মুখ গহ্বর অতিরিক্ত শুকিয়ে থাকা, জ্বালাপোড়া করা, জিহ্বা চটচটে বা ভারী হয়ে যাওয়া কিংবা রাতে গলা শুকিয়ে ঘন ঘন ঘুম ভেঙে যাওয়া—এইসব লক্ষণ মূলত একটি পরিচিত স্বাস্থ্য সমস্যার দিকে ইঙ্গিত করে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় জেরোস্টোমিয়া বা দীর্ঘস্থায়ী মুখের শুষ্কতা।
বিশ্বব্যাপী কতজন আক্রান্ত?
বিশ্বজুড়ে প্রতি চারজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মধ্যে অন্তত একজন এই সমস্যায় ভোগেন। ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভেনিয়া স্কুল অব ডেন্টাল মেডিসিনের ওরাল মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. রূপালী কুলকার্নি জানান, মুখের শুষ্কতা অবহেলা করলে তা পরবর্তীতে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে।
মুখের শুষ্কতা কী এবং কেন হয়?
মুখের শুষ্কতা হলো মূলত মুখ গহ্বরে লালা বা স্যালাইভার উৎপাদন কমে যাওয়ার একটি লক্ষণ। হঠাৎ করে মুখ শুকিয়ে যাওয়ার পেছনে সাধারণ কিছু কারণ থাকতে পারে, যেমন—অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা উদ্বেগ এবং শরীরে পানির শূন্যতা (ডিহাইড্রেশন)। তবে সমস্যাটি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে বুঝতে হবে এর পেছনে কোনো অন্তর্নিহিত কারণ রয়েছে।
প্রধান কারণসমূহ:
- ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: মুখের শুষ্কতার অন্যতম প্রধান কারণ হলো বিভিন্ন নিয়মিত ওষুধের ব্যবহার। এছাড়া ক্যানসারের চিকিৎসায় কেমোথেরাপি বা রেডিয়েশন থেরাপির ফলেও এটি হতে পারে।
- শারীরিক অসুস্থতা: ডায়াবেটিস, এইচআইভি/এইডস এবং ‘শোগ্রেনস সিনড্রোম’-এর মতো অটোইমিউন রোগের কারণে লালাগ্রন্থি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
- অভ্যাস ও বয়স: ঘুমানোর সময় বা স্বাভাবিক সময়ে মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার অভ্যাস এবং বার্ধক্যজনিত কারণে এই সমস্যা দেখা দেয়।
- স্নায়ুর ক্ষতি: মাথা বা ঘাড়ের কোনো স্নায়ু আঘাতপ্রাপ্ত হলে লালা উৎপাদন কমে যেতে পারে।
মুখের স্বাস্থ্য ও সামগ্রিক জীবনে এর প্রভাব
আমাদের মুখের লালা কেবল খাবার গিলতেই সাহায্য করে না, এটি দাঁত ও মাড়ির সুরক্ষায় ঢাল হিসেবে কাজ করে। লালা মুখের ভেতরের ক্ষতিকর অ্যাসিড নিষ্ক্রিয় করে এবং ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার রোধ করে। পর্যাপ্ত লালা তৈরি না হলে যেসব ঝুঁকি বাড়ে:
- দাঁতের ক্ষয় (ক্যাভিটি) এবং মাড়ির রোগ।
- মুখে একধরণের ছত্রাক সংক্রমণ বা ‘ওরাল থ্রাশ’।
- কথা বলা, খাবার চিবানো ও গিলার ক্ষেত্রে তীব্র অস্বস্তি।
- যারা কৃত্রিম দাঁত ব্যবহার করেন, তাদের জন্য এটি পরা কষ্টদায়ক হয়ে ওঠে।
ড. রূপালী কুলকার্নি বলেন, ‘মুখের শুষ্কতা কেবল মুখের স্বাস্থ্যই নষ্ট করে না, বরং এটি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার মান এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।’
রাতে সমস্যা কেন বাড়ে?
অনেকেরই দিনের চেয়ে রাতে ঘুমানোর সময় মুখ বেশি শুকিয়ে যায় এবং তৃষ্ণায় ঘুম ভেঙে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘুমানোর সময় মুখ খোলা রাখার কারণেই এমনটা হয়। সাধারণত নাক বন্ধ থাকা বা সাইনাসের সমস্যা, নাক ডাকা, স্লিপ অ্যাপনিয়ার কারণে সিপ্যাপ মেশিন ব্যবহার করা কিংবা দাঁতের সুরক্ষায় ‘রিটেইনার’ ব্যবহারের ফলে রাতে মুখ খোলা থাকে, যা শুষ্কতা আরও বাড়িয়ে দেয়।
ঘরোয়া প্রতিকার ও চিকিৎসা
মুখের শুষ্কতা শতভাগ নিরাময় করা সম্ভব কিনা, তা নির্ভর করে এর পেছনের মূল কারণটির ওপর। তবে সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই কষ্ট দূর করা সম্ভব:
- জীবনযাত্রায় পরিবর্তন: সারাদিন সঙ্গে পানির বোতল রাখা এবং অল্প অল্প করে বারবার পানি পান করা। রাতে ঘুমানোর ঘরে হিউমিডিফায়ার বা বাতাস আর্দ্র রাখার যন্ত্র ব্যবহার করা।
- ওভার-দ্য-কাউন্টার (ওটিসি) পণ্য: বাজারচলতি বিশেষায়িত ড্রাই-মাউথ চকলেট, টুথপেস্ট বা মাউথওয়াশ ব্যবহার করা (যেমন: আমেরিকান ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশন অনুমোদিত বায়োটিন ড্রাই মাউথ ওরাল রিন্স)।
- ডাক্তারি পরামর্শ: সমস্যা তীব্র হলে চিকিৎসকের পরামর্শে লালা উৎপাদনকারী বিশেষ ওষুধ সেবন করা যেতে পারে।
সবশেষে যদি কারো নিয়মিত মুখ শুকিয়ে যাওয়ার সমস্যা থাকে, তবে তা লুকিয়ে না রেখে দ্রুত একজন দন্তচিকিৎসকের (ডেন্টিস্ট) পরামর্শ নেওয়া সবথেকে জরুরি। কেননা সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় ও ব্যবস্থা গ্রহণই এই অস্বস্তি থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হতে পারে।
সূত্র: পেন ডেন্টাল মেডিসিন



