বাংলাদেশে ১৮+ বয়সীদের ২০% হাইপারটেনশনে আক্রান্ত: ডাব্লিউএইচও
বাংলাদেশে ১৮+ বয়সীদের ২০% হাইপারটেনশনে আক্রান্ত

বাংলাদেশে ১৮ বছরের বেশি বয়সী প্রায় ২০ শতাংশ মানুষ হাইপারটেনশনে ভুগছে বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও)। সংস্থাটির ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ২ লাখ ৮৩ হাজার ৮০০ মানুষ হৃদরোগজনিত অসুস্থতায় মৃত্যুবরণ করেছেন, যার ৫২ শতাংশের জন্য দায়ী উচ্চ রক্তচাপ।

বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস পালিত

এমন পরিস্থিতিতে আজ রবিবার (১৭ মে) পালিত হচ্ছে বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হবে। এই বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘একসাথে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করি: নীরব ঘাতককে জয় করি’। ওয়ার্ল্ড হাইপারটেনশন লীগের সদস্য হিসেবে হাইপারটেনশন কমিটি অব ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ ২০০৬ সাল থেকে ১৭ মে দিবসটি পালন করে আসছে।

উচ্চ রক্তচাপের ক্রমবর্ধমান হার

‘বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক অ্যান্ড হেলথ সার্ভে ২০১৭-১৮’ অনুযায়ী, ৩৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের পরিমাণ প্রায় ৪০ শতাংশ, যা ২০১১ সালে ছিল ২৬ শতাংশ। পুরুষের মধ্যে ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩৪ শতাংশে এবং নারীর ক্ষেত্রে এই হার ৩২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত অর্ধেক নারী (৫১ শতাংশ) ও দুই-তৃতীয়াংশ পুরুষই (৬৭ শতাংশ) জানে না যে তাদের উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

এমনকি বাংলাদেশে মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের প্রধান তিনটি কারণের একটি উচ্চ রক্তচাপ। দেশে বছরে ২ লাখ ৭৭ হাজার মানুষ হৃদরোগজনিত অসুস্থতায় মারা যায়, যার অন্যতম প্রধান কারণ উচ্চ রক্তচাপ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘হেলথ অ্যান্ড মরবিডিটি স্ট্যাটাস সার্ভে-২০২৫’ অনুযায়ী বাংলাদেশে শীর্ষ ১০টি রোগের তালিকায় এক নম্বরে রয়েছে উচ্চ রক্তচাপ।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

লবণ গ্রহণ ও অন্যান্য ঝুঁকি

বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চমাত্রায় লবণ গ্রহণ উচ্চ রক্তচাপ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। আক্রান্তদের প্রায় ৬০ শতাংশই অতিরিক্ত লবণ ব্যবহারের কারণে রোগে আক্রান্ত হন। ফলে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, হৃদরোগ, কিডনি বিকল হয়ে যাওয়া এবং দৃষ্টিশক্তি হ্রাসের ঝুঁকি দেখা দেয়। চিকিৎসকেদের মতে, উচ্চ রক্তচাপ থেকে মুক্ত থাকতে হলে নিয়মিত ব্যায়াম, চর্বি ও লবণযুক্ত খাবার পরিহার, সঠিক ওষুধ গ্রহণ এবং জীবনযাপনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে। ওষুধে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে এলেও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কখনোই ওষুধ বন্ধ করা যাবে না।

তরুণদের মধ্যেও উচ্চ রক্তচাপ

বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, “বর্তমানে প্রতি পাঁচ জনের একজন তরুণ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। চিপস, আচার, বার্গার, পিৎজা, কোমল পানীয় ও অতিরিক্ত চিনি-লবণযুক্ত খাবার তরুণদের রক্তচাপ বাড়াচ্ছে। কিশোর-তরুণদের মধ্যে ফলমূল ও শাকসবজি খাওয়ার প্রবণতা কমছে।” এছাড়া ধূমপান, মাদক, বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণও উচ্চ রক্তচাপের বড় ঝুঁকি হিসেবে কাজ করছে। যারা দীর্ঘ সময় বসে কাজ করেন, তাদের উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বেশ বলে জানান তিনি।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ ইন্সটিটিউটের ইপিডেমিওলজি অ্যান্ড রিসার্চ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, “উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগ কেবল প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেই আর সীমাবদ্ধ নেই, বর্তমানে তরুণদের মধ্যেও এই প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।” তিনি বলেন, “খাদ্যাভ্যাস ও জীবনাচরণে পরিবর্তন এবং রক্তচাপ পরীক্ষার মাধ্যমে তরুণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে উচ্চ রক্তচাপের প্রকোপ কমানো সম্ভব।”

রক্তচাপের মাত্রা ও স্ক্রিনিং

রক্তচাপ যদি স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেড়ে যায় তাহলে তাকে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন বলা হয়। স্বাভাবিক অবস্থায় একজন প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ মানুষের রক্তচাপ ১২০-৮০ মি.মি. পারদচাপ ধরা হয়। রক্তচাপের এই মাত্রা দুইটি ভিন্ন দিনে ১৪০-৯০ মি.মি. পারদচাপ বা তার বেশি হলে তবে উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে বলে ধরা হয়। তবে বয়স নির্বিশেষে রক্তচাপ কিছুটা কম বা বেশি হতে পারে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। ডায়াবেটিস ও কিডনি রোগীদের ক্ষেত্রে ১৩০-৮০ মি.মি. পারদচাপের বেশি হলে তা উচ্চ রক্তচাপের পর্যায়ে পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর ৭০ শতাংশই হচ্ছে অসংক্রামক রোগে। এর মধ্যে ৩৪ শতাংশ হৃদরোগে মারা যান। আর হাইপারটেনশন হচ্ছে হৃদরোগের প্রধান কারণ। দেশে আড়াই থেকে ৩ কোটি লোক উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। কিন্তু এদের মধ্যে খুব অল্প সংখ্যকের বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়। কারণ বেশিরভাগই থাকেন স্ক্রিনিংয়ের বাইরে। অধিকাংশ মানুষই রক্তচাপ মাপেন না, তাই তারা জানেন না।