্রচণ্ড চাপ, রোগা থাকার প্রত্যাশা ও ওজন নিয়ে ক্রমাগত মূল্যায়ন চলে। এসবের কারণে মডেল ও সেলিব্রিটির মধ্যে বুলিমিয়া ও অ্যানোরেক্সিয়ায় আক্রান্তের হার তুলনামূলক বেশি। তবে এটি কেবল মডেলদের রোগ নয়। যেকোনো লিঙ্গ, পেশা বা বয়সের মানুষের হতে পারে।

অ্যানোরেক্সিয়া ও বুলিমিয়ার মধ্যে পার্থক্য

অ্যানোরেক্সিয়া ও বুলিমিয়ার মধ্যে কিছু মিল আছে, তবে পার্থক্যও স্পষ্ট। অ্যানোরেক্সিয়ায় খাবার খুব কম খাওয়া হয়। ওজন সাধারণত খুব কম হয়। অপুষ্টি দ্রুত চোখে পড়ে। অন্যদিকে বুলিমিয়ায় জোরপূর্বক কম খাওয়ার চাপের কারণেই অনেক সময় ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অতিরিক্ত খাবার খেয়ে ফেলা হয়। কম খাওয়ার চাপের বিপরীতে শারীরিক ও মানসিকভাবে অতিরিক্ত খাবারের চাহিদা তৈরি হয়। খাওয়ার পর অত্যন্ত অপরাধবোধ কাজ করে। তাই অস্বাস্থ্যকর উপায়ে তা ‘পুষিয়ে দেওয়ার’ চেষ্টা করা হয়। ওজন অনেক সময় স্বাভাবিক থাকে। ঠিক এ কারণেই বাইরে থেকে রোগটি দীর্ঘ সময় সুপ্ত থাকতে পারে।

বুলিমিয়া চিকিৎসাযোগ্য

সাধারণত মনোচিকিৎসা; বিশেষ করে কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি, পুষ্টি পরামর্শ, পরিবারভিত্তিক সহায়তা ও প্রয়োজনে মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত ওষুধ এর মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়।

একটি ভুল ধারণা

কেউ কেউ মনে করেন, বমি করে ফেললে সব ক্যালরি শরীর থেকে বের হয়ে যায়। বাস্তবে তা হয় না। তাই বুলিমিয়া ওজন কমানোর কার্যকর বা নিরাপদ উপায় নয়। এবং এটি শরীরের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

সূত্র: মায়ো ক্লিনিক