প্লাস্টিক–দূষণ আধুনিক পৃথিবীর অন্যতম বড় সমস্যা। প্লাস্টিক ভেঙে অতিক্ষুদ্র কণায় পরিণত হলে তাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলে। এই কণাগুলো এতই ছোট যে এদের আকার ১ ইঞ্চির ২৫ হাজার ভাগের ১ ভাগ পর্যন্ত হতে পারে। ফলে খালি চোখে দেখা যায় না।
মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি ও ক্ষতি
২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, সারা বিশ্বে পরীক্ষা করা ট্যাপের পানির প্রায় ৮৩ শতাংশেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি আছে। অর্থাৎ প্রতিনিয়ত পানের পানির সঙ্গে এই প্লাস্টিক মানবদেহে প্রবেশ করছে। এটি মস্তিষ্ক, প্রজনন অঙ্গ ও রক্তনালি সিস্টেমে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। প্রাণীদেহে গবেষণায় দেখা গেছে, এই প্লাস্টিক হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে এবং প্রজননগত নানা সমস্যা তৈরি করে।
শজনের বীজের বিস্ময়কর গুণ
শজনে গাছ বিশ্বজুড়ে ‘মিরাকল ট্রি’ নামে পরিচিত। পুষ্টিগুণ ও ঔষধি ক্ষমতার জন্য এটি সমাদৃত। গত এপ্রিলে যুক্তরাজ্য ও ব্রাজিলের একদল বিজ্ঞানী এর আরেকটি বিস্ময়কর গুণ প্রকাশ করেছেন। ব্রাজিলের সাও পাওলো স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আদ্রিয়ানো গনকালভেস দস রেইস জানান, প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ পানি বিশুদ্ধ করতে এই গাছ ব্যবহার করে আসছে। প্রাচীন গ্রিক, রোমান ও মিসরীয়রাও পানি পরিষ্কার করার জন্য শজনের বীজ ব্যবহার করত। এক দশক ধরে তাঁর দল এই বীজ নিয়ে গবেষণা করছে।
কীভাবে কাজ করে?
এই বীজগুলো পানিতে জমাট বাঁধার উপাদান হিসেবে কাজ করে। পানির ভেতরে ভাসতে থাকা অতিক্ষুদ্র কণাগুলোকে এই বীজের নির্যাস আঠার মতো একে অপরের সঙ্গে আটকে দেয়। ফলে কণাগুলো ভারী হয়ে নিচে জমে যায় এবং সহজেই পানি থেকে ফিল্টার করা যায়।
গবেষণার ফল
গবেষকেরা তাঁদের পরীক্ষায় সবচেয়ে ক্ষতিকর পিভিসি মাইক্রোপ্লাস্টিকের ওপর জোর দিয়েছিলেন, যা খাওয়ার পানিতে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। তাঁরা ১৮ দশমিক ৮ মাইক্রোমিটার আকারের মাইক্রোপ্লাস্টিক মেশানো পানিতে শজনের বীজের নির্যাস ব্যবহার করেন। ১৮ দশমিক ৮ মাইক্রোমিটার মানে মানুষের একটি চুলের গড় পুরুত্বের প্রায় চার ভাগের এক ভাগ। ফিলট্রেশন সিস্টেমে এই নির্যাস ট্যাপের পানি থেকে ৯৮ দশমিক ৫ শতাংশ মাইক্রোপ্লাস্টিক দূর করতে সফল হয়।
ফিটকিরির তুলনায় কার্যকারিতা
পানি পরিষ্কার করতে সাধারণত ফিটকিরি ব্যবহার করা হয়। বিজ্ঞানীদের পরীক্ষায় দেখা গেছে, শজনের বীজের কার্যক্ষমতা ফিটকিরির প্রায় সমান। আর ক্ষারীয় পানিতে এটি ফিটকিরির চেয়ে বেশি কার্যকর।
প্রাকৃতিক ও টেকসই সমাধান
শজনের বীজ ব্যবহারের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি সম্পূর্ণ নবায়নযোগ্য, পরিবেশবান্ধব এবং কোনো ক্ষতিকর বিষাক্ত বর্জ্য তৈরি করে না। অন্যদিকে অ্যালুমিনিয়াম বেশি মাত্রায় শরীরে প্রবেশ করলে তা বিষাক্ত হতে পারে এবং স্নায়বিক রোগের কারণ হিসেবেও পরিচিত। ইউনিভার্সিটি অব নিউ মেক্সিকো হেলথ সায়েন্সেস সেন্টারের ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সের অধ্যাপক ম্যাথিউ ক্যাম্পেন বলেন, অ্যালুমিনিয়ামভিত্তিক ফিল্টারের বদলে প্রাকৃতিক এই উপাদানের ব্যবহার একটি সস্তা ও টেকসই সমাধান দিতে পারে। এটি পরিবেশ ধ্বংসকারী অ্যালুমিনিয়াম খনির প্রয়োজনীয়তাও কমিয়ে আনবে।
সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
তবে এ প্রক্রিয়ার কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, একটি শজনের বীজ দিয়ে প্রায় ১০ লিটার পানি পরিষ্কার করা যায়। ছোট এলাকা বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য এটি দারুণ কার্যকর হলেও বড় বড় শহরের কোটি কোটি লিটার পানি পরিষ্কার করার জন্য অনেক বীজ প্রয়োজন। এ ছাড়া বীজ বেশি ব্যবহার করলে পানিতে জৈব বর্জ্য থেকে যেতে পারে, যা আলাদা করে অপসারণ করার প্রয়োজন পড়বে।
বিজ্ঞানীরা এখন গবেষণা করছেন পদ্ধতিটি কতটা সাশ্রয়ী করা যায়। পাশাপাশি মানুষের চুলের হাজার ভাগের এক ভাগ আকারের ন্যানোপ্লাস্টিক দূর করতে এটি কতটা কার্যকর হবে, তা-ও পরীক্ষা করে দেখছেন। পরিবেশে মাইক্রোপ্লাস্টিক ও ন্যানোপ্লাস্টিকের মাত্রা ক্রমশ বাড়ছে এবং আগামী কয়েক দশক এই প্রবণতা কমার কোনো সম্ভাবনা নেই। এমন পরিস্থিতিতে শজনের বীজের মতো প্রাকৃতিক ও সহজলভ্য সমাধান জনস্বাস্থ্য রক্ষায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র: সিএনএন



