আমরা এখন জানি, আলোর গতি হলো সেকেন্ডে ২৯৯,৭৯২,৪৫৮ মিটার। আজ এই সংখ্যাকে আমরা স্থির ও নিশ্চিত বলে ধরে নিই। কিন্তু এই নিশ্চয়তায় পৌঁছাতে বিজ্ঞানকে পাড়ি দিতে হয়েছে কয়েক শতাব্দীর দীর্ঘ ও জটিল পথ। বর্তমানে লেজার রশ্মির ব্যতিচার বা আলোকতরঙ্গের কম্পাঙ্কের মতো অত্যন্ত উন্নত প্রকৌশল ব্যবহার করে আলোর গতি নির্ণয় করা হয়। কিন্তু এই লেখার উদ্দেশ্য আধুনিক পরিমাপ নয়; বরং প্রথম কবে এবং কীভাবে মানুষ আলোর গতি মাপার চেষ্টা শুরু করেছিল, সেই ইতিহাসের দিকে ফিরে দেখা। এই প্রসঙ্গে আমরা তিনজন গবেষকের কথা বলব—গ্যালিলিও গ্যালিলেই, ওলে রোমার ও জেমস ব্র্যাডলি।
গ্যালিলিওর লন্ঠন পরীক্ষা
গ্যালিলিও গ্যালিলেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য বুঝেছিলেন—লিখেছিলেন: ‘আলো তাৎক্ষণিক কি না, তা জানি না; কিন্তু তাৎক্ষণিক না হলেও এটি অসাধারণ দ্রুত—আমি একে ক্ষণিক বলব।’ গ্যালিলিওর আগে আলো তাৎক্ষণিক কি না—এই প্রশ্ন নিয়ে দার্শনিক আলোচনা হয়েছিল, কিন্তু আলোর গতি পরিমাপ করার কোনো বাস্তব পরীক্ষার কথা আমরা যতটুকু জানি—গ্যালিলিওই প্রথম ভেবেছিলেন। গ্যালিলিও এ রকম একটি এক্সপেরিমেন্টের কথা বলেছিলেন—ধরা যাক, ইতালির তুস্কানির দুটি পাহাড়ের চূড়ায় রাতের অন্ধকারে দুজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। তাদের হাতে ঢাকা দেওয়া লন্ঠন। একজন আবরণ সরায়, আলো ছুটে যায়। দূরের ব্যক্তি সেই আলো দেখামাত্র তার লন্ঠনের আবরণ খোলে। প্রথম ব্যক্তি সেই আলো কখন দেখেছিল? সঙ্গে সঙ্গে, নাকি একমুহূর্ত পরে? গ্যালিলিও এই পরীক্ষা হয়তো হাতে–কলমে করেননি, হয়তো শুধু কল্পনা করেছিলেন। আর করলেও কিছু দেখা যেত না। কারণ, আলো এত দ্রুতগতির যে মানুষের চোখ সেই বিলম্ব ধরতে পারে না। তবু তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য বুঝেছিলেন—লিখেছিলেন: ‘আলো তাৎক্ষণিক কি না, তা জানি না; কিন্তু তাৎক্ষণিক না হলেও এটি অসাধারণ দ্রুত—আমি একে ক্ষণিক বলব।’ এ কথাগুলো আমরা পাই তাঁর বই দুই নতুন বিজ্ঞানের ওপর আলোচনা ও গণিত প্রদর্শন-এ। বইটি প্রকাশিত হয়েছিল হল্যান্ড থেকে, ১৬৩৮ সালে। কারণ, রোমান ইনকুইজিশনের ভয়ে সেটি ইতালিতে প্রকাশ করা সম্ভব ছিল না। আজ আমরা জানি গ্যালিলিও ঠিকই বলেছিলেন: আলো তাৎক্ষণিক নয়। কিন্তু এত দ্রুত যে তুস্কানির পাহাড়ে দাঁড়িয়ে তার গতি মাপা অসম্ভব ছিল।
রোমার: দ্রাঘিমা থেকে আলোর গতি
