গরমে অসুস্থ শিশুর চিকিৎসায় লোডশেডিং সংকট
তীব্র গরমে অসুস্থ হয়ে পড়েছে শিশু। আনা হয়েছে হাসপাতালে। সেখানেও বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে লোডশেডিং চলছে। শিশুকে বাতাস করার জন্য হাতপাখাই ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাবনা সদর হাসপাতালে এমন দৃশ্য দেখা গেছে ২২ এপ্রিল।
বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে, উৎপাদন কমছে
গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়ছে। জ্বালানিসংকটের এই সময়ে উৎপাদন ধরে রেখে চাহিদামতো সরবরাহে হিমশিম খাচ্ছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। কিছুদিন ধরে দিনের বিভিন্ন ঘণ্টায় দুই হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং করা হচ্ছে।
এর মধ্যে ভারতীয় কোম্পানি আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। এতে লোডশেডিং আরও বেড়েছে। পিডিবি ও আদানির দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, গত মঙ্গলবার মধ্যরাতের পর ভারতে আদানির পাওয়ারসের বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটের বিয়ারিং থেকে সতর্কসংকেত পাওয়া যায়।
আদানির ইউনিট বন্ধের প্রভাব
পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, "কারিগরি ত্রুটির কারণে আদানির একটি ইউনিট থেকে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। এটি উৎপাদনে ফিরতে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।"
ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যে নির্মিত আদানির কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটি ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার। ২০১৭ সালে আদানির সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি করে পিডিবি। ৮০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি ইউনিট আছে এখানে।
পিডিবি সূত্র বলছে, কিছুদিন ধরে গড়ে দেড় হাজার মেগাওয়াটের মতো বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে আদানির কেন্দ্রটি। একটি ইউনিট বন্ধের পর উৎপাদন কমে ৭৫০ থেকে ৭৭০ মেগাওয়াটে নেমে এসেছে। ওই ইউনিট চালু করতে ৩–৪ দিন সময় লাগতে পারে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চাহিদার ব্যবধান
পিডিবি সূত্র জানিয়েছে, বুধবার দিনে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ওঠে ১৫ হাজার ৬৯০ মেগাওয়াটে। উৎপাদন ও চাহিদার ফারাকের কারণে এই সময় লোডশেডিং দিতে হয় প্রায় আড়াই হাজার মেগাওয়াট। দুপুরের পর থেকে গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লোডশেডিং বাড়তে শুরু করে। রাতে সর্বোচ্চ চাহিদার সময় এটি আরও বাড়তে পারে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানিসংকট দেখা দেয় বিশ্বজুড়ে। কয়লা, গ্যাস ও জ্বালানি তেলের অভাবে দেশে চাহিদামতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না।
পরিস্থিতি মোকাবিলার পদক্ষেপ
পিডিবির সদস্য জহুরুল ইসলাম বলেন, "পরিস্থিতি মোকাবিলায় ফার্নেস তেলচালিত কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। ডিজেলচালিত কেন্দ্রও চালানোর চিন্তা করা হচ্ছে।"
পাওয়ার গ্রিড পিএলসি বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী:
- দেশে মোট বিদ্যুৎকেন্দ্র ১৩৬টি
- গ্যাসস্বল্পতায় ১৩টি কেন্দ্র বন্ধ
- জ্বালানি তেল না থাকায় ৯টি কেন্দ্র বন্ধ
- রক্ষণাবেক্ষণ কাজের জন্য ৮টি কেন্দ্র বন্ধ
- ১৭টি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র রাতে বিদ্যুৎ দেয় না
- ডিজেলচালিত ৫টি কেন্দ্র খরচ বেশি হওয়ায় বন্ধ
গ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা এখন ১২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। গ্যাস–সংকটের কারণে সেখান থেকে ৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন করা যাচ্ছে না।
আদানির সঙ্গে চলমান বিরোধ
আদানি পাওয়ারসের সঙ্গেও দেনা–পাওনা নিয়ে টানাপোড়েন চলছে। বকেয়া বিল দ্রুত পরিশোধের তাগাদা দিয়ে সরকারের কাছে কয়েক দিন আগে চিঠি দেয় ভারতীয় কোম্পানিটি। বকেয়া শোধ না হলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়।
বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত কয়লার দাম নিয়ে পিডিবির সঙ্গে আদানির বিরোধ চলছে। আদানি কয়লার বাড়তি দাম ধরে বিল করছে। আর পিডিবি বাজার দামে বিল পরিশোধ করছে। দেশের উচ্চ আদালতে আদানির চুক্তির বিরুদ্ধে একটি রিট মামলা চলমান।
এরই মধ্যে আদালতের আদেশে আদানির চুক্তি পর্যালোচনা করে গত জানুয়ারিতে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত চুক্তি পর্যালোচনা কমিটি। কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আদানির সঙ্গে পিডিবির বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি ও চুক্তির প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি-অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে।
২০১৭ সালে আদানি পাওয়ার লিমিটেডের সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি করে পিডিবি। চুক্তি অনুসারে আদানির কেন্দ্র থেকে ২৫ বছর ধরে বিদ্যুৎ কিনবে বাংলাদেশ।
গরমের শুরুতে এখন বিদ্যুতের চাহিদা ১৬ হাজার মেগাওয়াট ছাড়ালেও সব মিলিয়ে উৎপাদন করা যাচ্ছে ১৩ হাজার থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। ফলে ঘাটতি মেটাতে নিয়মিত লোডশেডিং করতে হচ্ছে, যা স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনযাপনকে ব্যাহত করছে।



