গ্রীষ্মের শুরুতেই পাল্লা দিয়ে বাড়ছে তাপমাত্রা। ঢাকাসহ দেশের অনেক জেলায় পারদ ইতিমধ্যেই ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের মতে, এই তীব্র তাপপ্রবাহ আরও কয়েক দিন অব্যাহত থাকতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রতিবছরই এই তাপপ্রবাহ দীর্ঘস্থায়ী ও প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। বিশেষ করে রাজপথে থাকা রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক, শিশু, বয়স্ক ও গর্ভবতী নারীরা এখন চরম স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে। তাপমাত্রা ২৭ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে গেলে মানুষের শারীরিক সক্রিয়তা কমতে শুরু করে, যা দীর্ঘ মেয়াদে হৃদ্রোগ ও ডায়াবেটিসের মতো অসংক্রামক ব্যাধির ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
হিটস্ট্রোক ও হিট ক্র্যাম্প
প্রচণ্ড গরমে সবচেয়ে মারাত্মক ঝুঁকি হলো হিটস্ট্রোক। এটি একটি জরুরি চিকিৎসাজনিত অবস্থা, যখন শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত বেড়ে ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তার বেশি হয়ে যায় এবং শরীর নিজে থেকে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে এর ফলে মস্তিষ্ক, কিডনি ও হৃৎপিণ্ড বিকল হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
লক্ষণ
- শরীরের তাপমাত্রা অত্যধিক বেড়ে যাওয়া এবং ত্বক গরম ও শুষ্ক হয়ে যাওয়া।
- তীব্র মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা বা ঝিমঝিম ভাব।
- বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া।
- দ্রুত হৃৎস্পন্দন ও শ্বাসকষ্ট।
- মানসিক বিভ্রান্তি বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়া।
হিটস্ট্রোক ছাড়াও হিট ক্র্যাম্প বা মাংসপেশিতে টান লাগা, অতিরিক্ত ক্লান্ত লাগা, শরীরে লবণের তারতম্যতা, গরমের কারণে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া এমন সমস্যাও হতে পারে।
করণীয়
পানিশূন্যতা রোধ ও খাদ্যাভ্যাস
তৃষ্ণা না পেলেও সারা দিনে অন্তত ৮-১০ গ্লাস পানি পান করুন। ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে যে লবণ বেরিয়ে যায়, তা পূরণে খাবার স্যালাইন, ডাবের পানি বা লেবুর শরবত পান করা জরুরি। তবে অতিরিক্ত চা, কফি বা চিনিযুক্ত সোডা এড়িয়ে চলুন, এগুলো শরীরকে আরও পানিশূন্য করে। তেল-চর্বিযুক্ত ও গুরুপাক খাবার বাদ দিয়ে সহজপাচ্য ও হালকা খাবার (যেমন দই, ফল, সবজি) খান। রাস্তার ধারের খোলা শরবত বা বাসি খাবার এড়িয়ে চলুন।
বাইরে চলাচলে সতর্কতা
খুব প্রয়োজন না হলে বেলা ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সরাসরি রোদে না যাওয়াই ভালো। জরুরি প্রয়োজনে বাইরে বের হলে অবশ্যই ছাতা, চওড়া টুপি এবং সানগ্লাস ব্যবহার করুন। দীর্ঘক্ষণ টানা রোদে কাজ না করে মাঝে মাঝে ছায়াযুক্ত স্থানে বিশ্রাম নিন।
পোশাক নির্বাচন
আঁটসাঁট বা সিনথেটিক কাপড়ের বদলে হালকা রঙের ঢিলেঢালা সুতির পোশাক পরুন। সুতির কাপড় বাতাস চলাচলে সাহায্য করে এবং দ্রুত ঘাম শোষণ করে শরীর রাখে ঠান্ডা।
ঘর ঠান্ডা রাখার উপায়
দিনের বেলা জানালার পর্দা টেনে রাখুন, যাতে সরাসরি রোদ ঘরে না ঢোকে। সূর্যাস্তের পর জানালা খুলে দিয়ে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করুন। অপ্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি বন্ধ রাখুন, কারণ এগুলো ঘরকে আরও উত্তপ্ত করে। দিনে একাধিকবার গোসল করা বা বারবার পানি দিয়ে মুখ-হাত মোছা শরীর ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে।
জরুরি অবস্থায় প্রাথমিক চিকিৎসা
কেউ হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হলে আতঙ্কিত না হয়ে নিচের পদক্ষেপগুলো নিন—
- আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত ছায়াযুক্ত বা ঠান্ডা স্থানে নিয়ে যান।
- শরীরের অতিরিক্ত কাপড় খুলে বা ঢিলা করে দিন।
- ঠান্ডা পানি বা ভেজা কাপড় দিয়ে পুরো শরীর মুছে দিন। বগল, ঘাড় ও কুঁচকিতে বরফ বা ঠান্ডা পানি দিতে পারেন।
- রোগী সচেতন থাকলে তাকে ধীরে ধীরে পানি বা স্যালাইন পান করান।
- অবস্থার উন্নতি না হলে বিলম্ব না করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করুন।
প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ শুধু একটি আবহাওয়াগত পরিবর্তনই নয়, এটি একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। বিশেষ করে শিশুদের তাপনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কম এবং বয়স্কদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হওয়ায় তাদের প্রতি বাড়তি নজর দেওয়া প্রয়োজন। আমাদের মনে রাখতে হবে, সচেতনতাই এই দুর্যোগে বাঁচার শ্রেষ্ঠ উপায়।
তীব্র অসুস্থতায় নিজে নিজে ওষুধ সেবন না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।



