বাংলাদেশে চিকিৎসকদের বিচিত্র জগৎ: বৈধ থেকে অবৈধ, উপকার থেকে অপচিকিৎসা
মানুষের অসুস্থতার ইতিহাস যত পুরনো, চিকিৎসকের পেশাও ততটাই প্রাচীন। সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই চিকিৎসা সেবার অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়। হিন্দু শাস্ত্রে অশ্বিনী কুমার নামক দুই ভাইয়ের উল্লেখ রয়েছে, যারা স্বর্গের চিকিৎসক বা বৈদ্য হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ধর্মগ্রন্থের এই বাণী থেকে বোঝা যায়, দেবতাদের মতো মানুষেরাও রোগমুক্তির জন্য চিকিৎসকের দ্বারস্থ হন। প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত বিশ্বের প্রতিটি জনপদে চিকিৎসকের উপস্থিতি বিদ্যমান, যদিও স্থান ও কালভেদে তাদের মর্যাদা ও পরিচয়ে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। বাংলাদেশও এই ধারাবাহিকতায় চিকিৎসকদের প্রতাপ ও প্রভাব নিয়ে দীপ্তিমান রয়েছে।
বাংলাদেশে চিকিৎসকদের প্রকারভেদ ও সংখ্যার রহস্য
বাংলাদেশে চিকিৎসক আছেন, এতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রশ্ন উঠতে পারে, এখানে কত প্রকারের চিকিৎসক রয়েছেন এবং তাদের সঠিক সংখ্যা কত? এই প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর দেওয়ার মতো গবেষক এখনও জন্মগ্রহণ করেননি বললে ভুল হবে না। তবে, আসুন আমরা চেষ্টা করি বাংলাদেশের চিকিৎসকদের প্রকারভেদ সম্পর্কে একটি ধারণা লাভ করতে।
বিএমডিসি নিবন্ধিত চিকিৎসক: বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) একটি স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান, যার মূল কাজ হলো স্বীকৃত মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস বা বিডিএস ডিগ্রিধারী ব্যক্তিদের নিবন্ধন প্রদান করা। বিএমডিসির আইন অনুযায়ী, শুধুমাত্র নিবন্ধিত ব্যক্তিরাই তাদের নামের পূর্বে ‘ডাক্তার’ বা ‘ডা.’ পদবী ব্যবহার করতে পারেন এবং বৈধভাবে চিকিৎসা সেবা দিতে পারেন।
মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট ও অন্যান্য: চিকিৎসা কাজে সহায়তার জন্য মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট তৈরির ডিপ্লোমা কোর্স চালু রয়েছে। কিন্তু বিএমডিসির আইন উপেক্ষা করে অনেক মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট তাদের নামের আগে ‘ডাক্তার’ পদবী যুক্ত করে রোগী দেখছেন, যা অবৈধ ও বিপজ্জনক।
এলএমপি ও ডিএফএম: অপ্রাতিষ্ঠানিক চিকিৎসকদের উপস্থিতি
বাংলাদেশে আরেকদল চিকিৎসক রয়েছেন, যাদের ডিগ্রির নাম ‘এলএমপি’ বা লোকাল মেডিক্যাল প্রাক্টিশনার। এটি কোন প্রাতিষ্ঠানিক মেডিক্যাল ডিগ্রি নয়, বরং একটি অনানুষ্ঠানিক পদবী। এরা সাধারণত গ্রামাঞ্চলে বা শহরের অলিগলিতে দেখা যায়। একইভাবে, ‘ডিএফএম’ বা ডিপ্লোমা ইন ফ্যামিলি মেডিসিন নামক আরেকটি অপ্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি রয়েছে, যা ঔষধের দোকান দেওয়ার জন্য ছয় মাসের একটি কোর্সের মাধ্যমে অর্জন করা হয়। এই কোর্স সম্পন্ন করে অনেকে নিজেদের নামের আগে ডাক্তার পদবী লাগিয়ে চিকিৎসা করছেন, যাদের সংখ্যা হাজার হাজার হতে পারে।
বিভিন্ন পেশাজীবীর চিকিৎসক সেজে ওঠা
বড় হাসপাতালের অ্যাটেন্ডেন্ট নার্স, ওয়ার্ড বয় বা আয়া হিসেবে কাজ করা ব্যক্তিরাও গ্রামে গিয়ে ডাক্তার সেজে চিকিৎসা করছেন। কিছুদিন চিকিৎসকের চেম্বারে সহকারী হিসেবে কাজ করার পর অনেকে গ্রামে ফিরে চেম্বার খুলে বসেন। এমনকি, ওটি বয় বা নার্স হিসেবে কাজ করা ব্যক্তিরা নিজেদের সার্জারি বিশেষজ্ঞ বলে পরিচয় দিয়ে ছোটখাটো অপারেশন করছেন। স্ত্রীরোগ বিভাগে কাজ করা আয়া বা নার্সরাও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে রোগী দেখছেন। ফিজিওথেরাপির সংক্ষিপ্ত কোর্স সম্পন্ন করেও অনেকে ডাক্তার পদবী ব্যবহার করে রোগী দেখছেন, যা রাজধানী থেকে শুরু করে সারাদেশে দৃশ্যমান।
