পাবনার বেড়া উপজেলায় এক ব্যবসায়ীর কাছে চাঁদা না পেয়ে তাকে তুলে নিয়ে মারধর ও হাত-পা ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে শ্রমিক দলের নেতা রিপন সরদার ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। মঙ্গলবার (২৩ জুন) সকালে বেড়া উপজেলার সিঅ্যান্ডবি এলাকা থেকে তাকে তুলে নিয়ে মারধর করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় ওই ব্যবসায়ীকে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
আহত ব্যবসায়ীর পরিচয় ও অভিযোগ
আহত ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান (৪০) বেড়া পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মনজেল খানের ছেলে। তার হোটেল ও গাড়ির ব্যবসা রয়েছে। অভিযুক্ত রিপন সরদার (৩৫) সাঁথিয়া উপজেলার করমজা সরদারপাড়া গ্রামের পাশা সরদারের ছেলে। তিনি সাঁথিয়া উপজেলা শ্রমিক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক। এ ঘটনায় বেড়া থানায় লিখিত অভিযোগ করেছে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীর পরিবার।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, বেড়া পৌরসভার সিঅ্যান্ডবি বাসস্ট্যান্ড এলাকায় একটি মার্কেট নির্মাণ করছেন ব্যবসায়ী গোলাম মোস্তফা ও তার ভাই মিজানুর রহমান। গত শুক্রবার শ্রমিক দলের নেতা রিপন তার লোকজন নিয়ে এসে দুই ভাইয়ের কাছে তিন লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। দুই-তিন দিনের মধ্যে চাঁদা না দিলে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে যান তারা।
অপহরণ ও নির্যাতনের বিবরণ
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীর অভিযোগ, চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর আজ সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রিপন সরদারসহ কয়েকজন মোটরসাইকেলযোগে এসে মিজানুর রহমানকে তুলে পার্শ্ববর্তী সাঁথিয়া উপজেলার করমজা বাজার বণিক সমিতির সভাপতি মহরম সরদারের অফিসে নিয়ে যান। সেখানে নিয়ে যাওয়ার পর মিজানুর রহমানকে বেধড়ক মারধর করা হয়। এ সময় তার হাতে থাকা প্রায় দেড় ভরি ওজনের দুটি সোনার আংটি ও নগদ ২০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার পর তাকে ছেড়ে দেন অভিযুক্ত ব্যক্তিরা। মারধরের ফলে ব্যবসায়ী মিজানুর রহমানের হাত ও পা ভেঙে গেছে। এ ছাড়া শরীরের বিভিন্ন স্থানে পাইপ দিয়ে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। পরে তাকে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
পূর্বের ঘটনা ও মুচলেকা
পরিবারের সদস্যরা জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে অভিযুক্ত রিপন সরদার, করমজা বাজার বণিক সমিতির সভাপতি মহরমসহ কয়েকজন তাদের পরিবারের কাছে চাঁদা দাবি করেছিলেন। সে সময় সেনাবাহিনীর সহযোগিতা নেওয়া হলে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের কাছ থেকে একটি মুচলেকা নেওয়া হয়। মুচলেকায় ভবিষ্যতে এ ধরনের কোনও ঘটনার দায়ভার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ওপর বর্তাবে বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। এরপর দীর্ঘদিন পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও সম্প্রতি আবারও চাঁদা দাবি শুরু করেন তারা।
ভুক্তভোগীর বক্তব্য
আহত ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমাদের যৌথ পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের কাছে আলাদাভাবে চাঁদা দাবি করা হতো। এর আগে সেনাবাহিনীর মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান হয়েছিল। সম্প্রতি আবার চাঁদা দাবি করে। চাঁদা না দেওয়ায় আমাকে তুলে নিয়ে মারধর করা হয়েছে। আমার প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টাকা মূল্যের দুটি সোনার আংটি এবং নগদ ২০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।’
অভিযুক্তের প্রতিক্রিয়া
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সাঁথিয়া উপজেলা শ্রমিক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক রিপন সরদার বলেন, ‘ওরা আমাকে আগে মারছে, তাই আমি মারছি। ওরা এর আগে সেনাবাহিনীর কাছে আমাকে নিয়ে অভিযোগ করে, কিন্তু সেনাবাহিনী সেই অভিযোগের সত্যতা পায়নি, বরং ওদেরকে পানিশমেন্ট দেওয়া হয়েছে। এরপর ওর ভাই আমাকে বলছে, ভাই, যা হওয়ার হয়েছে, আমরা সমস্যাটা সমাধান করে ফেলি। কিন্তু ওরা এই সমস্যাটা সমাধান করেনি এবং ওরা এখনও আওয়ামী লীগ আমলের মতো ভাব নিয়ে চলে। আমার লোকজন দু-একটা বাড়ি দিয়েছে, এটা নিয়ে মিথ্যা কথা বলে লাভ নাই। আর চাঁদা ও আংটির কথাটা মিথ্যা, আমি ওই গুলো নিই নাই। আর আমি এই ধরনের রাজনীতিও করি না। মূলত ওরা আওয়ামী লীগ করে বলেই আজকে এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে।’
পুলিশের অবস্থান
এ ব্যাপারে বেড়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নয়ন কুমার সরকার বলেন, ‘এই ঘটনায় অভিযোগ পেয়েছি। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে পুলিশ। আহত ব্যক্তি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তিনি সুস্থ হয়ে এলেই মামলা নথিভুক্ত করা হবে এবং তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’