গ্যালিলিওর সেই বিখ্যাত গ্রন্থ প্রকাশের ঠিক ৩৮ বছর পরেই, প্রথমবারের মতো আলোর গতি পরিমাপ করার একটি বাস্তব উপায়ের সন্ধান পান দিনেমার জ্যোতির্বিদ ওলে রোমার (১৬৪৪–১৭১০)। ১৬৭৬ সালে বৃহস্পতির উপগ্রহ আইওর গ্রহণ পর্যবেক্ষণ করতে গিয়েই তিনি এই বিস্ময়কর ধারণায় পৌঁছান। তবে রোমারের এই আবিষ্কার হঠাৎ করে জন্ম নেয়নি। এর পেছনে ছিল প্যারিসের রাজকীয় মানমন্দিরের পরিচালক, ইতালীয় জ্যোতির্বিদ জিওভান্নি ডোমেনিকো ক্যাসিনির একটি কাজ। সেই সময় ইউরোপের দেশগুলো সমুদ্রপথে প্রায় পৃথিবীজুড়ে বাণিজ্যে নেমেছে। কিন্তু সমুদ্রে থাকা নাবিকদের জন্য একটি মৌলিক প্রশ্ন ছিল প্রায় অমীমাংসিত—তারা পৃথিবীর ঠিক কোন দ্রাঘিমায় অবস্থান করছে। অক্ষাংশ নির্ণয় তুলনামূলকভাবে সহজ ছিল; উত্তর গোলার্ধে ধ্রুবতারার উচ্চতা দেখেই সেটা জানা যেত। কিন্তু দ্রাঘিমা নির্ণয়ের কোনো নির্ভরযোগ্য উপায় তখনো ছিল না। এটাই ছিল নৌপরিবহনের সবচেয়ে বড় সমস্যা।
এই সমস্যার সমাধানে ক্যাসিনি প্রস্তাব করলেন এক অভিনব কৌশল। বৃহস্পতির গ্যালিলীয় উপগ্রহগুলোর গ্রহণ—বিশেষ করে আইওর গ্রহণ—পৃথিবীর রাত্রিকালীন অংশ থেকে মোটামুটি একই সময়ে দেখা যায়। সেই গ্রহণের স্থানীয় সময় যদি বিভিন্ন জায়গা থেকে রেকর্ড করা যায়, তাহলে সেই সময়ের পার্থক্য থেকেই সংশ্লিষ্ট স্থানগুলোর দ্রাঘিমা নির্ণয় করা সম্ভব। এই উদ্দেশ্যে ক্যাসিনি তাঁর সহকর্মী ফরাসি জ্যোতির্বিদ জঁ পিকার্ডকে পাঠালেন ডেনমার্কের উপকূলবর্তী হভেন দ্বীপে। সেখানেই একসময় নিজের বিখ্যাত উরানিবর্গ মানমন্দির গড়ে তুলেছিলেন টাইকো ব্রাহে। ক্যাসিনির পরিকল্পনাটি ছিল সরল, কিন্তু নিখুঁত। পিকার্ড হভেন দ্বীপ থেকে আইওর গ্রহণের স্থানীয় সময় নথিভুক্ত করবেন। আর একই সময়ে প্যারিস থেকে সেই গ্রহণের সময় লিখবেন ক্যাসিনি। যদি উরানিবর্গে কোনো গ্রহণ মধ্যরাতে ঠিক ১২টায় শুরু হয়, আর প্যারিসে একই গ্রহণ শুরু হয় ১২টা ৪২ মিনিট ১০ সেকেন্ডে—তাহলে এই ৪২ মিনিট ১০ সেকেন্ডের পার্থক্য থেকেই দুই স্থানের তুলনামূলক দ্রাঘিমা নির্ণয় করা যায়।
এই পর্যবেক্ষণে পিকার্ডের সহকারী ছিলেন এক তরুণ দিনেমার ছাত্র—ওলে রোমার। রোমারের দক্ষতায় পিকার্ড এতই মুগ্ধ হন যে তাঁকে প্যারিসের রাজকীয় মানমন্দিরে নিয়ে আসেন। সেখানেই রোমার বৃহস্পতির উপগ্রহ আইও নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ শুরু করেন। আইও প্রতি ১.৭৬৯ দিনে একবার বৃহস্পতির ছায়ায় ঢোকে—অর্থাৎ গ্রহণ ঘটে। রোমার একের পর এক গ্রহণের সময় নিখুঁতভাবে নথিভুক্ত করতে থাকেন এবং ধীরে ধীরে একটি অদ্ভুত বিষয় লক্ষ করেন। মাসের পর মাস, রাতের পর রাত পর্যবেক্ষণ চালিয়ে রোমার একটি বিস্ময়কর ব্যাপার লক্ষ করেন: বছরজুড়ে গ্রহণের সময় একই থাকে না—কখনো একটু আগে, কখনো একটু পরে ঘটে। কিন্তু কেন? রোমার বুঝতে পারেন যে আইওর কক্ষপথের প্রকৃত সময়কাল পরিবর্তন হচ্ছে না; বরং পৃথিবী ও বৃহস্পতির পারস্পরিক অবস্থানের কারণে এই সময়ের তারতম্য দেখা দিচ্ছে। প্রথমে, যখন পৃথিবী ও বৃহস্পতি সূর্যের একই দিকে থাকে—অর্থাৎ একে অপরের সবচেয়ে কাছে—তখন রোমার আইওর গ্রহণের সময় নিখুঁতভাবে রেকর্ড করেন। যেহেতু আইও প্রতি ১.