বাংলাদেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবে আক্রান্তের সংখ্যা ৪৫ হাজার ছাড়িয়েছে। চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত এই সময়ে ৩১ হাজার ৯১২ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং মৃত্যু হয়েছে তিন শতাধিক শিশুর। দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালসহ দেশের প্রতিটি চিকিৎসাকেন্দ্রে শয্যা সংকট দেখা দিয়েছে। মেঝেতে রেখে শিশুদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। আইসিইউ বা পেডিয়াট্রিক আইসিইউ (পিআইসিইউ) না পেয়ে অভিভাবকরা হাহাকার করছেন। প্রতিদিন বহু শিশুর মৃত্যু ও মায়েদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠছে হাসপাতালের পরিবেশ।
সফলতার শিখর থেকে বিপর্যয়ের খাদে
একসময় টিকাদান কর্মসূচিতে বাংলাদেশ ছিল বিশ্বের রোল মডেল। টিকার মাধ্যমে শিশু মৃত্যুর হার কমানো এবং সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে ২০১৯ সালে দেশ ‘ভ্যাকসিন হিরো’ সম্মাননা পায়। কোভিড-১৯ মহামারির সময়ও দ্রুততম সময়ে টিকা সংগ্রহ ও সফল গণটিকাদান নিশ্চিত করা হয়েছিল। ইপিআই তথ্য বলছে, ২০১৭ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশে গড়ে ৯০ শতাংশের বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছিল।
সাধারণত ৯ মাস বয়সে হাম-রুবেলা (এমআর) টিকার প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, হামের সংক্রমণ কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে একটি জনগোষ্ঠীর অন্তত ৯৫ শতাংশ মানুষকে দুই ডোজ টিকার আওতায় থাকতে হয়। তবে পরিবারগত অসচেতনতা, ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা বা অন্যান্য কারণে কিছু শিশু নিয়মিত টিকাদান থেকে বাদ পড়ে যায়। এ কারণে নিয়মিত টিকাদানের পাশাপাশি বাদ পড়া ১০ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে প্রতি চার বছর অন্তর বিশেষ ক্যাম্পেইন চলতো। শেষ দুটি ক্যাম্পেইনে ২০১৬ ও ২০২০ সালে স্বাস্থ্য অধিদফতরের ‘জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি’র মাধ্যমে ওই শিশুদের জন্য কার্যক্রম চালানো হয়।
যেখান থেকে সংকটের শুরু
পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর টিকাদান কর্মসূচিতে স্থবিরতা আসে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইউনিসেফের মাধ্যমে প্রচলিত টিকা সংগ্রহের পদ্ধতি পরিবর্তন করে ‘উন্মুক্ত দরপত্র’ ব্যবস্থা চালু করা হয়। ইউনিসেফ তখনই এই পরিবর্তনের বিরোধিতা করে সতর্ক করেছিল যে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় টিকা সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে। বাস্তবেও তা-ই ঘটেছে। দরপত্র প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতায় আটকে যাওয়ায় টিকার মজুত শেষ হয়ে যায়। ২০২৪ সালে নির্ধারিত হাম-রুবেলার সম্পূরক কর্মসূচি পিছিয়ে ২০২৫-এ নেওয়া হয় এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি বাতিল করা হয়। এর সুস্পষ্ট প্রভাব পড়ে কাভারেজে। ২০২৫ সালে এসে এমআর-১ টিকার কাভারেজ ৫৬.৫ শতাংশ এবং এমআর-২ টিকার কাভারেজ ৫৭.১ শতাংশে নেমে আসে। এই বিশাল ঘাটতিই বর্তমান মৌসুমের ভয়াবহ মহামারির মূল কারণ। সদ্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের মাত্র ১৮ মাসে ভেঙে পড়লো বাংলাদেশে সফল সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি।
জনস্বাস্থ্যের বিশাল এক অর্জন যদি অযোগ্য, অজ্ঞ, দায়িত্বজ্ঞানহীন, অবিমৃশ্যকারীদের কবলে পড়ে, তখন তা কত দ্রুত ধ্বংস হতে পারে! তার পরিণতি যে কতটা মারাত্মক হতে পারে, আমাদের শিশুরা জীবন দিয়েই সেটা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে।
