বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে উপাচার্য ও প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তিদের ছবি, বাণী ও শুভেচ্ছা। ব্যবহারকারীকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচয় জানার আগেই উপাচার্যের ‘অদ্ভুত’ পরিচয়রাজ্য দেখতে হয়। অথচ এই ওয়েবসাইটগুলোর মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত একাডেমিক অর্জন, গবেষণা, শিক্ষার্থী সেবা ও উদ্ভাবনের তথ্য প্রদান।
উপাচার্যের ছবি ও বাণীর প্রাধান্য
অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের হোমপেজে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উপাচার্যের ছবি দিয়ে ‘ক্ষমতার নৈকট্য’ বোঝানোর চেষ্টা করা হয়। কোনো কোনো সাইটে উপাচার্যের ছবি এত বড় যে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল উদ্দেশ্য—শিক্ষা, গবেষণা ও জ্ঞানচর্চা—খুঁজতে টর্চলাইট জ্বালাতে হয়। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে উপাচার্য নিজেকে ‘অ্যাই অ্যাম ড...’ বলে ইংরেজির অ্যাকটিভ ভয়েসে পরিচয় দিয়েছেন, অথচ সহ-উপাচার্যরা প্যাসিভ ভয়েসে লিখেছেন। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি নাম কোথাও ‘ইউনিভার্সিটি অব চিটাগং’, কোথাও ‘চিটাগং ইউনিভার্সিটি’—এতে সচেতন পাঠক বিভ্রান্ত হন।
ব্যক্তিকেন্দ্রিক সংস্কৃতির প্রভাব
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) ওয়েবসাইটেও একই চিত্র—প্রবেশমুখেই চেয়ারম্যানের আত্মপরিচয়। এই ব্যক্তিকেন্দ্রিক সংস্কৃতি দীর্ঘদিনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অভ্যাস, যা বিশ্ববিদ্যালয়েও প্রবেশ করেছে। উপাচার্য নিয়োগ লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতির ফসল হিসেবে আসছে; রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা বিশ্ববিদ্যালয়কে দলীয় শৃঙ্খলে বাঁধার চেষ্টা করেন। ফলে ওয়েবসাইট জ্ঞান ও গবেষণার প্ল্যাটফর্মের বদলে প্রশাসনিক নেতৃত্বের প্রদর্শনক্ষেত্রে পরিণত হয়।
শিক্ষার্থী ও গবেষকের প্রয়োজন উপেক্ষিত
একজন শিক্ষার্থী কী খুঁজবেন? একজন গবেষক কোন তথ্য প্রয়োজন মনে করবেন? একজন অভিভাবকের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কী? এসব প্রশ্নের উত্তর অনুযায়ী ওয়েবসাইট সাজানো উচিত, কিন্তু ব্যবহারকারীর প্রয়োজনের চেয়ে প্রশাসনিক কাঠামোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিদেশি অধ্যাপক বা তত্ত্বাবধায়ক যারা বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের পিএইচডি বা স্নাতকোত্তরে সুযোগ দেন, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে গিয়ে শিক্ষা ও গবেষণার মান জানতে চান। কিন্তু সেখানে উপাচার্যের ছবি ও বাণীই প্রধান।
উপাচার্য ব্র্যান্ড নন, বরং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অর্জন
উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিনির্ধারণ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন, কিন্তু তাকে পুরো হোমপেজের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা ঠিক নয়। বিশ্বের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রেসিডেন্ট বা ভাইস চ্যান্সেলরের পরিচিতি প্রশাসনিক পৃষ্ঠায় থাকে, প্রচ্ছদে থাকে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অর্জন। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি আন্তর্জাতিক মানের ডিজিটাল উপস্থিতি গড়ে তুলতে চায়, তাহলে ওয়েবসাইটের এই স্তুতিকাব্য বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। উপাচার্য কখনোই বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্র্যান্ড নন; বরং শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অর্জনই আন্তর্জাতিক মহলে পরিচয় বহন করে।
সম্মিলিত প্রচেষ্টার চিত্র অনুপস্থিত
উপাচার্যকেন্দ্রিক প্রচারণার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জন—নতুন ভবন উদ্বোধন, চুক্তি স্বাক্ষর, আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদলের সভা—সবই উপাচার্যের অর্জন হিসেবে গণ্য হয়। অথচ বাস্তবে সাফল্য গড়ে ওঠে শিক্ষক, গবেষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। ওয়েবসাইটের উপস্থাপনায় এই সম্মিলিত চিত্র প্রায়ই অনুপস্থিত। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক ও সমষ্টিগত চরিত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ড. নাদিম মাহমুদ, গবেষক, ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, তাঁর মতামতে বলেন, ‘আমরা যখন কোনো প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তির ঊর্ধ্বে স্থান দিতে শিখব, তখন দেশটার ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।’ এখন দেখার বিষয়, সরকার এই বিষয়গুলো কীভাবে দেখে।



