হজ ইসলামের অন্যতম ফরজ ইবাদত, যা পালনের আকাঙ্ক্ষা থাকে প্রতিটি মুসলমানের হৃদয়ে। প্রতি বছর বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে অসংখ্য নারী এই পবিত্র সফরে অংশ নেন। তবে হজ শুধু আত্মিক সাধনার বিষয় নয়; এটি শারীরিক ও মানসিকভাবে নিজেকে প্রস্তুত করারও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। হজে নারীদের স্বাস্থ্যসুরক্ষা বিষয়ে বিস্তারিত জানালেন মুন্সীগঞ্জের ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের কনসালটেন্ট ও বিভাগীয় প্রধান ডা. মো. সাঈদ হোসেন।
হজে যাওয়ার আগে নারীদের কী ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি?
ডা. সাঈদ হোসেনের মতে, হজের প্রস্তুতি শেষ মুহূর্তে নয়, বরং অনেক আগেই শুরু করা উচিত। প্রথমেই প্রয়োজনীয় টিকা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোভিড-১৯ (বুস্টার ডোজসহ), ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং মেনিনজাইটিস (A, C, Y, W-135) টিকা সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক। যেসব নারী আগে থেকেই ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হাঁপানি বা দীর্ঘমেয়াদি কোনো রোগে ভুগছেন, তাদের অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। পাশাপাশি অন্তত দেড় মাসের ওষুধ সঙ্গে রাখা উচিত। প্রয়োজনে গ্লুকোমিটার বা ব্লাড প্রেসার মাপার যন্ত্র সঙ্গে রাখাও উপকারী।
বয়স বাড়লে কি অতিরিক্ত কোনো প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়?
হ্যাঁ, বিশেষ করে ৪০ বছরের বেশি বয়সী নারীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। হজে যাওয়ার কমপক্ষে দুই মাস আগে একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানো উচিত। এতে লুকিয়ে থাকা কোনো রোগ থাকলে আগে থেকেই শনাক্ত করা যায়। এছাড়া শারীরিকভাবে প্রস্তুত থাকতে প্রতিদিন নিয়মিত হাঁটার অভ্যাস করা উচিত, প্রায় ২ থেকে ৩ কিলোমিটার হাঁটা শরীরকে প্রস্তুত করতে সহায়ক।
হজের আগে কোন কোন মেডিকেল টেস্ট প্রয়োজন?
নির্ধারিত মেডিকেল সেন্টারে টিকা নেওয়ার সময় কিছু পরীক্ষা বাধ্যতামূলক থাকে। এর মধ্যে রয়েছে—ইউরিন আর/এম/ই, ব্লাড গ্রুপিং অ্যান্ড আরএইচ টাইপিং, র্যান্ডম ব্লাড সুগার, চেস্ট এক্স-রে, ইসিজি এবং সিরাম ক্রিয়েটিনিন। এসব পরীক্ষা সাধারণত তিন মাসের মধ্যে সম্পন্ন থাকতে হয়। পাশাপাশি নির্ধারিত স্বাস্থ্য ফর্ম পূরণ করে অনুমোদিত চিকিৎসকের স্বাক্ষরসহ জমা দিতে হবে এবং আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য কার্ড সংগ্রহ করতে হবে।
হজযাত্রায় কী ধরনের ওষুধ সঙ্গে রাখা উচিত?
ব্যক্তিগত ওষুধ বহন করা অত্যন্ত জরুরি এবং প্রেসক্রিপশনও সঙ্গে রাখা উচিত। সাধারণ কিছু ওষুধ যেমন: জ্বর ও ব্যথার জন্য প্যারাসিটামল, অ্যালার্জির জন্য ফেক্সোফেনাডিন, গ্যাস্ট্রিকের জন্য ওমিপ্রাজল, ওআরএস, ভিটামিন ও মিনারেল, এবং অ্যান্টিফাঙ্গাল ক্রিম রাখা যেতে পারে। কারণ, জটিল রোগের অনেক ওষুধ সৌদি আরবে সহজলভ্য নাও হতে পারে বা খরচ বেশি হতে পারে, তাই আগে থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া ভালো।
কোন অবস্থায় হজে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে?
কিছু শারীরিক অবস্থায় হজে যাওয়া নিরাপদ নয়। যেমন: মানসিক ভারসাম্যহীনতা, পক্ষাঘাতজনিত চলাচলের সমস্যা, ডায়ালাইসিসের প্রয়োজন হয় এমন রোগ, বা গুরুতর ক্যানসার। এ ধরনের পরিস্থিতিতে ঝুঁকি নিয়ে হজে যাওয়া নিজের পাশাপাশি অন্যদের জন্যও সমস্যার কারণ হতে পারে।
সৌদি আরবে অবস্থানকালে নারীদের কী কী বিষয়ে সতর্ক থাকা উচিত?
সৌদি আরবের আবহাওয়া বেশ গরম ও শুষ্ক, তাই শরীর হাইড্রেট রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত পানি পান করতে হবে এবং ধুলাবালি থেকে বাঁচতে মাস্ক ব্যবহার করা উচিত। ত্বক শুষ্ক হয়ে গেলে ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা ভালো। অতিরিক্ত ঠান্ডা পানি বা পরিবেশ এড়িয়ে চলা উচিত। খালি পায়ে হাঁটা থেকে বিরত থাকতে হবে, পায়ে ফোস্কা হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। খাবারের ক্ষেত্রে ডায়াবেটিস রোগীদের মিষ্টি এড়িয়ে চলা এবং আইবিএস সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের দুধজাত খাবার কম খাওয়া উচিত। পাশাপাশি অতিরিক্ত পরিশ্রম না করে প্রয়োজনমতো বিশ্রাম নেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
নারী হজযাত্রীদের জন্য বিশেষ কোনো পরামর্শ আছে কি?
অবশ্যই আছে। গর্ভবতী বা শারীরিকভাবে দুর্বল নারীদের আগে থেকেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। অনেকেই মাসিক বন্ধ রাখার ওষুধ নিতে চান, এক্ষেত্রে অবশ্যই স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মেনে চলতে হবে। ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রয়োজনীয় স্যানিটারি সামগ্রী সঙ্গে রাখা এবং সঠিকভাবে ব্যবহার করার অভ্যাস গড়ে তোলা দরকার।
হজের সময় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কী ধরনের চিকিৎসা সহায়তা পাওয়া যায়?
বাংলাদেশ সরকার হজযাত্রীদের জন্য সৌদি আরবের মক্কা, মদিনা ও জেদ্দায় মেডিকেল সেন্টার স্থাপন করেছে। এসব কেন্দ্রে বহির্বিভাগ এবং জরুরি চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয় এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ করা হয়।
দেশে ফেরার পর কোনো শারীরিক সমস্যা হলে কী করণীয়?
হজ শেষে দেশে ফেরার পর ১৪ দিনের মধ্যে যদি জ্বর, কাশি, সর্দি বা অন্য কোনো উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে নিজেকে আলাদা রাখা এবং দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করা উচিত।
হজ একটি পবিত্র ইবাদত হলেও এটি শারীরিকভাবে যথেষ্ট কষ্টসাধ্য। তাই নারীদের জন্য আগাম পরিকল্পনা, স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা মেনে চলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুস্থ শরীর ও সচেতন প্রস্তুতিই হজের এই মহতী ইবাদতকে করে তুলতে পারে আরও সহজ, নিরাপদ এবং পরিপূর্ণ।