৭৬৯ দিনে একবার বৃহস্পতির ছায়ায় ঢোকে, তাই এই সময়কাল ব্যবহার করে পরের গ্রহণ কখন হবে, তা হিসাব করা যায়। কিন্তু এর পরে, প্রতিটি গ্রহণ প্রত্যাশিত সময়ের চেয়ে একটু একটু করে দেরিতে ঘটতে থাকে। পৃথিবী যত বৃহস্পতি থেকে দূরে সরে যায়, গ্রহণের সময় তত দেরিতে হতে থাকে। ছয় মাস পরে, যখন বৃহস্পতি সূর্যের প্রায় বিপরীত দিকে চলে যায়—অর্থাৎ পৃথিবী ও বৃহস্পতি সবচেয়ে দূরে—তখন একই গ্রহণ সর্বোচ্চ ২২ মিনিট দেরিতে ঘটে। এই বিলম্বের ব্যাখ্যা ছিল একটাই—আলোকে এখন অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে। বৃহস্পতি থেকে পৃথিবীতে পৌঁছাতে আলোর এখন পৃথিবীর কক্ষপথের ব্যাসের সমান অতিরিক্ত দূরত্ব অতিক্রম করতে হয়। অর্থাৎ আলো তাৎক্ষণিক নয়—এটি চলতে সময় নেয়।
রোমারের সময়েই সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব আনুমানিকভাবে জানা ছিল—প্রায় ১৪০ মিলিয়ন কিলোমিটার (আধুনিক পরিমাপে এই গড় দূরত্ব প্রায় ১৪৯.৬ মিলিয়ন কিলোমিটার)। এই দূরত্বের দ্বিগুণ, অর্থাৎ প্রায় ২৮০ মিলিয়ন কিলোমিটার অতিক্রম করতে আলো যদি ২২ মিনিট সময় নেয়, তাহলে আলোর বেগ দাঁড়ায় প্রায় ২১২,০০০ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড। রোমার অবশ্য নিজে এই সংখ্যা কোথাও লেখেননি। তিনি শুধু বলেছিলেন, সূর্য থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে প্রায় ১০ থেকে ১১ মিনিট লাগে। তাঁর লক্ষ্য ছিল সংখ্যা বের করা নয়; তাঁর লক্ষ্য ছিল দেখানো যে আলো তাৎক্ষণিক নয়। ধারণা করা হয়, ক্যাসিনি ও পিকার্ড—যাঁদের অধীনেই রোমার কাজ করছিলেন, তাঁরা শুরুতে এই ধারণার বিরোধিতা করেছিলেন। ক্যাসিনি ছিলেন অত্যন্ত সতর্ক পর্যবেক্ষক। তাই রোমারের পর্যবেক্ষণকে তিনি পুরোপুরি ত্রুটিমুক্ত মনে করেননি। তার ওপর সেই সময় ফ্রান্সে দেকার্তের দর্শনের প্রভাব প্রবল ছিল, যেখানে আলোকে তাৎক্ষণিক প্রবাহ হিসেবে কল্পনা করা হতো। এসব কারণেই আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের কাজ প্রকাশ থেকে বিরত থাকেন রোমার। তবু তাঁর আবিষ্কার হারিয়ে যায়নি। জুর্নাল দে সাভঁ-এর সংবাদ প্রতিবেদন এবং ১৬৭৬ সালের ২২ আগস্ট ক্যাসিনির এক ঘোষণার মধ্যেই রোমারের আবিষ্কারের ইঙ্গিত রয়ে যায়। অল্প সময়ের মধ্যেই ইউরোপের বিজ্ঞানী মহলে এই ধারণা আলোড়ন তোলে। ক্রিশ্চিয়ান হাইগেন্স আলোর তরঙ্গ তত্ত্বে রোমারের ফলাফল ব্যবহার করেন, আর নিউটন তাঁর অপটিকস-এ রোমারের পর্যবেক্ষণকে আলোর সীমিত গতির এক শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেন। এভাবেই, নাবিকদের দ্রাঘিমা সমস্যার এক ব্যবহারিক সমাধান খুঁজতে গিয়েই, প্রথমবারের মতো প্রমাণিত হয় যে আলো তাৎক্ষণিক নয়—তার চলারও একটি পরিমাপযোগ্য সময় আছে।
ব্র্যাডলির নাক্ষত্রিক অপেরণ: বিস্মৃত এক বৈজ্ঞানিক বিপ্লব
