প্রাথমিকের অর্ধেক শিক্ষার্থী পিছিয়ে, রেমিডিয়াল শিক্ষা জরুরি
প্রাথমিকের অর্ধেক শিক্ষার্থী পিছিয়ে, রেমিডিয়াল শিক্ষা জরুরি

প্রাথমিক পর্যায়ের প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির অনেক শিক্ষার্থী এখনও মৌলিক সাক্ষরতা এবং গণিতে পিছিয়ে রয়েছে। বিশেষ করে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের শিশুদের মধ্যে এই সমস্যা বেশি। জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ন (এনএসএ) অনুযায়ী, ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী ক্লাসরুমে পিছিয়ে পড়ছে।

মতবিনিময় সভায় তথ্য

বৃহস্পতিবার (১৪ মে) গণসাক্ষরতা অভিযানের আয়োজনে এবং সেভ দ্য চিলড্রেনের সহযোগিতায় পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য ‘রেমিডিয়াল শিক্ষা: কর্ম-অভিজ্ঞতা ও আগামীর ভাবনা’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় এসব তথ্য উঠে আসে। সভায় সভাপতিত্ব করেন গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে. চৌধুরী।

সভার শুরুতে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন গণসাক্ষরতা অভিযানের উপ পরিচালক তপন কুমার দাশ। এরপর রেমিডিয়াল শিক্ষার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ: পরিস্থিতি বিশ্লেষণ, বর্তমান চ্যালেঞ্জ, সুযোগ ও অভিজ্ঞতার পর্যালোচনা বিষয়ক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সেভ দ্য চিলড্রেন’র এডুকেশন লিড শাহীন ইসলাম, সিনিয়র ম্যানেজার এডুকেশন তাহসিনা তাইমুর এবং অধ্যাপক মুরশিদ আখতার।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গবেষণার ফলাফল

তারা বলেন, ‘এম্পাওয়ারিং চিলড্রেন থ্রু এডুকেশন (ইসিই) প্রকল্পের কার্যকারিতা মূল্যায়ন গবেষণায় দেখা গেছে, প্রাথমিক পর্যায়ের অনেক শিক্ষার্থী এখনও মৌলিক সাক্ষরতা ও গণিত দক্ষতায় পিছিয়ে রয়েছে। বিশেষ করে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের শিশুদের মধ্যে এই সমস্যা বেশি। গবেষণায় কুড়িগ্রামের রাজারহাট ও জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলায় পরিচালিত প্রতিকারমূলক শিক্ষা কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের শেখার অগ্রগতি, শিক্ষক দক্ষতা, অভিভাবক সম্পৃক্ততা এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক সহায়ক পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। শিক্ষক প্রশিক্ষণ, দৈনিক রেমেডিয়াল ক্লাস, টিচার লার্নিং সার্কেল, অভিভাবক সভা এবং নিয়মিত মনিটরিংয়ের ফলে শিক্ষার্থীদের পড়া ও গণিত দক্ষতা উন্নত হয়েছে। এছাড়া শিক্ষকদের উৎসাহ ও অংশগ্রহণ বেড়েছে।’

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

গবেষণার সুপারিশ

গবেষণার সুপারিশের কথা উল্লেখ করা তারা বলেন, ‘শেখার ঘাটতিকে জাতীয় পর্যায়ের শিক্ষা চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনা করে বিদ্যালয়ে নির্ধারিত রেমিডিয়াল সময় চালু, সরকারিভাবে শিক্ষক প্রশিক্ষণে রেমিডিয়াল পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত, টিচার লার্নিং সার্কেলকে জাতীয় সিপিডি ব্যবস্থার অংশ করা, সহায়ক তদারকি ব্যবস্থা জোরদার এবং নিয়মিত শেখার অগ্রগতি মূল্যায়নের মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।’

প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য

সভার প্রধান অতিথি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, “শিক্ষা খাতকে জাতীয় বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করছে সরকার। আমরা জানি এবং মানি আমাদের শিখনে ঘাটতি রয়েছে। এনএসএ অনুযায়ী, প্রাথমিকের অর্ধেক শিক্ষার্থীই মৌলিক দক্ষতায় পিছিয়ে।”

তিনি বলেন, “আমাদের টার্গেট হলো, প্রাইমারি লেভেলে যারা ঝরে পড়ছে বা যেতে পারছে না বা ক্লাসরুমে পিছিয়ে পড়ছে তাদেরকে যেন আমরা ক্লাসরুমে এগিয়ে দেয়। যেমন, আজকে এই রিসার্চ রিপোর্টেই আসলো ৫০ শতাংশ। এনএসএ বলছে, ৫০ শতাংশ পিছিয়ে পড়ছে ক্লাসরুমে। তার মানে ৫০ শতাংশের মতো পিছিয়ে পড়ছে না।”

