রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প কারখানা ঢালাওভাবে বেসরকারিকরণের সরকারি উদ্যোগের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)। দলটির সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ এ উদ্যোগ বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।
বাসদের বিবৃতি
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) উদ্যোগে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার আওতাধীন ৪৪টি শিল্প প্রতিষ্ঠান দেশি-বিদেশি বেসরকারি কোম্পানির বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করার পদক্ষেপ গণবিরোধী।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, দেশের বিপুলসংখ্যক শিল্প-কারখানা ঢালাওভাবে নিলামে তোলার উদ্যোগ দেখে মনে হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় সম্পদ ‘বানরের পিঠা ভাগ’-এর মতো ভাগ-বাটোয়ারার বিজ্ঞাপন প্রচার করা হচ্ছে।
রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর করপোরেট নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ
তিনি বলেন, হাজার হাজার একরের বেশি জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প কারখানাগুলো ‘বিদ্যমান শিল্পসম্পদে পুনঃবিনিয়োগ’, ‘পুনর্গঠন ও পুনঃউন্নয়ন’, ‘ইজারাভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি ইজারাভিত্তিক ব্যবস্থা’, ‘যৌথ উদ্যোগ’ এবং ‘কৌশলগত অংশীদারিত্ব’-এর নামে দেশি-বিদেশি বেসরকারি কোম্পানির জন্য উন্মুক্ত করার উদ্যোগ মূলত রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও জনগণের মালিকানাধীন সম্পদের ওপর করপোরেট পুঁজির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুপরিকল্পিত উদ্যোগ।
বজলুর রশীদ ফিরোজ অভিযোগ করেন, সরকার এ উদ্যোগকে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির কর্মসূচি হিসেবে প্রচার করে জনগণকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে এটি দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের পরামর্শে অনুসৃত নয়া উদারীকরণ ও বেসরকারিকরণ নীতিরই ধারাবাহিকতা।
বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের নীতির ধারাবাহিকতা
তার ভাষ্য, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ এবং দেশি-বিদেশি বড় করপোরেট পুঁজির চাহিদা অনুযায়ী রাষ্ট্রকে উৎপাদন ও শিল্প পরিচালনা থেকে সরিয়ে দিয়ে শুধু বেসরকারি পুঁজির পৃষ্ঠপোষক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার যে নীতি বিগত আমল থেকে অনুসরণ করা হচ্ছে, এই উদ্যোগ তারই ধারাবাহিকতা।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন পরিকল্পিতভাবে এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে যে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠান মানেই লোকসানি, অদক্ষ ও অকার্যকর। বাস্তবতা হলো, পরিকল্পিত অব্যবস্থাপনা, প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও আধুনিকায়ন না করা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না করা এবং নীতিগত অবহেলার মাধ্যমে বহু রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকে পরিকল্পিতভাবে সংকটের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।
স্বচ্ছতার অভাব ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার প্রশ্ন
বজলুর রশীদ ফিরোজ বলেন, সরকার ৪৪টি শিল্পসম্পদ বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু কোন মানদণ্ডের ভিত্তিতে এগুলো নির্বাচন করা হয়েছে, সম্পদগুলোর প্রকৃত আর্থিক মূল্য নির্ধারণে ইনভেন্টরি করা হয়েছে কিনা, কী শর্তে ইজারা বা যৌথ বিনিয়োগ হবে এবং রাষ্ট্রের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ কতটুকু বজায় থাকবে—এসব বিষয়ে জনগণের সামনে কোনো স্বচ্ছ তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি।
তার মতে, জাতীয় সম্পদ নিয়ে এ ধরনের সিদ্ধান্ত দেশের জনগণ, শিল্পের অংশীদার শ্রমিক, বিশেষজ্ঞ, এমনকি জাতীয় সংসদকে পাশ কাটিয়ে গ্রহণ করা গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার পরিপন্থী।
গণআন্দোলনের আহ্বান
বিবৃতিতে তিনি জাতীয় সম্পদ, অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব এবং রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প রক্ষায় সর্বস্তরের বাম, প্রগতিশীল দল ও ব্যক্তি, পাশাপাশি দেশপ্রেমিক জনগণকে ঐক্যবদ্ধ গণআন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান।



