বাংলাদেশে ২০১১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার ৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ২৯ ভাগ হয়েছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে বিশ্বজুড়ে মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে, যার ফলে বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বয়স্কদের স্বাস্থ্যসেবা বা জেরিয়াট্রিক কেয়ারকে আলাদা করে গুরুত্ব দেওয়ার সময় এসেছে। উন্নত বিশ্বে এই সেবা ইতিমধ্যে চালু থাকলেও বাংলাদেশে এখনো সে সচেতনতা গড়ে ওঠেনি।
বয়স্কদের সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা
বয়স বাড়ার সাথে সাথে বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগ দেখা দেয়। অধিকাংশ বয়স্ক মানুষ দুই বা ততোধিক ক্রনিক ডিজিজে ভুগে থাকেন, যেমন উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনি বৈকল্য, শ্বাসযন্ত্রের রোগ, স্ট্রোক, হার্টের সমস্যা, হাড়ক্ষয় ও বেডসোর।
জেরিয়াট্রিক সিনড্রোম নামে পরিচিত কিছু সমস্যা রয়েছে, যা কোনো একক অসুখ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না; বরং শরীরের সামষ্টিক কার্যক্ষমতার ক্ষয়িষ্ণু অবস্থাকে বোঝায়। যেমন ডিমেনশিয়া (স্মৃতিভ্রষ্টতা) ও ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যাওয়া।
ইনকন্টিনেন্স ও অপুষ্টি
ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি, স্ট্রোক, ক্যানসার, প্রোস্টেটের সমস্যাসহ কিছু জটিল কারণে বয়স্ক রোগীরা প্রস্রাব-পায়খানার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন, যাকে ইনকন্টিনেন্স বলে। অরুচি, দাঁত ও মাড়ির সমস্যা এবং হজমের সমস্যার কারণে অনেক বয়স্ক ব্যক্তি ঠিকমতো খেতে চান না, ফলে অপুষ্টির শিকার হন।
শয্যাশায়ী রোগীদের ত্বকে ক্ষত বা বেডসোর হতে পারে, যার জন্য বিশেষ সেবা প্রয়োজন।
বয়স্কদের জন্য করণীয়
বয়স্কদের জন্য ফ্র্যাকচার বা হাড়ভাঙা করুণ পরিণতি ডেকে আনে। তাই সময়মতো হাড়ক্ষয়ের চিকিৎসা, যথেষ্ট ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি গ্রহণ, প্রতিদিন কিছুটা সময় রোদে বসা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে বিসফসফোনেট-জাতীয় ওষুধ গ্রহণ করতে হবে।
পুষ্টিমান বজায় রাখতে সুষম খাবার গ্রহণ করতে হবে। মাছ, সবজি, ফলমূল, আঁশ-জাতীয় খাবার, বাদাম ও ভিটামিন খাদ্যতালিকায় রাখা উচিত। পেশিক্ষয় ঠেকাতে যথেষ্ট প্রোটিন দরকার। অতিরিক্ত শর্করা ও চর্বি-জাতীয় খাবার বর্জন করতে হবে। খাবার সহজপাচ্য হতে হবে।
শারীরিক কার্যকলাপ ও মানসিক স্বাস্থ্য
বয়স্কদেরও রোজ কিছুটা শারীরিক পরিশ্রম ও হাঁটার অভ্যাস করা উচিত। ভারসাম্য বাড়াতে ব্যালেন্সিং এক্সারসাইজ করা যায়। ফিটনেস ও পেশিশক্তি বাড়ানোর নির্দিষ্ট ব্যায়াম আছে। যাঁদের পক্ষে নিজে করা সম্ভব নয়, তাঁদের জন্য ফিজিওথেরাপিস্টের সাহায্য নেওয়া যায়। দিনের কিছুটা সময় প্রকৃতির সান্নিধ্যে কাটানো দরকার।
পর্যাপ্ত ঘুম ও বিনোদন জরুরি। যথাসম্ভব ঘুমের ওষুধ এড়িয়ে চলা উচিত। পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করলে মানসিক অবসাদ কমে। বয়স্করা যেন অবহেলিত বোধ না করেন, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বাড়িতে শিশু থাকলে তাদের কিছুটা সময় বয়স্কদের সঙ্গে কাটাতে দিলে দুজনের জন্য ভালো।
নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা
বয়স্কদের ঘর ও আবাসস্থলের নিরাপত্তা বড় ধরনের দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর। ঘরে পর্যাপ্ত আলো থাকা জরুরি। মেঝে বা সিঁড়ি পিচ্ছিল থাকা যাবে না। বাথরুম শুকনা রাখতে হবে। টয়লেটে দরকার হলে রেলিং ব্যবহার করুন। জরুরি অ্যালার্ম ব্যবহার করা যেতে পারে।
নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা নেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। পারিবারিকভাবে না হলে রাষ্ট্রীয়ভাবে বয়স্কদের স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনার ব্যবস্থা করা উচিত। কেয়ার গিভার, কেয়ার হোম, নার্সিং হোম, হসপিস সেন্টার গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। সরকারিভাবে ছাড়াও ব্যক্তি উদ্যোগে যাঁরা এসব সেন্টার চালানোর সামর্থ্য রাখেন, তাঁদের উৎসাহিত করা জরুরি।
সময় এসেছে হাসপাতালগুলোতে জেরিয়াট্রিক মেডিসিনের আওতায় বয়স্কদের সব ধরনের স্বাস্থ্যসেবা একছাতার নিচে আনার। যাতে তাঁদের একেক সমস্যায় একেক ডাক্তার ও হাসপাতালে ছোটাছুটি করতে না হয়।



