বাংলাদেশে পেট্রোলিয়াম ও মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার বর্তমান চিত্র
বাংলাদেশে জ্বালানি, তেল ও খনিজ সম্পদ প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। বর্তমানে দেশে মাত্র চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে পেট্রোলিয়াম ও মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানো হচ্ছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ারিং প্রোগ্রাম চালু রয়েছে। যাঁরা কেমিকৌশল বা যন্ত্রকৌশলে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন, তাঁরা বুয়েটের পেট্রোলিয়াম ও মিনারেল রিসোর্সেস প্রকৌশল বিভাগে স্নাতকোত্তর করতে পারেন।
শিক্ষার মাল্টিডিসিপ্লিনারি প্রকৃতি ও চ্যালেঞ্জ
ব্যবহারিক দিক থেকে পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ারিং ও মাইনিং বিষয়টি মাল্টিডিসিপ্লিনারি। তেল, গ্যাসসহ যাবতীয় খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান সম্পর্কিত শিক্ষা সাধারণত ভূতত্ত্ব ও ভূপদার্থ বিভাগে পড়ানো হয়, যা বুয়েটে নেই। অন্যদিকে, তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ উত্তোলনের কাজ ও ব্যবস্থাপনার সবকিছুই পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের আওতায় পড়ানো হয়। উল্লেখযোগ্য যে, প্রকৌশলে পেট্রোলিয়াম ও মাইনিং আদতে দুটি আলাদা বিষয়, যা বিশ্বের অন্যান্য দেশে আলাদাভাবেই পড়ানো হয়।
চাকরির বাজার ও জাতীয় সক্ষমতা
বাংলাদেশে প্রতিবছর শ খানেক স্নাতক এই বিষয়ে পড়া শেষ করে চাকরির বাজারে প্রবেশ করে। তবে বাংলাদেশে এই খাতে চাকরির বাজার খুবই সংকীর্ণ, কেননা চাকরির সব সুযোগই সরকার নিয়ন্ত্রিত। আমাদের দেশের জ্বালানি, তেল ও খনিজ সম্পদ খাত মধ্যপ্রাচ্যের মতো বড় নয় বলে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি নেই। ফলে শিক্ষার্থীরা দেশে অন্যান্য খাতে চাকরি করতে বাধ্য হয়, অথবা বিদেশে পড়তে যায়। অথচ এই খাতে আমাদের জাতীয় সক্ষমতার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
জ্বালানি একটি বৈশ্বিক সমস্যা, কিন্তু বিভিন্ন কারণে উন্নত দেশের শিক্ষার্থীদের এ বিষয়ে আগ্রহ কমে যাচ্ছে। ফলে এই শিল্পে বিশ্বব্যাপী দক্ষ জনবলের একটি শূন্যতা তৈরি হচ্ছে। আমাদের দেশে এই একাডেমিক প্রোগ্রামগুলো আরও শক্তিশালী ও যুগোপযোগী করা প্রয়োজন। সেটা করতে পারলে শুধু জাতীয় চাহিদা নয়, বিশ্ববাজারেও আমাদের স্নাতক শিক্ষার্থীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে। পেট্রোলিয়াম, মাইনিং ও এনার্জি নিয়ে মানসম্মত শিক্ষায় শিক্ষিত ছাত্রছাত্রীদের জন্য সামনে একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন।
পড়ার সুযোগ আছে কোথায়
- বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়: বুয়েটের পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মিনারেল রিসোর্সেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগটি দেশে এই খাতের পথিকৃৎ। এখানে মূলত উচ্চতর ডিগ্রি ও গবেষণার দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
- মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি: এখানে পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে বিএসসি করার সুযোগ আছে।
- চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়: প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেলসমৃদ্ধ চট্টগ্রামে অবস্থিত হওয়ার কারণে চুয়েটের পিএমই বিভাগটি বেশ সমৃদ্ধ।
- শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়: দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলোর অবস্থান সিলেটে হওয়ায় সাস্টের পেট্রোলিয়াম অ্যান্ড মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগটি গবেষণায় বেশ এগিয়ে।
- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটে দেশের জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট গবেষণা ও পড়াশোনা হচ্ছে।
- অন্যান্য প্রতিষ্ঠান: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিষয়ে পড়ার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে জ্বালানি ও পরিবেশ ইনস্টিটিউট আছে।
কোন বিষয়ে কী পড়ানো হয়
- পেট্রোলিয়াম ইঞ্জিনিয়ারিং: খনিজ তেলের আধার চিহ্নিতকরণ, ড্রিলিং প্রযুক্তি, প্রাকৃতিক তেল ও গ্যাস উৎপাদন এবং রিফাইনারি অপারেশন।
- মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং: কয়লা বা কঠিন শিলা উত্তোলনের জন্য খনি নকশা করা, খনি এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ নির্মাণ কৌশল।
- ভূতত্ত্ব: পৃথিবীর গঠন, পাথরের স্তরবিন্যাস এবং খনিজ সম্পদের অবস্থান নির্ণয়।
- নবায়নযোগ্য জ্বালানি: সৌরশক্তি, বায়ুকল এবং বায়ো-এনার্জির মতো আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি প্রযুক্তি।
- পরিবেশ ও নিরাপত্তা: খনি উত্তোলনের সময় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং পেশাগত স্বাস্থ্য নিরাপত্তা।



