আমার আয়ু তোমার হোক: সময়ের টানেলে বাবার দেখা
আমার আয়ু তোমার হোক: সময়ের টানেলে বাবার দেখা

‘তোমাকে আমি আমার আয়ু দিতে পারি।’ কথাটা বিস্ময়ের। কিন্তু তারও চেয়ে বেশি, আমার জন্য, আশার। সামান্য এক মাড়ি ফোলা, ব্যথা এবং কিছুদিনের ভোগান্তি, নিয়ে গেছে মৃত্যুর দিকে। মৃত্যু যে এতটা বাস্তব এবং জান্তব এমনকি সহজও, এ রকম পরিস্থিতিতে না পড়লে জানতাম না। ডাক্তারদের সহজ উত্তর—ক্যানসার। স্টেজও বলে দিয়েছে। লাস্ট। ছড়িয়ে গেছে সারা শরীরে। সতেরো দিনের মাথায় বউ চলে গেছে এরপর, আমারই প্রিয় বন্ধুর হাত ধরে। ধারণা করছি, ওদের সম্পর্কটা পুরোনো। শুধু সিদ্ধান্তটা সময়োপযোগী। বাচ্চা নিতে চাচ্ছিলাম তিন বছর ধরে। এখনো কেন হয়নি, বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঠিকই বুঝতে পারি এখন। কিন্তু এসব বুঝে কোনো বিষণ্ণতা কাজ করার সুযোগ নেই। মৃত্যু এতই বৃহৎ ব্যাপার যে এগুলোকে মনে হয় খুব ঠুনকো, এমনকি হাস্যকরও।

হাসি তো আসেই আমার আজকাল। মুখে লেগে থাকে সারাক্ষণ। সময় যেন আলাদা করে চোখে দেখতে পারি। দেখতে পারি একটি পরতের সঙ্গে আরেকটি পরত, নাকি টানেলই বলা ভালো, পরস্পরকে পাশাপাশি রেখে ছড়িয়ে আছে মহাকাশের মতো। কখনো কখনো সে টানেলগুলো পরস্পরকে জড়িয়ে রাখছে, আবার কখনো কখনো একে অপরকে ফুঁড়ে ভেদ করে এগিয়ে যাচ্ছে। এ রকম এক পয়েন্টে আমার সঙ্গে দেখা জুয়ির।

জুয়িকে কি কিশোরী বলা যায়? হয়তো যায়। আমি তার বয়স জিজ্ঞেস করিনি। ইচ্ছাও হয়নি আসলে। মেঘকালো ঝাঁকড়া চুল। ডিমের মতো মুখ। বিষণ্ণ দুটো চোখ। ওপরের ঠোঁটটা অদ্ভুতভাবে ধনুকের মতো বাঁকানো। তাতে চেহারায় আলতো এক মায়া খেলে যায়। মুখের মায়া আর চোখের বিষণ্ণতা মিলিয়ে জুয়িকে আমার কিশোরী লাগে। কিন্তু সে তরুণীও হতে পারে।

Pickt প্রশস্ত ব্যানার — টেলিগ্রামের জন্য সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

অফিস থেকে ফিরেছিলাম সেদিন আগে আগে। ওরা আমার অবস্থার কথা জানে। তাই কনসিডার করে আমাকে। কাজ এখন আর দেয় না। এমনকি কেউ কেউ ছুটিও নিতে বলে। কিন্তু ছুটি নিয়ে আমি করবটা কী! মৃত্যুর অপেক্ষার জন্য ছুটির প্রয়োজন নেই।

Pickt নিবন্ধের পরে ব্যানার — পারিবারিক চিত্রসহ সহযোগী শপিং লিস্ট অ্যাপ

বাসায় ঢুকেই দেখলাম কিছু রান্না হয়নি। বুয়া বিকেল চারটায় এসে রান্না করে দিয়ে যায়। তার কাছে ফ্ল্যাটের চাবি আছে। এ বাসায় তার অবাধ যাতায়াত। এমনকি বাজারহাটও এখন সে–ই করে। আজ করেনি। ফোন দিলাম। ধরল না। আরেকবার ফোন দেব কি না ভাবছি... তখনই একটা মেসেজ এল। বাংলায় স্পষ্ট লেখা—মামা, আমি আর আসব না।

তা না–ই আসতে পারে। বউ গেছে, বুয়া যেতে কতক্ষণ! কিন্তু খেতে তো হবে আমাকে। ঘরে খাবার নেই বলেই বোধ হয় সন্ধ্যার দিকে খিদেটা চাগিয়ে উঠল। বেরোলাম।