হোমিওপ্যাথি, আয়ুর্বেদ ও ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা পদ্ধতি
দেশে হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারদের একটি বড় অংশ রয়েছেন, যাদের মধ্যে অনেকে স্বীকৃত কলেজ থেকে পড়াশোনা করে ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তবে, অনেকেই শর্ট কোর্সে পড়ালেখা করে বা নিজে নিজে বই পড়ে ডাক্তার হয়ে যান। আয়ুর্বেদিক ও হার্বাল মেডিসিনের প্রচুর ডাক্তার, কবিরাজ বা হেকিম পরিচয়ে চিকিৎসা করছেন। ইউনানি ও তিব্বতীয় চিকিৎসা পদ্ধতির অনুসারীদেরও দেখা যায়।
গ্রামাঞ্চলে এখনও জড়িবুটি, তাবিজ-কবচ, শিঙা লাগানো ইত্যাদির মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া হয়। সাপের বিষ নামানো, জ্বিন-ভুতের আছর দূর করার জন্য ওঝা, ফকির, পীরেরা হাত-চালান, বাটি-চালান, মরিচ-চিকিৎসা ইত্যাদি পদ্ধতি অনুসরণ করেন। এই সমস্ত চিকিৎসা পদ্ধতির বিস্তারিত লিপিবদ্ধ করতে হলে পিএইচডি পর্যায়ের গবেষণার প্রয়োজন হতে পারে।
অপচিকিৎসার ভয়াবহতা ও মানবিক বিপর্যয়
ঝাড়ফুঁক, তাবিজ-পানিপড়া ইত্যাদি পদ্ধতি অনেক সময় সাইকোথেরাপি হিসেবে কাজ করে এবং রোগী সাময়িকভাবে ভালো বোধ করতে পারে। কিন্তু বিষধর সাপের কামড়ে ওঝার চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যু হতে পারে, অথচ সময়মতো হাসপাতালে নিয়ে গেলে অ্যান্টি-স্নেক ভেনম প্রয়োগে জীবন রক্ষা সম্ভব। মানসিক রোগী বা মৃগী রোগীদের চিকিৎসার নামে ভয়াবহ শারীরিক নির্যাতনের ঘটনাও ঘটে।
বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসায় অনেক ওঝা বা ফকির বিকৃতকামী আচরণ করেন, যেমন মন্ত্র পড়ে নারীর যৌনাঙ্গে ফুঁ দেওয়া বা শারীরিক মিলনে অগ্রসর হওয়া। হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারদের বিজ্ঞাপনে ক্যান্সার বা কিডনি ফেইলিউর শতভাগ ভালো করার দাবি বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে, যার ফলে অনেক রোগী অকালে মৃত্যুবরণ করেন। একটি উদাহরণ হলো, এক শিক্ষক দম্পতির শিশুর ডায়ারিয়া হলে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসায় পানিশূন্যতা ও কিডনি ফেইলিউর দেখা দেয়, এবং শেষ পর্যন্ত শিশুটির মৃত্যু হয়।
স্বাস্থ্যসেবা সংস্কারের জরুরি পদক্ষেপ
হরেক রকম চিকিৎসকের হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করতে একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন পথনকশা তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবা রাজধানী ও কয়েকটি বড় শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় গ্রামাঞ্চলে সেবার অভাব প্রকট। স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঠিক বিকেন্দ্রীকরণ করা প্রয়োজন। অধিকাংশ রোগের চিকিৎসা জেলা পর্যায়ে নিশ্চিত করতে হবে এবং একটি কার্যকর রেফারেল সিস্টেম প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
ধাপে ধাপে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার কর্মসূচি হাতে নেওয়া উচিত। চিকিৎসার সাথে যুক্ত সবাইকে আইনি বাধ্যবাধকতার আওতায় আনতে হবে। এই সংস্কার কাজ শুরু করার সঠিক সময় এখনই, কারণ দেরি হলে আরও অনেক প্রাণ অকালে ঝরে যাবে এবং মানুষের স্বাস্থ্য ও সম্পদের ক্ষতি হবে।
লেখক: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ
*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।



