তীব্র গরমে রাজধানীর খেটে খাওয়া মানুষের জীবন দুর্বিষহ
চলতি বছরের এপ্রিলের আগে থেকে শুরু হওয়া তীব্র গরমে রাজধানীর জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। কাঠফাটা রোদ আর তপ্ত হাওয়ায় সাধারণ মানুষের চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে খেটে খাওয়া মানুষরা একটু শীতলতার খোঁজে ব্যাকুল হয়ে পড়েছেন। অনেকেই হাতে, মুখে, মাথা ও শরীরে পানি ছিটিয়ে স্বস্তি নেওয়ার চেষ্টা করছেন। দিনমজুর ও নিম্নআয়ের মানুষের জীবনে গরমের তীব্রতায় নেমে এসেছে চরম ভোগান্তি।
সোমবারের রাজধানী: মানুষের হাঁসফাঁস অবস্থা
সোমবার (২০ এপ্রিল) রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে মানুষের হাঁসফাঁস অবস্থা। জীবিকার তাগিদে তীব্র রোদে কাজ করতে হচ্ছে খেটে খাওয়া মানুষদের। বাইরে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষেরা কেউ ছায়া খুঁজছেন, কেউ পান করছেন ঠান্ডা শরবত। এই পরিস্থিতিতে তাদের দৈনন্দিন জীবনে নেমে এসেছে অসহনীয় কষ্ট।
দিনমজুর রহমান মিয়ার কাহিনী: বার্ধক্যে পৌঁছেও গরমের যন্ত্রণা
দিনমজুরের কাজ করতে করতেই যুবক রহমান মিয়া আজ বার্ধক্যে পৌঁছেছেন। জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি কাটিয়েছেন পরিশ্রমের মধ্যে, দেশের আবহাওয়ার পরিবর্তনের খবর রাখার সুযোগও কখনও হয়ে ওঠেনি। কিন্তু এবারের গরম আর সংসারের বাড়তি চাপ তাকে আরও ক্লান্ত করে তুলেছে। ষাটোর্ধ্ব এই মানুষটি জানান, তীব্র রোদের কারণে তার কষ্ট আগের চেয়ে অনেক বেড়ে গেছে। রহমানের মতো রাজধানীর অসংখ্য খেটে-খাওয়া মানুষের জীবনেও এই গরম বাড়িয়ে তুলেছে দুর্ভোগ।
অর্থনৈতিক চাপ: গরমজনিত বাড়তি খরচের বোঝা
সারা দিন কঠোর পরিশ্রম করে সামান্য যে আয় হয়, তা দিয়ে সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হয়। এর সঙ্গে গরমজনিত বাড়তি খরচ যোগ হওয়ায় তাদের দুশ্চিন্তা আরও বেড়েছে। বাংলা বাজারের আরেক দিনমজুর বলেন, "গরমের মধ্যে আমাদের সারা দিন কাজ করতে হয়। আবার বাসায়ও গরম। অল্প সময় কাজ করলেই ঘেমে শরীর ভিজে যায়। কিন্তু এই গরমে কাজ করেও তেমন বেতন পাই না। পয়সার অভাবে ওষুধ কিনতে পারছি না।"
রিকশাচালক লতিফ মিয়ার অভিজ্ঞতা: গরমে আয় রোজগার কমছে
রাজধানীর রায়সাহেব বাজরে কথা হয় রিকশাচালক লতিফ মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, "সূর্য ওঠার পর থেকেই গরমের তীব্রতা বাড়ছে। একটু পথ চলতেই ঘামে গোসল, গলা শুকিয়ে যায়। বেশিক্ষণ ভাড়া টানতে পারি না। কিন্তু দিন শেষে রিকশা মালিককে জমার টাকা দিতে হবে, তাই এখনও রাস্তায় আছি। এভাবে টানা গরম পড়লে আয় রোজগার কমে যাবে আমাদের। তাই ক্লান্ত হলেও জিরিয়ে জিরিয়ে রিকশা চালাচ্ছি।"
ভ্যানচালক করিমের সংগ্রাম: পেটের দায়ে গরমেও কাজ
রাজধানীর সদরঘাটে কথা হয় ভ্যানচালক করিমের সঙ্গে। তিনি বলেন, "বাবু বাজার থেকে মালামাল নিয়ে আসলাম সদরঘাটে। এই গরমে ভ্যানে ভারী মালামাল নিয়ে চালাতে কষ্ট হয়। অনেকে বলেন, রাতে ভ্যান চালাতে। কিন্তু রাতে সবসময় ভাড়া পাওয়া যায় না। পেটের দায়ে গরমেও গাড়ি চালাতে হচ্ছে।"
ফুটপাতের ব্যবসায়ী আশিকের দুর্ভোগ: ক্রেতা কম, খরচ বেশি
ফুটপাতে ব্যবসা করা আশিক বলেন, "প্রতি দিন রোদের মধ্যে বসে ব্যবসা করতে খুব কষ্ট হয়। প্রচণ্ড গরমে ক্রেতাও কম আসে, আবার সারা দিন বাইরে থাকায় শরীরও দুর্বল হয়ে পড়ে। যা আয় করি, তা দিয়ে সংসার চালানোই কঠিন, তার ওপর গরমের কারণে পানি, শরবত আর ওষুধের বাড়তি খরচ যোগ হয়েছে। সব মিলিয়ে খুব কষ্টে দিন পার করছি।"
এই প্রতিবেদন থেকে স্পষ্ট যে, তীব্র গরম শুধু শারীরিক কষ্টই বাড়াচ্ছে না, বরং খেটে খাওয়া মানুষদের অর্থনৈতিক সংকটও গভীর করছে। রাজধানীর নিম্নআয়ের মানুষদের জন্য এই গরম মোকাবিলা করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।



