যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি ল্যাঙ্গোন হেলথের সার্জনরা বিশ্বে প্রথমবারের মতো একজন এইচআইভি পজিটিভ মৃত দাতার ফুসফুস আরেক এইচআইভি পজিটিভ রোগীর শরীরে সফলভাবে প্রতিস্থাপন করেছেন। ২১ মার্চ ২০২৬ তারিখে এই ঐতিহাসিক অস্ত্রোপচারটি সম্পন্ন হয়। এই সাফল্য চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক বিশাল অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা শেষ ধাপের ফুসফুসের রোগে আক্রান্ত এইচআইভি পজিটিভ রোগীদের জন্য অঙ্গ পাওয়ার নতুন পথ উন্মোচন করেছে।
অস্ত্রোপচারের বিবরণ ও রোগীর অবস্থা
ফুসফুস গ্রহণকারী ৫৬ বছর বয়সি বার্ট্রান্ড নেলসন গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে এইচআইভি নিয়ে বেঁচে আছেন। তিনি ‘সারকোইডোসিস’ নামক একটি মারাত্মক প্রদাহজনিত রোগে ভুগছিলেন, যা তার ফুসফুস ও লিভারকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। ২০২১ সালে গুরুতর লিজিয়েনিয়ার্স রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর তার অবস্থার আরও অবনতি হয় এবং তাকে সার্বক্ষণিক অক্সিজেন সাপোর্টে থাকতে হতো।
অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসকরা তার শরীরে এক এইচআইভি পজিটিভ দাতার দুটি ফুসফুস এবং একই সঙ্গে একটি লিভার সফলভাবে প্রতিস্থাপন করেন। অস্ত্রোপচারের কয়েক মাস পর নেলসন এখন বেশ সুস্থ আছেন এবং দীর্ঘ চার বছর পর প্রথমবারের মতো কোনো কৃত্রিম সাপোর্ট ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে পারছেন।
হোপ অ্যাক্টের ভূমিকা ও গুরুত্ব
যুক্তরাষ্ট্রের ‘হোপ অ্যাক্ট’ কাঠামোর আওতায় এই জটিল অস্ত্রোপচারটি করা হয়। ২০১৩ সালে পাস হওয়া এই আইন দশকের পর দশক ধরে চলে আসা নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়, যা এইচআইভি পজিটিভ ব্যক্তির অঙ্গ অন্য রোগীর শরীরে ব্যবহারে বাধা দিত। এরপর থেকে এইচআইভি আক্রান্তদের মধ্যে কিডনি ও লিভার প্রতিস্থাপনে দারুণ সাফল্য পাওয়া গেছে।
‘আমেরিকান জার্নাল অব ট্রান্সপ্লান্টেশন’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, এইচআইভি পজিটিভ দাতার লিভার প্রতিস্থাপনের ফলাফল এবং এইচআইভি নেগেটিভ দাতার লিভার প্রতিস্থাপনের ফলাফলের মধ্যে কোনো তফাৎ নেই। এই গবেষণাই মূলত চিকিৎসকদের আত্মবিশ্বাস জোগায়। তবে ফুসফুস প্রতিস্থাপন করা ছিল সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ, কারণ ফুসফুস সরাসরি বাইরের বাতাস ও জীবাণুর সংস্পর্শে আসে, যার ফলে অস্ত্রোপচারের পর ইনফেকশন বা অঙ্গ প্রত্যাখ্যানের ঝুঁকি বেশি থাকে।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতামত
নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি ল্যাঙ্গোন ট্রান্সপ্ল্যান্ট ইনস্টিটিউটের ক্লিনিক্যাল ডিরেক্টর ড. সপ্না মেহতা বলেন, ‘এটি এইচআইভি পজিটিভ জনগোষ্ঠীর জন্য একটি স্মরণীয় মুহূর্ত। অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে সমতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে এটি একটি বড় পদক্ষেপ।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের শেষ নাগাদ বিশ্বে প্রায় ৩ কোটি ৯৯ লাখ মানুষ এইচআইভি নিয়ে জীবনযাপন করছেন। আধুনিক অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল থেরাপির কল্যাণে এখন এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিরাও সাধারণ মানুষের মতোই দীর্ঘায়ু পাচ্ছেন, তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের অঙ্গ প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন বাড়ছে।
ফুসফুস প্রতিস্থাপনের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ
অতীতে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া এবং ইনফেকশনের আশঙ্কায় এইচআইভি আক্রান্তদের অঙ্গ প্রতিস্থাপনের অনুপযুক্ত মনে করা হতো। কিন্তু অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল চিকিৎসার অভাবনীয় উন্নতি সেই ধারণা বদলে দিয়েছে। ‘ট্রান্সপ্লান্টেশন প্রসিডিংস’ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণা বলছে, যেসব এইচআইভি রোগীর ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, তাদের ফুসফুস প্রতিস্থাপনের ফলাফল সাধারণ রোগীদের মতোই ইতিবাচক হয়।
বিশেষজ্ঞরা জানান, সফল প্রতিস্থাপনের মূল চাবিকাঠি হলো ভাইরাসের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা, ওষুধের সঠিক সমন্বয় এবং অস্ত্রোপচার-পরবর্তী নিবিড় পর্যবেক্ষণ। ট্রান্সপ্ল্যান্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই সফলতার পর বিশ্বের অন্যান্য চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোও এখন এই পদ্ধতি অনুসরণে এগিয়ে আসবে, যা অঙ্গের ঘাটতি কমিয়ে রোগীদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।