রাজনৈতিক সুবিধা ও সত্যের বিকৃতি
অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে বর্তমান সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা দাবি করেছেন, ‘গত ৮ বছর দেশে হামের টিকা দেওয়া হয়নি।’ প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, হামের টিকা না দেওয়া গত দুই সরকারের ক্ষমাহীন অপরাধ। এই বক্তব্যটি সত্যের বিকৃতি এবং এটি পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতাকে আড়াল করার একটি কৌশল মাত্র। আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর দায় চাপিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত ভুল ও অদক্ষতাকে লঘু করে দেখার সুযোগ নেই। ইউনূস ও তার স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহানকে এই ক্ষমাহীন অপরাধের দায় থেকে মুক্ত রাখার সুযোগ নেই।
প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগে এত শিশুর মৃত্যু কোনো সাধারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং এটি একটি স্পষ্ট রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা। তাই দায় নির্ধারণ, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং সুষ্ঠু বিচার- এই তিন প্রশ্ন উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
বর্তমান চিত্র ও করণীয়
অবশেষে গত এপ্রিল মাস থেকে পুনরায় ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনা শুরু হয়েছে। ৫ এপ্রিল থেকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এবং ২০ এপ্রিল থেকে দেশজুড়ে জরুরি গণটিকাদান কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধীরগতির কার্যক্রম মহামারি নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল নিয়মিত টিকাদানের পরিসংখ্যান নয়, রোগের তীব্রতা ও মৃত্যুর হারের ওপর ভিত্তি করে কার্যকর নজরদারি ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে।
প্রশ্ন হলো, এই ভয়াবহ জরুরি অবস্থা মোকাবিলায় যে প্রয়োজনীয় ক্ষিপ্রতা, তথ্যভিত্তিক কার্যকর কৌশল গ্রহণের সক্ষমতা ও জনসম্পৃক্ততাসম্পন্ন দৃঢ় নেতৃত্ব প্রয়োজন—আমরা কি তা নিশ্চিত করতে পারছি?
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে একজন থেকে অন্যজনে ছড়ায়। এটি মূলত শিশুদের বেশি হয়। বিখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী দ্য ল্যানসেট বাংলাদেশের এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একটি রোডম্যাপ প্রস্তাব করেছে—১. হাসপাতালে প্রতিটি হাম আক্রান্ত রোগী ভর্তির ৭২ ঘণ্টার মধ্যে তাঁর পরিবার ও সংলগ্ন এলাকায় অনুসন্ধান চালিয়ে টিকাদান নিশ্চিত করা। ২. জেলাভিত্তিক সাপ্তাহিক ড্যাশবোর্ড প্রকাশ করা, যেখানে আক্রান্ত, আইসিইউ ও মৃত্যুর হারের স্পষ্ট চিত্র থাকবে। ৩. প্রাদুর্ভাব ব্যবস্থাপনা ও পুষ্টি পরীক্ষার (বিশেষ করে ভিটামিন-এ) মধ্যে সমন্বয় করা। ৪. বস্তি ও অভিবাসী এলাকাগুলোতে ‘জিরো-ডোজ’ বা টিকাবঞ্চিত শিশুদের ম্যাপিং করা।
উপসংহার
হাজার হাজার শিশুর জীবন আজ ঝুঁকির মুখে। শিশুদের এই মৃত্যু ও মায়েদের আহাজারি কেবল একটি স্বাস্থ্যগত সংকট নয়, এটি আমাদের মানবিক সত্তার ওপর এক বিশাল চপেটাঘাত। দলমত নির্বিশেষে এই মহামারি মোকাবিলায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। রাষ্ট্রের অদক্ষতা ও দায়িত্বহীনতার চড়া মূল্য যেন আমাদের শিশুদের আর দিতে না হয়, সেটিই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।
লেখক: কলামিস্ট, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা, সিনিয়র কনসালটেন্ট, ল্যাবরেটরি মেডিসিন, এভারকেয়ার হাসপাতাল



