চোখের জল: শরীরের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার 'জলকামান'
চোখের জল: শরীরের প্রতিরক্ষার 'জলকামান'

চোখের জলের উপমায় কবি-সাহিত্যিকেরা কখনো ব্যবহার করেছেন মুক্তাকে, কখনোবা বলেছেন ভোরের টলমলে শিশিরবিন্দুর কথা। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, চোখের জল বা অশ্রু হলো শরীরের প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ‘জলকামান’। এটি কেবল দুঃখ বা খুশির অনুভূতির অনুষঙ্গ নয়, বরং প্রতিমুহূর্তেই চোখের জল তৈরি হয়, প্রবাহিত হয় চোখের ওপর দিয়ে এবং সাহায্য করে চোখের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা ও প্রতিরক্ষামূলক কাজে।

চোখের জলের উৎপত্তি ও পথ

চোখের জলের প্রকৃত জলীয় অংশ তৈরি করে ল্যাক্রিমাল গ্রন্থি, যা অক্ষিকোটরের বাইরের দিকে ভ্রুর শেষ সীমানার নিচে অবস্থিত। এখান থেকে কয়েকটি ছোট নালিকার মাধ্যমে চোখের জল এসে প্রবাহিত হয় চোখের ওপর দিয়ে। চোখের সাদা অংশ (স্ক্লেরা) ওপরে থাকে কনজাংকটিভা নামক একটি পাতলা স্বচ্ছ আবরণ, যা চোখের পাতার প্রান্তে প্রতিফলিত হয়। চোখ বন্ধ থাকলে এটি একটি ছোট থলের মতো কাজ করে, যা মাত্র এক ফোঁটা অশ্রু ধারণ করতে পারে।

প্রতি পলক ফেলার সঙ্গে সঙ্গে পুরনো জলের স্তর চোখ থেকে বেরিয়ে যায় এবং নতুন স্তর এসে ছড়িয়ে পড়ে। এই জল চোখের দুই পাতার ভেতরের দিকে থাকা দুটি ছোট ছিদ্র (ল্যাক্রিমাল পাংকটা) দিয়ে নিষ্কাশিত হয়। এরপর ল্যাক্রিমাল ক্যানালিকুলি বা নালিকার মাধ্যমে অশ্রু পৌঁছায় ল্যাক্রিমাল থলেতে, যা চোখের ভেতরের কোনায় নাকের বাইরের অংশে অবস্থিত। শেষ প্রলম্বিত অংশ ন্যাসোল্যাক্রিমাল ডাক্ট বা নেত্রনালি নাকের নিচের অংশে গিয়ে শেষ হয়। এই প্রণালির মাধ্যমে চোখের জল নাকে ও নাসা-গলবিল দিয়ে গলায় পৌঁছায়, যার ফলে কান্নার সময় লবণাক্ত ভাব মুখে অনুভূত হয়।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ
Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অশ্রুর স্তর ও এর গুরুত্ব

চোখের জল শুধু জল নয়; এতে নানা রাসায়নিকের সমন্বয় রয়েছে। কর্নিয়ার ওপর অশ্রুর স্তর সবচেয়ে সুগঠিত, যাকে প্রি-কর্নিয়াল টিয়ার ফিল্ম বলে। এই স্তরের ভেতরের অংশ মিউকাস স্তর, যা কনজাংকটিভা ও কর্নিয়ার গবলেট কোষ দ্বারা তৈরি। এর ওপর থাকে ল্যাক্রিমাল গ্রন্থি থেকে তৈরি জলীয় স্তর এবং তার ওপর একটি তৈলাক্ত স্তর। তেল ও জলের মাঝখানে জল-আকর্ষী প্রোটিন ও ফসফোলিপিড স্তর থাকে। চোখের পাতার বিশেষায়িত গ্রন্থি থেকে তৈরি এই তৈলাক্ত স্তর অশ্রুর জলীয় অংশকে বাষ্পীভবন থেকে রক্ষা করে।

অশ্রুর স্তর স্বচ্ছ কর্নিয়াকে মসৃণ ও আলোর প্রতিসরণের জন্য উপযোগী করে তোলে। কর্নিয়ায় রক্তনালি না থাকায় এর পুষ্টি ও অক্সিজেনের অংশ সরবরাহ করে এই জলের স্তর। এতে থাকা বিশেষ প্রোটিন যেমন লাইসোজাইম, ল্যাকটোফেরিন ও IgA অ্যান্টিবডি অণুজীব ধ্বংস ও নিষ্ক্রিয় করে। এছাড়া চোখের ক্ষত সারাতে গ্রোথ ফ্যাক্টর সরবরাহ করে অশ্রু।

ড্রাই আই: জলকামানের ব্যাঘাত

যদি এই জলকামান ঠিকমতো কাজ না করে, তবে ড্রাই আই (শুষ্ক চোখ) দেখা দেয়। এটি হতে পারে চোখের জল কম তৈরি হওয়া বা স্বাভাবিক পরিমাণে তৈরি জল অস্বাভাবিকভাবে দ্রুত বাষ্পীভূত হওয়ার কারণে। তৈলাক্ত স্তরের কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটলে জলীয় স্তর দ্রুত বাষ্পীভূত হয়। ইলেকট্রনিক ডিভাইসের অতিরিক্ত ব্যবহার পলক ফেলার হার কমিয়ে দেয়, যার ফলে তৈলাক্ত স্তরের পুরুত্ব কমে যায়। দীর্ঘমেয়াদি শুষ্কতা কর্নিয়ার প্রদাহ ও গভীর ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে, যা দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নিতে পারে।

ড্রাই আই থেকে বাঁচতে নিয়মিত পলক ফেলা জরুরি। ‘২০-২০-২০’ নিয়ম অনুসরণ করা যেতে পারে: ২০ মিনিট স্ক্রিনটাইমের পর ২০ মিটার দূরে ২০ সেকেন্ড তাকিয়ে থাকা।

লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা মেডিকেল কলেজ। লেখাটি ২০২৬ সালে বিজ্ঞানচিন্তায় এপ্রিল সংখ্যায় প্রকাশিত।