পুরো রাস্তা ব্ল্যাকআউট। রোডল্যাম্পগুলো জ্বলছে না। এদিকটা একটু গলিঘুপচি। আমি মনে হয় রাস্তা হারালাম। যে পথে রেস্টুরেন্ট থাকার কথা, তার অন্য কোনো দিকে রওনা দিলাম। বা কোনো একটা ভুল করলাম। অন্ধকারের মধ্যে ঠিক বোঝা যায় না, তখনই ধাক্কা খেলাম একজনের সঙ্গে—জুয়ি!

‘তুমি কি চোখে দেখো না?’
‘অন্ধকারে কী দেখব?’
‘অন্ধকার মানে? আমি তোমাকে স্পষ্ট দেখছি।’
‘তাহলে তুমি বনবিড়াল। শুনেছি, তারা অন্ধকারে ভালো দেখে।’

জুয়ি শক্ত চোখে তাকিয়ে থাকল আমার দিকে। তারপর বলল, ‘তুমি কি সিরিয়াস?’
‘কোন ব্যাপারে?’
‘যে আমি বনবিড়াল?’
‘অত্যন্ত সিরিয়াস।’

জুয়ি এবার হেসে ফেলল। হাসলে মেয়েটার টোল পড়ে। বলল, ‘তুমি কি বুঝতে পারছ, আমরা আসলে টানেলের বিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছি?’
‘না, আমরা একটা গলিতে দাঁড়িয়ে আছি। এবং আমার মনে হয়, তোমার এখন বাসায় ফিরে যাওয়া উচিত।’
‘যদি আর এক ধাপ এগিয়ে আসি আমি, তাহলে হয়তো আর ফিরতে পারব না। আমরা আসলে দুই টানেলের নো ম্যান্স ল্যান্ডে দাঁড়ানো। তুমিও যদি এক পা আমার দিকে এগিয়ে আসো, তুমিও হয়তো তোমার সময়ে ফিরতে পারবে না!’
‘এর মানে হচ্ছে, সায়েন্স ফিকশন অনেক পড়ো তুমি।’
‘ওগুলো তো ছোটদের জন্য কাঁচা কাঁচা লেখা। আমাদের সময়ে অনেক আগে নাকি ছিল। এখন একদমই নেই।’
‘বাসায় যাও। ইলেকট্রিসিটি নেই। মা–বাবা চিন্তা করবে।’
‘কিন্তু আমি ভাবছি এক ধাপ যদি এগিয়ে যাই, কী হবে ব্যাপারটা!’
‘কিছুই হবে না। এসো।’

জুয়িকে টানতে গেলাম হাত ধরে, তখনই খেয়াল করলাম, আমি যেন সত্যিই একটা স্বচ্ছ টানেলের ভেতর এবং আমার টানেলটাকে ফুঁড়ে দিয়ে গেছে আরও কয়েকটি টানেল, আর ভালো করে তাকালে, একটু গাঢ়ভাবে খেয়াল করলে চারপাশজুড়ে অসংখ্য টানেল একে অপরকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত।

খুব ঘাবড়ে গেলে নাকি? জ্ঞান হারানোর আগে জুয়ির কণ্ঠের এতটুকুই শুনেছিলাম আমি।

এরপর ব্যাপারটা নেশার মতো হলো। হলো অনতিক্রম্য আবর্তের মতো। অফিস থেকে আগে আগে ফিরি আমি। বাসায় ফিরে আবিষ্কার করি, বুয়া আসেনি। তাকে ফোন দিই। সে মেসেজ দেয়—মামা, আমি আর আসব না। আমি সন্ধ্যায় রাস্তায় নেমে আসি। খিদে নিয়ে রেস্টুরেন্ট খুঁজি এবং পথ হারাই। অবশেষে আমি গিয়ে দাঁড়াই টানেলের বিন্দুতে। সেখানে জুয়িকে দেখি টোল ফেলে হাসতে।

‘আমার মা এসব জানিয়েছে আমাকে।’
‘কোন সব?’
‘এই যে আলাদা আলাদা সময়ের টানেল। এটা টপকে যেতে পারলে...’
‘টাইম ট্রাভেল?’

