গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার নাগরী ইউনিয়নের তালিয়া গ্রামে প্রায় ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ২০ শয্যার একটি হাসপাতাল পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে অচল অবস্থায় পড়ে আছে। চিকিৎসাসেবা না থাকায় ভবনটি এখন শিয়ালের বাসায় পরিণত হয়েছে।
অবকাঠামো তৈরি, সেবা নেই
রাজধানীর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও পূর্বাচল নতুন শহরের লাগোয়া এই হাসপাতালটি ২.০৭৩ একর জমিতে নির্মিত। এখানে একটি মূল ভবন, তিনটি কোয়ার্টার, একটি জেনারেটর রুম, একটি গ্যারেজ ও পাম্প হাউস রয়েছে। ভবনের ভেতরে চেয়ার-টেবিল, এসি, এলইডি টেলিভিশনসহ প্রয়োজনীয় অফিস সরঞ্জাম থাকলেও চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ওষুধের অভাবে পুরো প্রতিষ্ঠানটি কার্যত পরিত্যক্ত। ভবনের চারপাশ ঝোপঝাড়ে ভরে গেছে, যা এখন সাপ-শিয়ালের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়দের কৃষি খামার
হাসপাতালের খোলা জায়গা দখল করে স্থানীয়রা ছোটখাটো কৃষি খামার গড়ে তুলেছেন। বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করে তারা নিজেদের পারিবারিক চাহিদা মেটাচ্ছেন।
নির্মাণ ও হস্তান্তরের সময়রেখা
স্বাস্থ্য বিভাগের সূত্র জানায়, ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি হাসপাতালটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। প্রায় দুই বছর কাজ শেষে ২০২০ সালের ২৭ ডিসেম্বর নির্মাণ শেষ হয়। পরবর্তীতে ২০২১ সালের ২০ জুন এটি আনুষ্ঠানিকভাবে গাজীপুর সিভিল সার্জন কার্যালয়ে হস্তান্তর করা হয়।
প্রশাসনিক অনুমোদন ও জনবল সংকট
২০২৩ সালের ২৬ অক্টোবর হাসপাতালটির সেবা কার্যক্রম চালুর প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয়। একই বছরের ডিসেম্বরে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রথমে ২৫টি পদ সৃষ্টির প্রস্তাব থাকলেও ২০২৪ সালের মার্চে অর্থ মন্ত্রণালয় ১৬টি পদ অনুমোদন দেয়। পরবর্তীতে অক্টোবর মাসে ওই ১৬টি পদ আনুষ্ঠানিকভাবে সৃষ্টি করা হয়।
কাগজে-কলমে পদ সৃষ্টি হলেও বাস্তবে পরিস্থিতি ভিন্ন। একজন আবাসিক মেডিকেল অফিসার, একজন ফার্মাসিস্ট ও দুইজন নার্স পদায়ন করা হলেও বর্তমানে তারা সবাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অধীনে কর্মরত। বাকি ১২টি পদ এখনো শূন্য।
অর্থনৈতিক কোডের জটিলতা
সবচেয়ে বড় জটিলতা তৈরি হয়েছে অর্থনৈতিক কোড না থাকায়। এই কোড না থাকায় হাসপাতালের জন্য কোনো বাজেট বরাদ্দ হয়নি। ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ওষুধ ক্রয় কিংবা প্রশাসনিক ব্যয় নির্বাহ-কোনোটিই সম্ভব হচ্ছে না। একাধিকবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দিয়েও এখনো কার্যকর সমাধান মেলেনি।
স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া
স্থানীয় বাসিন্দা হারুন-আর-রশিদ বলেন, "প্রতিবারই শুনি হাসপাতাল চালু হবে; কিন্তু বছর পার হয়ে যায়, কোনো পরিবর্তন দেখি না। চালু হলে আমাদের অনেক উপকার হতো।"
স্থানীয় চিকিৎসক ডা. মো. ওমর কায়ছার বলেন, "সরকার বিপুল অর্থ ব্যয় করে হাসপাতাল নির্মাণ করেছে, কিন্তু সেটি চালু না হওয়া অত্যন্ত হতাশাজনক। দ্রুত চালু করা জরুরি।"
একই গ্রামের শিউলি বেগম বলেন, "অসুস্থ হলে অনেক দূরে যেতে হয়। বিশেষ করে প্রসূতি রোগীদের নিয়ে ঢাকায় যেতে খুব কষ্ট হয়। এই হাসপাতাল চালু হলে আমাদের দুর্ভোগ কমত।"
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেজওয়ানা রশীদ জানান, "এখানে দুইজন চিকিৎসক পদায়ন রয়েছেন কিন্তু অর্থনৈতিক কোড না থাকায় কার্যক্রম শুরু করা যাচ্ছে না। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।"
গাজীপুর জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমান বলেন, "ওষুধ, জনবল ও বাজেট-সবকিছুতেই ঘাটতি আছে। তবে ধীরে ধীরে সমস্যার সমাধান হচ্ছে। আশা করছি দ্রুতই হাসপাতালটি চালু করা যাবে।"



