রংপুরের তারাগঞ্জে আশিকুর রহমানের প্রতিষ্ঠিত ‘গ্রামীণ সাহায্য সংস্থা’ গ্রামের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে। সংস্থাটি বিনামূল্যে রক্তের গ্রুপ নির্ণয়, রক্তদান, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, নিরক্ষরতা দূরীকরণসহ নানা কল্যাণমূলক কাজ করে আসছে।
একটি স্মরণীয় ঘটনা
প্রায় দেড় যুগ আগে গ্রামের বাজারে মাটিতে শুয়ে কান্নাকাটি করছিলেন চল্লিশোর্ধ্ব এক দিনমজুর। অর্থাভাবে নিজের চিকিৎসা করতে না পেরে তিনি কাঁদছিলেন। সেই সময় আশিকুর রহমান এগিয়ে যান এবং তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করান। অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হয়ে ওই দিনমজুর আশিকুরকে জড়িয়ে ধরে দোয়া করেন। সেই ঘটনা আশিকুরের মনে দাগ কাটে এবং তিনি সুখে-দুঃখে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিজ্ঞা করেন।
শুরুটা টিফিনের টাকা দিয়ে
আশিকুরের মা লাইলী বেগম জানান, ছোটবেলায় আশিকুর স্কুলে টিফিনের টাকা জমিয়ে দরিদ্র মানুষকে সহায়তা করত। গ্রামের কেউ অনাহারে থাকলে খাবার নিয়ে ছুটে যেত। বাবা আজিজ সরদার তাঁকে এমন কাজে উৎসাহ দিতেন। আশিকুর বলেন, ‘মানবসেবার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করা যায়’— এই শিক্ষা তাঁর বাবার কাছ থেকে পাওয়া।
গ্রামীণ সাহায্য সংস্থার কার্যক্রম
২০১২ সালে শতাধিক মানুষ নিয়ে গঠিত হয় ‘গ্রামীণ সাহায্য সংস্থা’। সংগঠনের স্বাস্থ্য সম্পাদক নিলয় সরদার জানান, অর্থাভাবে চিকিৎসা করতে না পারেন এমন লোকদের প্রতি মাসে ১ থেকে ৩ হাজার টাকা দেওয়া হয়। প্রয়োজনে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এ পর্যন্ত ১৫০ জনকে চিকিৎসা সহায়তা, পাঁচজন প্রতিবন্ধীকে হুইলচেয়ার, দেড় শতাধিক নারীকে হাঁস-মুরগি, ১২ জনকে সেলাই মেশিন এবং দুই শতাধিক শিক্ষার্থীকে শিক্ষা উপকরণ দেওয়া হয়েছে।
জীবিকার পথ দেখিয়েছেন
রিকশাচালক মমিনুল ইসলাম সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেলে তাঁর স্ত্রী রেহেনা খাতুনকে একটি সেলাই মেশিন কিনে দেওয়া হয়। এখন তিনি মাসে ১০ হাজার টাকা আয় করেন। তেঁতুলতলা গ্রামের মাজেদা বেগমকে ২০টি হাঁস-মুরগি দেওয়া হয়; এখন তাঁর ছোট মুরগির খামার রয়েছে।
সচেতনতা ও শিক্ষা কার্যক্রম
তেঁতুলতলা বাজারের মোড়ে একটি বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র চালু করা হয়েছে, যেখানে প্রতি শুক্রবার নিরক্ষরদের অক্ষর শেখানো হয়। প্রতি শনিবার আধুনিক চাষাবাদ ও পশুপালনের পরামর্শ দেওয়া হয়। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান জানান, শিক্ষক, ইমাম ও জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সামাজিক কমিটি বাল্যবিবাহ বন্ধ ও স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে কাজ করে। এ পর্যন্ত চারটি বাল্যবিবাহ বন্ধ এবং ১৮টি দরিদ্র পরিবারের মেয়ের বিয়েতে সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
অর্থ ব্যবস্থাপনা
কোষাধ্যক্ষ মাহামুদুল সরদার জানান, তহবিলে ২ লাখ টাকা জমা আছে। সংগঠনের নামে একটি পুকুর ইজারা নিয়ে মাছ চাষ করা হয়। ১৫০ সদস্য প্রতি মাসে ২০০ টাকা চাঁদা দেন। বিত্তশালীরাও তহবিলে টাকা দেন। বছরে দুবার আয়-ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ করা হয়।
আশিকুরের বাবা আজিজ সরদার গর্বিত। তিনি বলেন, ‘হাটবাজারে অপরিচিত লোকজন ছেলের কাজের প্রশংসা করলে বুক ভরে যায়।’ আলমপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম বলেন, ‘মানবসেবাই মানুষের প্রকৃত ধর্ম। আশিকুর তা-ই করছেন। তাঁর মতো নিঃস্বার্থ মানুষ বিরল।’