জুয়ি আবার হাসে—‘তোমাদের সময়ে তোমরা নাকি খুব আজবভাবে বলো এই টাইম ট্রাভেলকে। একটা সিনেমা দেখেছিলাম তোমাদের...কয়েকজন মিলে গোল একটা যানে উঠে যায়। তারা যানটা চালু করে। তারপর তারা মিলিয়ে যায় প্রচণ্ড গতিতে...’
‘আলোর গতিতে?’
‘হতে পারে। তুমিই ভালো বলতে পারো। যেহেতু তোমাদের সময়ের কনসেপ্ট। কিন্তু এভাবে টাইম ট্রাভেল হয় না। হতে পারেও না।’
‘তাহলে কীভাবে হয়?’
‘যেভাবে তোমার আমার দেখা হচ্ছে, এভাবে। টানেলের পয়েন্ট দিয়ে। ব্যাপারটা এ রকমই।’

‘ব্যাপারটা আসলে কী রকম, আমি বলি জুয়ি...’
‘বলো।’
‘ব্যাপারটা হলো আমার কল্পনা। আমি অসুস্থ। মারা যাচ্ছি আমি। আমাকে ছেড়ে গেছে আমার বউ, এমনকি বুয়াও। মৃত্যুর আগে আগে আমার এই নিঃসঙ্গতা আমার শরীর–মন কিছুতেই মেনে নিচ্ছে না। সে রিলিফ চাচ্ছে। বাঁচাটা আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে চাচ্ছে। এ কারণে সে আমাকে একটি গলির ভেতর সময়ের টানেলের মুখোমুখি করে ফেলেছে। তোমাকে বানিয়ে ফেলেছে। আমি আসলে আমার সঙ্গেই কথা বলছি। তুমি আমার নিছক কল্পনা। কী মনে হয় তোমার?’
‘তোমার এ রকম ব্যাখ্যাও খুব পুরোনো। তোমরা আসলে অনেক পুরোনো মানুষ। নতুন কিছু ভাবতে পারছ না।’
‘ঠিক আছে। আসি।’

ইচ্ছা করেই ফিরে দাঁড়ালাম। ব্যাপারটা কী হয় বুঝতে চাইলাম। আর তখনই জুয়ি বলল, ‘তোমাকে আমি আমার আয়ু দিতে পারি।’ হাসলাম আমি। বুঝতে বাকি থাকল না, জুয়ি সত্যিই আমার কল্পনা। বাঁচতে চাই আমি। ভীষণ রকমভাবে চাই। চাই বলেই নানা প্রবোধ, নানা আশার ভেতর দিয়ে নিজেকে প্রবাহিত করছে আমার কল্পনাতাড়িত মন।

কিন্তু পরের সন্ধ্যায়ও আসি আমি। একইভাবে। আগে আগে অফিস থেকে ফিরি। বাসায় এসে দেখি বুয়া আসেনি। বুয়াকে ফোন দিই। বুয়া মেসেজ করে—মামা, আমি আর আসব না। আমি রেস্টুরেন্ট খুঁজতে গিয়ে ভুল পথে সময়ের টানেল খুঁজে পাই। খুঁজে পাই জুয়িকে।

‘মাকে তোমার কথা বলেছি।’
‘কী বলল মা?’
‘উনি তো সায়েন্টিস্ট। তোমার মতো পুরো ব্যাপারটা উড়িয়ে দিল না। বলল, যুগে যুগেই নাকি মানুষ সময়ের টানেলের মুখোমুখি হয়েছে। সময়ের এক টানেলের সঙ্গে অন্য টানেলের ধাক্কা লেগেছে। মানুষ যখন এসবের মুখোমুখি হয়, তখন খুব কম জনই পুরো ব্যাপারটা বুঝে উঠতে পারে। কেউ কেউ নাকি তোমার মতো পুরো ব্যাপারটাকে কল্পনা বলে স্বস্তি পেতে চায়। আর অনেকেই পুরো ব্যাপারটাকে ভৌতিক বলে ভূতের কেচ্ছা বানায়।’
‘মানে, তুমি বলছ অতিপ্রাকৃত যা ঘটেছে পৃথিবীতে, তার সবই আসলে সময়ের এক টানেলের সঙ্গে অন্য টানেলের ধাক্কা...?’
‘অথবা বিন্দুর সঙ্গে বিন্দুর যোগাযোগ। তোমার সঙ্গে আমার যেমন!’