অবশেষে রোমারের মৃত্যুর প্রায় দুই দশক পর, ১৭২৮ সালে, ইংরেজ জ্যোতির্বিদ জেমস ব্র্যাডলি যখন নাক্ষত্রিক aberration-এর বা অপেরণের ব্যাখ্যা দেন, তখনই রোমারের ধারণাটি প্রথমবারের মতো নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়। অপেরণ শব্দটি গঠিত ‘অপ’ (দূরে বা বিচ্যুত) এবং ‘এরণ’ (গমন বা চলন) থেকে। অর্থাৎ স্বাভাবিক দিক বা চলন থেকে সরে যাওয়াকে বোঝায়। বিশেষভাবে লক্ষণীয় ব্যাপার হলো—রোমার কিংবা ব্র্যাডলি, কারোরই উদ্দেশ্য ছিল না আলোর গতি সরাসরি পরিমাপ করা। আলোর সীমিত গতি তাঁদের হাতে ধরা পড়ে একেবারেই পরোক্ষভাবে, অন্য একটি সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে।
১৭০০ শতকের শেষ নাগাদ জ্যোতির্বিজ্ঞান মহলে কোপার্নিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক মডেল মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলেও একটি মৌলিক প্রশ্ন তখনো রয়ে গিয়েছিল। সাধারণ মানুষের সামনে জ্যোতির্বিদেরা তখনো দেখাতে পারছিলেন না—পৃথিবী সত্যিই সূর্যের চারদিকে ঘোরে—এর কোনো সরাসরি ও পরিমাপযোগ্য প্রমাণ। সমস্যাটি নতুন ছিল না। প্রায় দুই হাজার বছর ধরে এটি জ্যোতির্বিদদের জন্য একধরনের মাথাব্যথা হয়ে ছিল। যুক্তিটা ছিল সহজ। পৃথিবী যদি সূর্যের চারদিকে ঘোরে, তবে কাছের নক্ষত্রগুলোর অবস্থান বহুদূরের নক্ষত্রের তুলনায় বছরে সামান্য করে সরে যাওয়ার কথা। এই দৃষ্টিকোণজনিত স্থানান্তরকেই বলা হয় বার্ষিক প্যারাল্যাক্স। গ্রিক জ্যোতির্বিদ অ্যারিস্টারখাস ও হিপারকাস খালি চোখে এই প্যারাল্যাক্স ধরতে ব্যর্থ হন। সেই ব্যর্থতাই তখনকার মানুষদের ভাবতে বাধ্য করেছিল যে পৃথিবী স্থির—সূর্যের চারদিকে ঘোরে না। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয় হলো, ১৭০০ শতকের দুরবিন দিয়েও সেই সূক্ষ্ম সরে যাওয়া ধরা পড়ছিল না।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ইংল্যান্ডের তরুণ জ্যোতির্বিদ জেমস ব্র্যাডলি (১৬৯৩–১৭৬২) সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি বার্ষিক প্যারাল্যাক্স খুঁজে বের করবেন। সহকর্মী স্যামুয়েল মলিনিউর সঙ্গে মিলে তিনি একটি বিশেষ দুরবিন নির্মাণ করেন। এরপর গামা ড্রাকোনিস নামে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রের অবস্থান পর্যবেক্ষণ শুরু করেন। লন্ডনের অক্ষাংশে এই নক্ষত্র প্রায় ঠিক মাথার ওপরে দেখা যায়। ফলে বায়ুমণ্ডলীয় প্রতিসরণের প্রভাব কম হওয়ার কথা এবং প্যারাল্যাক্সের প্রভাব তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট হওয়ারই কথা। কিন্তু ব্র্যাডলির পর্যবেক্ষণ প্রত্যাশিত ফল দিল না। তিনি দেখলেন, নক্ষত্রটির অবস্থান বছরে প্রায় ২০.৫ কৌণিক সেকেন্ড পরিমাণ পরিবর্তিত হচ্ছে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের ধারা প্যারাল্যাক্সের মতো নয়। বরং পুরো দিকটাই যেন প্রায় ৯০ ডিগ্রি ঘুরে গেছে। এটি যদি প্যারাল্যাক্স হতো, তাহলে ডিসেম্বর মাসে নক্ষত্রটি সবচেয়ে দক্ষিণে এবং জুন মাসে সবচেয়ে উত্তরে থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, নক্ষত্রটির আপাতগতি মার্চ মাসে দক্ষিণতম এবং সেপ্টেম্বর মাসে উত্তরতম অবস্থানে পৌঁছাচ্ছে। এই আচরণ প্যারাল্যাক্স দিয়ে কোনোভাবেই ব্যাখ্যা করা যাচ্ছিল না।
