হামে মৃত শিশুদের ৯২% টিকা পায়নি, কলম্বো সভায় তথ্য প্রকাশ
হামে মৃত শিশুদের ৯২% টিকা পায়নি, কলম্বো সভায় তথ্য

শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের হাম-রুবেলাবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের সভায় বাংলাদেশের হাম পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। সভায় দেখা গেছে, দেশে হামে মারা যাওয়া শিশুদের ৯২ শতাংশই হাম-রুবেলার কোনো টিকা পায়নি। আর মারা যাওয়া শিশুদের ২৬ শতাংশের বয়স ৯ মাসের নিচে।

টিকাদানের ঘাটতি ও নজরদারির অভাব

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শিশুদের হাম প্রতিরোধক্ষমতার কমতি ও টিকা কার্যক্রমে নজরদারির ঘাটতির কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ২৫ জুন পর্যন্ত সারা দেশে হামে ৭০৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৬১৫ জন এবং নিশ্চিত হামে মৃত্যু ৯৩ জনের। রোগতত্ত্ববিদেরা বলছেন, প্রাদুর্ভাবের সময় হামের উপসর্গ নিয়ে যত মৃত্যু হচ্ছে, তার সবই হামে মৃত্যু বলে বিবেচনা করা হয়।

কলম্বো সভায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব

২২-২৩ জুন অনুষ্ঠিত ওই সভায় বাংলাদেশের পক্ষে হাম ও রুবেলা নির্মূল কার্যক্রম যাচাইয়ের জাতীয় কমিটির (এনভিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান পরিস্থিতি তুলে ধরেন। তিনি সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক। বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলে আরও ছিলেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একজন সহকারী সচিব, ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগের একজন সহকারী অধ্যাপক এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ঢাকা কার্যালয়ের রোগ প্রতিরোধবিষয়ক কর্মকর্তা।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বয়সভিত্তিক মৃত্যু ও টিকার অবস্থা

কলম্বো সভায় উপস্থাপিত পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি ২৬ শতাংশ শিশু মারা গেছে ৯ মাস পূর্ণ হওয়ার আগেই। ৯ থেকে ১১ মাস বয়সী ১৪ শতাংশ, এক থেকে দুই বছর বয়সী ১৩ শতাংশ, দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী ১৮ শতাংশ, ৫ থেকে ৯ বছর বয়সী ১৩ শতাংশ এবং ১০ থেকে ১৫ বছর বয়সী ৪ শতাংশ শিশু মারা গেছে। বাকি ১২ শতাংশের বয়স ১৫ বছরের বেশি। অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘কলম্বোতে উপস্থাপন করা তথ্য জুন মাসের প্রথমার্ধের। তাতে দেখা গেছে, মারা যাওয়া শিশুদের ৯২ শতাংশ হাম-রুবেলার টিকা পায়নি। কিন্তু আমি মনে করি জুনের শেষ সপ্তাহে মৃত্যু বেড়ে যে সাত শর বেশি হওয়ার কথা আমরা জেনেছি, সে ক্ষেত্রেও টিকা না পাওয়ার হার একই হবে।’

জনস্বাস্থ্যবিদের প্রতিক্রিয়া

জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রচার করা হয় টিকার কাভারেজ ভালো, বাস্তবে ভালো না। বহু শিশুকে টিকা না দিয়েই বলা হয়েছে টিকা পেয়েছে, টিকার সাফল্যের কথা গাওয়া হয়েছে। সব পরিসংখ্যান ছিল বানোয়াট। তথ্য-উপাত্তে কারচুপি করা হয়েছে। নজরদারির কোনো ব্যবস্থা ছিল না। ছিল না কোনো জবাবদিহি। এত সব অনাচারের মূল্য দিতে হলো শিশুদের।’

হাসপাতালে ভর্তি ও সুস্থতার তথ্য

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৫ মার্চ থেকে ২৫ জুন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে ৯৮ হাজার ২৬৬ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছে। এই সময় নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে ১১ হাজার ৫৯৪ জনের। এ পর্যন্ত ৭৮ হাজার ২৮৭ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যে শিশুদের বয়স, লৈঙ্গিক পরিচয়, আক্রান্ত হওয়ার কত পরে হাসপাতালে আসছে, হাসপাতালে আসার কত পরে মৃত্যু ঘটছে, আইসিইউতে রাখা হয়েছিল কি না—এ ধরনের কোনো তথ্য নেই।

জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান

২৫ জুন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কলম্বোতে বিশেষজ্ঞরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় হামের বিরুদ্ধে জরুরি ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশের পরিস্থিতি জানা-বোঝার জন্য একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিনিধিদল পাঠানোর অনুরোধও জানানো হয়েছে। এ বছর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলে বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপাল, থাইল্যান্ড ও মালদ্বীপে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।