দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথ শুধু একটি ফেরিঘাট নয়; এটি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন ও অর্থনীতির অন্যতম প্রধান সংযোগ পথ। প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী, পণ্যবাহী ট্রাক ও বিভিন্ন যানবাহন এই নৌপথ ব্যবহার করে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে। কিন্তু সাম্প্রতিক দুটি বড় দুর্ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলেছে—এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা কতটা ঝুঁকিমুক্ত?
দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি ও নিরাপত্তার ঘাটতি
গত শুক্রবার দৌলতদিয়ার ৭ নম্বর ঘাটে ফেরিতে ওঠার সময় একটি যাত্রীবাহী বাস র্যাম্প ভেঙে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। সৌভাগ্যবশত যাত্রীদের আগেই নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে কোনো প্রাণহানি ঘটেনি। কিন্তু মাত্র আড়াই মাস আগে, একই ঘাট এলাকায় ফেরিতে ওঠার সময় একটি বাস নদীতে পড়ে অন্তত ২৬ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল। দুটি ঘটনার মধ্যে ভয়াবহ মিল হলো—দুই ক্ষেত্রেই নিরাপত্তাব্যবস্থার গুরুতর দুর্বলতার ইঙ্গিত বহন করে।
তদন্ত প্রতিবেদনের অস্বচ্ছতা
প্রশ্ন হলো, মার্চ মাসের মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর কী পরিবর্তন ঘটেছে? সরকার তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। কিন্তু সেই তদন্ত প্রতিবেদনের বিস্তারিত এখনো জনসমক্ষে আসেনি; বরং মন্ত্রীর বক্তব্য থেকে জানা গেছে, চালকের অদক্ষতা ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনকে দায়ী করা হয়েছে। যদি কেবল চালকের ভুলই দায়ী হয়, তাহলে একই ধরনের দুর্ঘটনা এত অল্প সময়ের ব্যবধানে আবার কীভাবে ঘটল?
প্রাণ রক্ষায় গৃহীত পদক্ষেপের সীমাবদ্ধতা
এ কথা সত্য যে মার্চের দুর্ঘটনার পর গৃহীত একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এবার বহু প্রাণ বাঁচিয়েছে। ফেরিতে ওঠার আগে যাত্রীদের বাস থেকে নামিয়ে দেওয়ার নির্দেশনা কঠোরভাবে কার্যকর করা হয়েছিল। নৌ পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সক্রিয়তার কারণেই প্রায় ৪০ জন যাত্রী বড় বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছেন। এটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে কোনো দুর্ঘটনায় প্রাণহানি না হওয়াকে সফলতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রকৃত সফলতা হবে দুর্ঘটনাই যাতে না ঘটে, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
অব্যবস্থাপনার দীর্ঘ ইতিহাস
দৌলতদিয়া ঘাট থেকে সরকার প্রতিদিন বিপুল রাজস্ব আয় করে। অথচ স্থানীয় বাসিন্দা, যাত্রী ও পরিবহন-সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ—ঘাটের ব্যবস্থাপনা এখনো আধুনিক হয়নি। যানবাহন ওঠানামার পদ্ধতি, র্যাম্পের নিরাপত্তা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ এবং জরুরি উদ্ধার সক্ষমতা—সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার অভিযোগ রয়েছে। ফলে দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন যেন একটি নিয়মিত প্রশাসনিক রীতিতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু সুপারিশ বাস্তবায়ন না হলে নতুন তদন্ত কমিটি গঠনের কোনো অর্থ থাকে না।
সরকারের করণীয়
এই পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে পথ স্পষ্ট। দৌলতদিয়া ঘাটকে আধুনিক ও নিরাপদ নৌবন্দরে রূপান্তর করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের অবকাঠামো, উন্নত র্যাম্প, ডিজিটাল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং কঠোর নিরাপত্তা মানদণ্ড চালু করা জরুরি। নিরাপত্তাহীনতার এই চক্র ভাঙতে না পারলে পরবর্তী দুর্ঘটনায় হয়তো আর ভাগ্য সহায় হবে না।



