বন্দর নগরী চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আবারও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। সম্প্রতি স্বাস্থ্য বিভাগের এক জরিপে উঠে এসেছে এমন উদ্বেগজনক চিত্র। নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৮টিতে জরিপ চালিয়ে প্রায় ২৭ শতাংশ বাড়িতে ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার লার্ভা মিলেছে। অর্থাৎ প্রতি চারটি বাড়ির একটিতে পাওয়া গেছে এডিসের লার্ভা। পাশাপাশি সব ওয়ার্ডে ডেঙ্গুর লার্ভা পেয়েছে। এর মধ্যে নগরের আটটি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া সংক্রমণের জন্য হটস্পট বা অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে জরিপকারী দল।
জরিপের ফলাফল ও উদ্বেগজনক তথ্য
চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়ের উদ্যোগে এ জরিপ চালানো হয়। জরিপের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কনটেইনার ইনডেক্স (বিভিন্ন ধরনের পাত্রে) ১০ শতাংশের নিচে থাকলে ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি কম ধরা হয়। কিন্তু চট্টগ্রাম নগরীতে এই হার ৩৩ দশমিক ০৪ শতাংশ হওয়ায় এডিস মশার বিস্তার এবং ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া সংক্রমণের ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
জরিপে, হাউস ইনডেক্সে পাওয়া গেছে ২৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ এডিস মশার লার্ভা, যেখানে এর স্বাভাবিক মাত্রা ৫ শতাংশের নিচে থাকা উচিত। অন্যদিকে ব্রেটো ইনডেক্স পাওয়া গেছে ৩০ দশমিক ৮১ শতাংশ, যদিও এর স্বাভাবিক মাত্রা ২০ শতাংশের নিচে। জরিপের অংশ হিসেবে নগরীর ৩৭০টি বাড়ি পরিদর্শন করে ১১৪টি পজিটিভ কনটেইনার শনাক্ত করা হয়েছে, যেখানে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া যায়।
নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডেই এডিস মশার লার্ভা
জরিপের তথ্য অনুযায়ী, নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডেই এডিস মশার লার্ভার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। তবে আটটি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া সংক্রমণের জন্য হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলো- উত্তর কাট্টলী (ওয়ার্ড-১০), পাহাড়তলী (ওয়ার্ড-৩), আলকরণ (ওয়ার্ড-২), পশ্চিম বাকলিয়া (ওয়ার্ড-১৭), দক্ষিণ বাকলিয়া (ওয়ার্ড-১৯), দক্ষিণ বালুচরা (ওয়ার্ড-৩৯), পাথরঘাটা (ওয়ার্ড-৩৪) এবং আন্দরকিল্লা (ওয়ার্ড-৩২)।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, শনাক্ত হওয়া এডিস মশার মধ্যে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ এডিস ইজিপটাই, যা ডেঙ্গু ভাইরাসের প্রধান বাহক। বাকি ২০ থেকে ৩০ শতাংশ এডিস এলবোপিকটাস, যা ডেঙ্গুর দ্বিতীয় প্রধান বাহক হিসেবে পরিচিত।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সুপারিশ
ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রতিবেদনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে- এডিস মশার বংশবিস্তার রোধে কোনও পাত্র, টব, টায়ার, ড্রাম বা আঙিনায় তিন দিনের বেশি পানি জমে থাকতে না দেওয়া, নিজ নিজ বাসস্থান ও কর্মস্থল নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং নগরজুড়ে প্লাস্টিকের কনটেইনার অপসারণে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা। এ ছাড়া বহুতল ভবনের আন্ডারগ্রাউন্ড, নির্মাণাধীন ভবন এবং যেসব স্থানে পানি জমে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানে বিশেষ নজরদারি বাড়ানো। একইসঙ্গে সময়োপযোগী লার্ভিসাইডিং ও অ্যাডাল্টিসাইডিং কার্যক্রম পরিচালনা এবং সূর্যোদয়ের পরপর ও সূর্যাস্তের আগে মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করা। মশক নিধনে ব্যবহৃত কীটনাশকের সঠিক ও কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা গেলে এডিস মশার বংশবিস্তার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।
নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে আছে ঝুঁকি
জরিপের প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দ্রুত সমন্বিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, নিয়মিত লার্ভা ধ্বংস কার্যক্রম এবং কার্যকর মশক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা যেন গ্রহণ করা হয়। তা না হলে চট্টগ্রাম মহানগরীতে ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
সিটি করপোরেশন এলাকায় ‘ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়া রোগের বাহক এইডিস মশার সার্ভে’ শীর্ষক জরিপটি পরিচালনা করে স্বাস্থ্য বিভাগ। স্বাস্থ্য বিভাগের চট্টগ্রাম দফতরের বিভাগীয় কীটতত্ত্ববিদ মো. মফিজুল হক শাহর নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি দল গত ৮ জুন থেকে ২০ জুন এই জরিপ পরিচালনা করেন। তারা সম্প্রতি জরিপের প্রতিবেদন বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কাছে জমা দেন।
‘এইডিস মশার ঘনত্ব পরিমাপ ও আচরণগত পরিবর্তন জানার জন্য’ নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৮টিতে জরিপ চালানো হয়। এসব ওয়ার্ডের ৩৭০টি বাড়ির মধ্যে ৯৯টি বাড়িতে, অর্থাৎ প্রায় ২৭ শতাংশ বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে।
সবার আগে জনগণকে সচেতন করতে হবে
এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য বিভাগের চট্টগ্রাম দফতরের বিভাগীয় কীটতত্ত্ববিদ মো. মফিজুল হক শাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নগরের ৪১টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৮টিতে জরিপ পরিচালনা করা হয়েছে। জরিপ শেষে প্রতিবেদন বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে সবার আগে জনগণকে সচেতন করতে হবে। নিজ বাড়ির আঙিনা, বিভিন্ন পাত্র, ফুলের টব, নারিকেলের খোসাসহ আশপাশ পরিষ্কার রাখলে ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া অনেকাংশ কমানো সম্ভব।’
ডেঙ্গু মোকাবিলায় স্বাস্থ্য বিভাগের প্রস্তুতি
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. শেখ ফজলে রাব্বি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘জরিপের ফলাফল সিটি করপোরেশনের কাছে পাঠানো হয়েছে। কেননা ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া রোগের বাহক ডেঙ্গু মশা। মশা নিধনের দায়িত্বে রয়েছে সিটি করপোরেশন। এ কারণে জরিপে বেশ কিছু সুপারিশ এবং দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য লিফলেট, মাইকিংসহ অন্যান্য প্রচারে গুরুত্ব দিতেও বলা হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা প্রতি বছর জরিপটি করে থাকি আগস্ট মাসের দিকে। এবার আগেই করেছি। এতে করে আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ডেঙ্গু বিষয়ে স্টাফ নার্সদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। হাসপাতালগুলোকেও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে- যাতে পর্যাপ্ত স্যালাইনসহ প্রয়োজনীয় ওষুধ মজুত রাখা হয়। সেইসঙ্গে আমরা ডেঙ্গু মোকাবিলায় সক্ষম হই।’
সিটি করপোরেশনের ব্যবস্থা
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধে আমরা চিরাচরিত বিষাক্ত রাসায়নিকের ব্যবহার কমিয়ে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব বিটিআই ব্যবহার করছি। প্রতিটি ওয়ার্ডে মশক নিধনে আমাদের ক্রাশ প্রোগ্রাম ও মনিটরিং চলছে। ফলে আক্রান্তের গ্রাফ ৯ হাজার থেকে ১০৯-এ নেমেছে। তবে এ সাফল্য ধরে রাখতে নগরবাসীকে সচেতন হতে হবে। নগরবাসী যদি নিজ আঙিনা, ছাদবাগান বা এসি-ফ্রিজের ট্রে পরিষ্কার না রাখেন, তবে এককভাবে সিটি করপোরেশনের পক্ষে মশা শতভাগ নির্মূল করা অসম্ভব।’