নিজের পার্সোনাল ফাইন্ডিংয়ের কথা তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “আসলে এর থেকে বেশি হয়তো পিছিয়ে পড়ছে। আমাদের অবস্থা আসলে ভালো না। আপনি কোনও একটা স্কুলে যাবেন, সেখানে ৩০ জন শিক্ষার্থী আছে। রোল নাম্বার এক দুই তিন হয়তো মোটামুটি পারে। রোল নাম্বার ১৬, ১৭, ১৮, ১৯, ২০, ২১, ২২, ২৩, ২৪, ২৫ এভাবে যত যাবেন ততই অনেক কিছুই পারছে না। বেসিক অক্ষরগুলো চিনতেও পারে না।”

প্রতিমন্ত্রী নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, “আমি ইতোমধ্যে ছয়টা জেলায় এটলিস্ট ২৫টি স্কুলে গিয়েছি। আপনি ধরে নেন, মন্ত্রীকে যখন ডিপিও কোনও স্কুলে নিয়ে যায়, ওই জেলার বেস্ট স্কুল সেটা। জেলার বেস্ট স্কুলে যাওয়ার পর যদি দিজ আর মাই ফাইন্ডিং মানে আমার ফাইন্ডিং হলো ৩০ শতাংশের ওপরে আমরা প্রোপার লার্নিং এচিভ করতে পারি। ৩০ শতাংশ ম্যাক্সিমাম এবং এটা আমি রেন্ডম নাম্বার বলছি, এটা থেকে খারাপ হতে পারে। অ্যান্ড দিস ইজ দ্য বেস্ট স্কুল পার জেলা। তো সেই জায়গা থেকে আমাদের আসলে অনেক দূরে যেতে হবে। মানে রেমিটেড মোস্টলি আমরা মিন করি যারা স্কুলের বাইরে ঝরে পড়েছে। বাট আমরা আজকে যেটা আলোচনা করছি, যেটা আসলেই খুব শক্তভাবে আমরা লক্ষ্য করেছি।”

ববি হাজ্জাজ বলেন, “স্কুলের ভেতরেও ক্লাস থ্রিতে আছে কিন্তু সে ক্লাস থ্রির উপযোগী না। ক্লাস ফোরে বা ফাইভে আছে কিন্তু সে সেসব ক্লাসের উপযোগী না। কেউ তাকে সহযোগিতা করছে না।”

পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের এগিয়ে নিতে সরকার বিশেষ কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “প্রাথমিকের শিক্ষার্থী কমে যাচ্ছে এটা সত্য। তাদেরকে ফিরিয়ে আনার জন্য আমরা প্রাথমিককে এমনভাবে তৈরি করবো, যাতে তারা আবার ফিরে আসে। যেকোনো ধরনের প্রাথমিকের স্কুলকে আমরা একই সরলরেখায় আনতে চাই। শিক্ষকদের আমরা প্রশিক্ষণ দিয়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠাবো এখন থেকে।”

বিশেষজ্ঞদের মতামত

সভায় অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমেদ। তিনি টিচিং লার্নিংকে স্কুলের ব্যবস্থাপনাকে মূল সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘মূল সমস্যা আমাদের টিচিং লার্নিংয়ে ও স্কুলের ব্যবস্থাপনায়। আমাদের কার্যক্রমের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে সকলকে নিয়ে এগোতে হবে। বর্তমান যে সাংগঠনিক ব্যবস্থায় আমাদের শিক্ষাক্রম চলে, স্কুলের ব্যবস্থাপনায় প্রধান শিক্ষকরা যেভাবে কাজ করেন, কারিকুলামের সময়টা যেভাবে নির্ধারণ করা হয়, টিচারদের যেভাবে ট্রেনিং করা হয়, মূল্যায়ন করা হয়, এই মূল ধারাটায় নিরাময় মূলক শিক্ষার জন্য যে কাজগুলোকে আমরা পুরোপুরি আনতে পারছি না এখনও।’

সুপারিশ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, সরকার বা নীতি নির্ধারকরা পুরোপুরি বিবেচনায় নিতে চান না। সেখানে একটা রেজিস্টেন্স আছে, সেটা হল আমাদের শিক্ষা এনজিও যারা আছে, শিক্ষা একাডেমিক যারা আছেন, কাজকর্ম করেন, প্রতি উপজেলায় প্রতি এলাকার জন্য একটা টেকনিক্যাল সাপোর্ট টিম দাঁড় করাতে হবে।’

বিদ্যালয়ের সমস্যা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘প্রতিটি স্কুলে তাদের হেড টিচার এটা আরেক সমস্যা। ৩২ হাজার স্কুলে স্থায়ী হেড টিচার নাই।’