এই পর্যবেক্ষণ থেকেই ব্র্যাডলি একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুমানে পৌঁছান। তিনি বুঝতে পারেন, এটি নক্ষত্রের প্রকৃত অবস্থান পরিবর্তন নয়; বরং এটি আলোর সীমিত গতি এবং পৃথিবীর চলনের যুগল প্রভাব। বৃষ্টির মধ্যে হাঁটার সময় যেমন ছাতাটি সামান্য কাত করে ধরতে হয়, তেমনি চলন্ত পৃথিবীর ওপর স্থাপিত দুরবিনে আলো সরাসরি না ঢুকে সামান্য কোণে প্রবেশ করে। এ ঘটনাকেই তিনি নাম দেন aberration of starlight। এই কোণটির মান সরলভাবে লেখা যায়: θ=v/c, যেখানে v হলো পৃথিবীর কক্ষগত বেগ এবং c হলো আলোর বেগ। পৃথিবীর কক্ষগত বেগ প্রায় ৩০ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড এবং পর্যবেক্ষিত কোণ প্রায় ২০.৫ কৌণিক সেকেন্ড বা প্রায় ০.০০০১ রেডিয়ান ধরলে, আলোর বেগ দাঁড়ায় প্রায় ৩ লাখ কিলোমিটার প্রতি সেকেন্ড—অবিশ্বাস্যভাবে সঠিক একটি মান।
১৭২৮ সালে ব্র্যাডলি তাঁর এই ফলাফল রয়্যাল সোসাইটিতে পাঠানো এক চিঠিতে প্রকাশ করেন। চিঠিটি লেখা হয়েছিল তৎকালীন রাজকীয় জ্যোতির্বিদ এডমন্ড হ্যালির কাছে। এটাই ছিল সেই সময়ের রীতি। বিজ্ঞানীরা প্রথমে প্রভাবশালী সহকর্মীদের সঙ্গে তাঁদের কাজ আলোচনা করতেন, তারপর আনুষ্ঠানিক চিঠি লিখতেন। সেটাই সভায় পড়া হতো এবং পরে ফিলোসফিক্যাল ট্রানজেকশনস-এ প্রকাশিত হতো। এই চিঠিতেই ব্র্যাডলি ব্যাখ্যা করেছিলেন, কীভাবে একটি নক্ষত্রের আপাত অবস্থান বছরজুড়ে নিয়মিতভাবে পরিবর্তিত হয়—যা পরে নাক্ষত্রিক অপেরণ নামে পরিচিত হয়। তাঁর নিজের ভাষায়: ‘এইভাবে যেহেতু এটি ২০৴ ৴.২, তাই AC-এর সঙ্গে AB-এর অনুপাত—অর্থাৎ আলোর গতিবেগের সঙ্গে চোখের গতিবেগের অনুপাত (যা এ ক্ষেত্রে পৃথিবীর কক্ষপথে বার্ষিক গতির বেগের সমান বলে ধরা যায়)—হবে ১০২১০:১। এর থেকে বোঝা যায়, আলো সূর্য থেকে পৃথিবী পর্যন্ত দূরত্ব অতিক্রম করতে সময় নেয় প্রায় ৮ মিনিট ১২ সেকেন্ড।’
এই একটি বাক্যের মধ্যেই ব্র্যাডলি কার্যত তিনটি মৌলিক আবিষ্কার একসঙ্গে উপস্থাপন করেছিলেন। প্রথমত, তিনি প্রথমবারের মতো সরাসরি প্রমাণ দেখালেন যে পৃথিবী সত্যিই সূর্যের চারদিকে ঘোরে। দ্বিতীয়ত, তিনি আলোর গতির একটি স্বাধীন ও অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য পরিমাপ দিলেন—রোমারের বৃহস্পতির উপগ্রহভিত্তিক অনুমানের পর এটি ছিল আলোর সীমিত গতির দ্বিতীয় শক্ত ভিত্তি। তৃতীয়ত, এবং সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ব্র্যাডলি আধুনিক নির্ভুল জ্যোতির্মিতির ভিত গড়ে তুললেন। এখানে লক্ষণীয় যে ব্র্যাডলি আলোর গতি সরাসরি উল্লেখ করেননি। কারণ, তাঁর সময়ে সূর্য–পৃথিবীর দূরত্ব নির্ভুলভাবে জানা ছিল না। তাই তিনি গতি নির্ণয়ের বদলে আলোর গতি ও পৃথিবীর কক্ষগত গতির মধ্যে একটি নির্ভরযোগ্য অনুপাত নির্ধারণ করেন। এটা ব্র্যাডলির সতর্কতা ও তাঁর পরিমাপনির্ভর বৈজ্ঞানিক মানসিকতার পরিচয়।
ব্র্যাডলির আগে জ্যোতির্বিদেরা সাধারণত কৌণিক মিনিট পর্যন্ত মাপতেন। কিন্তু তিনিই প্রথমবার কৌণিক সেকেন্ডের ভগ্নাংশ পর্যন্ত পরিমাপ করলেন। পাশাপাশি বছরব্যাপী পদ্ধতিগত পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে দেখালেন, কীভাবে বায়ুমণ্ডলীয় প্রতিসরণ, যন্ত্রের ত্রুটি এবং তাপমাত্রার তারতম্য হিসাবের মধ্যে আনতে হয়। এই পদ্ধতিগত দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভর করেই পরে, ব্র্যাডলির আবিষ্কারের প্রায় ১১০ বছর পরে, ফ্রিডরিখ বেসেল ১৮৩৮ সালে প্রথমবারের মতো নাক্ষত্রিক প্যারাল্যাক্স মেপে তারার দূরত্ব নির্ণয় করতে সক্ষম হন। এখানে একটি কথা বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার: নাক্ষত্রিক প্যারাল্যাক্সের পরিমাণ নাক্ষত্রিক অপেরণের তুলনায় অনেক ছোট—বেসেল যে প্যারাল্যাক্স প্রথম মাপতে পেরেছিলেন, তার মান ছিল মাত্র প্রায় ০.৩ কৌণিক সেকেন্ড, যেখানে ব্র্যাডলির আবিষ্কৃত অপেরণ প্রায় ২০ কৌণিক সেকেন্ড। তাই প্যারাল্যাক্স নির্ভুলভাবে ধরতে গেলে আগে অপেরণকে আলাদা করে বুঝে বাদ দেওয়া অপরিহার্য ছিল।
তবু এত বিশাল অবদান সত্ত্বেও আজ আমরা ব্র্যাডলির নাম খুব কমই শুনি, যা আমার মতে বিজ্ঞানের ইতিহাসে একধরনের অবিচার। তাঁর কাজ ছিল মূলত গাণিতিক ও পর্যবেক্ষণভিত্তিক; এখানে কোনো চাক্ষুষ বিস্ময় নেই, আছে শুধু নির্ভুল সংখ্যা। আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানে নাক্ষত্রিক অপেরণ এখন একটি ‘কারেকশন ফ্যাক্টর’—তারার প্রকৃত অবস্থান নির্ণয়ের আগে যেটি বাদ দিতে হয়। অথচ এই সংশোধনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে পৃথিবীর চলনের সরাসরি প্রমাণ। এই অর্থে বলা যায়, আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভিত্তি যে নির্ভুল পরিমাপ ও পদ্ধতিগত পর্যবেক্ষণের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, তার অন্যতম প্রধান স্থপতি জেমস ব্র্যাডলি—এবং তাঁর ১৭২৮ সালের সেই চিঠিটি ছিল বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক নীরব, কিন্তু অপরিহার্য মাইলফলক।
লেখক: অধ্যাপক ও জ্যোতিঃপদার্থবিদ, মোরেনো ভ্যালি কলেজ, ক্যালিফোর্নিয়া, যুক্তরাষ্ট্র। *লেখাটি ২০২৬ সালে বিজ্ঞানচিন্তায় ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় প্রকাশিত।



