রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দেড় বছর ধরে জলাতঙ্ক টিকার সংকট
রামেক হাসপাতালে দেড় বছর ধরে জলাতঙ্ক টিকার সংকট

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দেড় বছর ধরে জলাতঙ্ক টিকার তীব্র সংকট

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে প্রায় দেড় বছর ধরে জলাতঙ্ক রোগের টিকার চরম সংকট বিরাজ করছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিয়মিত চাহিদা অনুযায়ী টিকা সরবরাহ করতে না পারায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিজ উদ্যোগে রোগীদের জন্য টিকা সংগ্রহের ব্যবস্থা করেছিল। তবে সেই টিকার মজুদও দুই সপ্তাহ আগে নিঃশেষ হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে হাসপাতালটি সম্পূর্ণরূপে টিকাশূন্য অবস্থায় রয়েছে।

রোগীদের উপর আর্থিক চাপ

এই সংকটের ফলে রোগী ও তাদের স্বজনদের বাইরের ফার্মেসি থেকে বাণিজ্যিক মূল্যে টিকা কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে। বিশেষ করে নিম্নআয়ের রোগীরা এই অতিরিক্ত ব্যয় বহনে মারাত্মক আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন। সোমবার (২০ এপ্রিল) ও মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) হাসপাতালে সরেজমিন পরিদর্শনে এমন চিত্রই প্রত্যক্ষ করা গেছে।

হাসপাতালের বারবার আবেদন

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, টিকা বরাদ্দের জন্য তারা ইতোমধ্যে কয়েক দফা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ অধিশাখায় লিখিত আবেদন জানিয়েছেন। তারা আশাবাদী যে অচিরেই টিকা সরবরাহ পুনরায় শুরু হবে। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র দাবি করেছে, মূলত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তহবিল সংকটের কারণেই হাসপাতালে টিকা সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

টিকার চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তা

হাসপাতাল সূত্র থেকে জানা গেছে, জলাতঙ্ক প্রতিরোধে একজন রোগীকে প্রথম ডোজের পর তৃতীয়, সপ্তম ও চতুর্দশ দিনে টিকা নিতে হয়। কিছু জটিল ক্ষেত্রে ৯০ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ ছয় ডোজ পর্যন্ত টিকা প্রয়োজন হতে পারে। রাজশাহী, রংপুর ও খুলনা বিভাগের প্রতিদিন গড়ে ২৮০ থেকে ৩০০ রোগী রামেক হাসপাতালে এই টিকা গ্রহণ করেন। এই হিসাবে প্রতি মাসে প্রায় ৮ থেকে ৯ হাজার পিস টিকার প্রয়োজন পড়ে।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সাধারণত বিনামূল্যে এসব টিকা সরবরাহ করলেও গত বছরের জানুয়ারি মাস থেকেই ধারাবাহিকভাবে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, গত ছয় মাস ধরে টিকা সরবরাহ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ রয়েছে।

রোগীদের বাস্তব অভিজ্ঞতা

সোমবার সকালে রামেক হাসপাতালে ছেলেকে টিকা দিতে আসা রাজশাহী মহানগরীর কাটাখালি এলাকার বাসিন্দা সাইদুর রহমান বলেন, "গত ১৯ এপ্রিল রোববার আমার ছেলেকে বিড়াল আঁচড় দিয়েছে। চিকিৎসক চার ডোজ টিকা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। আমি হাসপাতালের বাইরে লক্ষীপুরের একটি ফার্মেসি থেকে ৪৫০ টাকা দিয়ে টিকা কিনে এনেছি। প্রথম ডোজ দেওয়া হয়েছে, বাকি তিন ডোজও বাইরে থেকে কিনতে হবে।"

রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার বানেশ্বর এলাকার জুয়েল রানা তার তিন বছরের শিশু জুনায়েদকে নিয়ে এসেছেন। "বাড়ির পাশের রাস্তায় খেলার সময় আমার ছেলেকে কুকুরে কামড় দিয়েছে। ইতোমধ্যে প্রথম ডোজ দেওয়া হয়েছে, আজ দ্বিতীয় ডোজের জন্য এসেছি। দুইবারই বাইরে থেকে টিকা কিনতে হয়েছে। আমি একজন ভ্যানচালক, টিকা কেনা এবং পুঠিয়া থেকে হাসপাতালে যাতায়াতের খরচ বহন করা আমার জন্য কষ্টকর।"

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ থেকে আসা রুপালি বেগম বলেন, "১৯ এপ্রিল বিড়াল আমার দুই হাতেই আঁচড় দিয়েছে। এরপর থেকে শরীরের বিভিন্ন অংশ অবশ হয়ে যাচ্ছে, ঠিকভাবে খেতে পারছি না, প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করছি। হাসপাতালে এসে দেখি টিকা নেই, তাই বাইরে থেকে কিনতে বাধ্য হয়েছি।"

নাটোর সদর থেকে আসা ইমা ইসলাম বলেন, "গত শনিবার একটি পাগলাটে কুকুর আমার হাত ও পায়ে চারটি স্থানে কামড় দিয়েছে। চিকিৎসকরা এটিকে খুবই গুরুতর বলে উল্লেখ করেছেন। সাধারণ আঁচড় বা কামড়ের ক্ষেত্রে ৪৫০ টাকার টিকা যথেষ্ট হলেও আমার জন্য এক হাজার টাকার টিকা প্রয়োজন। হাসপাতালে যাতায়াত এবং বাইরে থেকে টিকা কেনা সত্যিই অনেক কষ্টকর।"

চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা

হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, ছয় ধরনের প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ে জলাতঙ্ক রোগ হতে পারে:

  • কুকুর
  • বিড়াল
  • বানর
  • বেজি
  • বাদুড়
  • শিয়াল

আক্রান্ত হলে এক সপ্তাহের মধ্যে প্রয়োজনীয় টিকা নেওয়া অত্যাবশ্যক। সময়মতো টিকা না নিলে বিশেষ উপসর্গ দেখা দিতে পারে এবং পরবর্তীতে আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে।

টিকা উৎপাদন ও সরবরাহ পরিস্থিতি

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, বাংলাদেশে পপুলার ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেড এবং ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেড জলাতঙ্ক রোগের টিকা উৎপাদনকারী শীর্ষ দুটি প্রতিষ্ঠান। এই দুটি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত টিকার সরবরাহ বর্তমানে বাজারে পর্যাপ্ত পরিমাণে রয়েছে। দেশীয় ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান থেকেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ অধিশাখা সরকারি হাসপাতালগুলোতে টিকা সরবরাহ করতে সক্ষম।

ইনসেপ্টা ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের রাজশাহী ডিপো ইনচার্জ আব্দুল মান্নান বলেন, "আমাদের জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনে রয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে। ভ্যাকসিনের কোনো সংকট নেই।"

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কে বিশ্বাস বলেন, "হাসপাতালে গত ছয় মাস ধরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের টিকা সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নিজস্ব উদ্যোগে ১১ লাখ টাকা ব্যয়ে দুই হাজার ভ্যাকসিন কেনা হয়েছিল, যা দুই সপ্তাহ আগে শেষ হয়ে গেছে। গত এক বছরে আমরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে চার দফা চিঠি দিয়ে বিষয়টি জানিয়েছি। তারপরও সরবরাহ পাওয়া যায়নি। আমরা আশাবাদী, শিগগিরই অধিদপ্তর ভ্যাকসিন সরবরাহ করতে সক্ষম হবে।"