জুয়ি চুপ করে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে বলল, ‘বাবা। আমার সময়ে তুমিই আমার বাবা। কিন্তু ওখানে তুমি মারা গেছ। অনেক আগে।’ হাসতেই হলো আমাকে। পুরো ব্যাপারটাই যেখানে হাস্যকর। জুয়ি বলল, ‘হেসো না। হাসলে তোমাকে আরও নিঃসঙ্গ দেখায়।’
‘লুকানোর কিছু নেই। আমি নিঃসঙ্গই।’
‘এর আগে বলেছিলাম, তোমাকে আমি আমার আয়ু দিতে পারি।’
‘গতকাল?’
‘গতকাল বা আগামীকাল বলে আসলে কিছু নেই। সবই একটা টানেলের মধ্যে প্রবাহিত হচ্ছে। সব একসঙ্গে আছে। একইভাবে।’
‘আচ্ছা। ঠিক আছে। আমি আসি এখন।’
‘যেয়ো না। বাসায় যাওয়ার আগেই তুমি তোমার সব সময় ফুরিয়ে ফেলবে।’
‘এটাই তো হবে...আজ অথবা আগামীকাল...অথবা যেকোনো দিন।’
‘কিন্তু তুমি যদি আমার হাতটা ধরো...তুমি যদি আরেকটা ধাপ বাড়িয়ে দাও...যদি তুমি আমার টানেলে চলে আসতে পারো, তাহলে তুমি আমার আয়ু পাবে বাবা। ব্যাপারটা বোঝানো জটিল। এটা ট্রাভেলের একটা প্রতিক্রিয়াও হয়তো। আয়ু তো আর কিছু না...একটা সময়। টানেলের পরিবর্তনের সঙ্গে এটাও পরিবর্তিত হয়। যেকোনোভাবেই হোক। মা তার টিমের সঙ্গে এটি নিয়েই গবেষণা করছে। তারা রেজাল্টের খুব কাছাকাছি সময়ে আছে।’
‘কী বললে?’
‘তারা রেজাল্টের খুব কাছাকাছি সময়ে আছে।’
‘এটা না। এর আগে...’
‘আয়ু তো আর কিছু না...একটা সময়।’
‘এরও আগে...’

জুয়ি চুপ করে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে বলল, ‘বাবা। আমার সময়ে তুমিই আমার বাবা। কিন্তু ওখানে তুমি মারা গেছ। অনেক আগে। আমার তখন খুব অল্প বয়স।’

আমি জুয়ির দিকে থাকলাম। জুয়ি কি সত্যি কেউ? জুয়ি কি সত্যিই সময়ের টানেলের ওপারে দাঁড়ানো? আমরা কি সত্যিই মুখোমুখি হয়েছি টানেলের এক বিন্দুতে? জুয়ির সময়ে কি সত্যিই আমি তার বাবা?

জুয়ি হাত বাড়িয়ে রেখেছে। বলছে, ‘বাবা, আমার হাতটা ধরো। এগিয়ে আসো। একটা ধাপ দাও। আমার হাতটা ধরে তুমি একটা ধাপ দাও, বাবা। প্লিজ...আমার আয়ু তোমার হোক। আমার আয়ু তোমার হোক, বাবা...’

আগে আগে অফিস থেকে চলে আসি আমি। বাসায় ঢুকে দেখি বুয়া আসেনি। বুয়াকে ফোন দিই। বুয়া মেসেজ দেয়—মামা, আমি আর আসব না। আমার খিদা লাগে খুব। খিদায় পেটটা মোচড় দিতে থাকে। ঘরে কোনো খাবার নেই। আমার বাইরে যাওয়া উচিত। আজকে রাস্তায় ব্ল্যাকআউট। সবদিক অন্ধকার। আমি বাইরে যাওয়ার রাস্তায় বসে থাকি। কোথাও যাই না। যেতে খুব ইচ্ছা করে। মনে হয়, একটা টানেলে আমার মেয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছে...সেখানে যাওয়া উচিত। মনে হয়, মেয়েটার সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ কথা বললে আমার খুব ভালো লাগবে। কিন্তু আমি যাই না। আমার ভয় করে। ভয় করে আমি হয়তো যেকোনো সময় আমার মেয়ের বাড়ানো হাতটা ধরে ফেলব। লোভে নয়, বাঁচার অনন্ত ইচ্ছাতে নয়, আমি হয়তো শুধুই ভালোবাসায়, শুধুই মায়ায় তার হাতটা ধরে ফেলব!

আমি তো আমার এত বড় সর্বনাশ করতে পারি না, তাই না?